ধানে-গানে, রূপ-লাবণ্যে, শ্যামলিমায় ভরপুর বাংলাদেশ। বাংলার সোনালি ফসলের হাতছানিতে এসেছে পর্তুগিজ, আর্মেনিয়া ও ইংরেজ বণিকরা। ব্যবসার ছলে ইংরেজ-বেনিয়া, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামে জেঁকে বসে বাংলার বুকে। নদীমাতৃক এই বাংলার উর্বরা মাটিতে শুরু করে নীলের চাষ। এ দেশের সোনালি আঁশ-পাট নিয়ে গড়ে তোলে মিল-কারখানা। তারপর থেকে শুরু হয় শাসন-শোষণ।
বাঙালি জাতি চিরবিদ্রোহী। কোনোকালেই মেনে নেয়নি বিদেশি আগ্রাসন। ইতিহাসের পাতায় চোখ ফেরালে দেখা যায়, সেই ১৮৫৮ সালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে শুরু হয় সিপাহি বিদ্রোহ। ১৯৩০ সালে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনে মাস্টারদা সূর্যসেনের সঙ্গে একজন নারী হয়ে পুরুষের বেশে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন প্রীতিলতা।
বাংলাকে বিদেশি শক্তির হাত থেকে মুক্ত করতে শুরু হয় স্বদেশি আন্দোলন। সেই আন্দোলনে অনিল কুমার রায়, কিরণ শংকর রায়, মনিন্দ্র ভট্টাচার্য এদের সঙ্গে যোগ দেন লীলা রায়, লাবণ্য প্রভা দাস গুপ্তাসহ অনেকে। তেভাগা আন্দোলনে ইলা মিত্র যে সাহসিকতার পরিচয় দেখিয়েছেন, ইতিহাসের পাতায় তা উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে নারীদের ভূমিকাও অনন্য। স্বৈরশাসক পাকিস্তানি সরকার উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা দিলে ক্ষোভে-বিক্ষোভে জ্বলে ওঠে সমগ্র বাঙালি জাতি। ভাষা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীরাও এগিয়ে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে হালিমা খাতুন, রওশন আরা বাচ্চু, সাফিয়া খাতুন এমন একগুচ্ছ নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা রয়েছে।
১৯৭১ সালে রণাঙ্গনে অস্ত্র হাতে লড়াই করেছেন তারামন বিবি, কাঁকন বিবি, শিরিন বানু মিতিল, রওশন আরাসহ অনেকে।
১৯৭১ সালে অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। দেশ স্বাধীন হলেও বারবার স্বৈরশাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে এ দেশের শাসকগোষ্ঠী। স্বৈরশাসন শুরু হয়েছিল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে। দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরশাসনের কবলে জর্জরিত হয়েছিল এ দেশের মানুষ। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ৯ বছরের স্বৈরশাসনের চেয়েও ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছিল শেখ হাসিনার ষোলো বছরের স্বৈরতান্ত্রিকতা। শুধু স্বৈরশাসনই নয়, বিরোধী দলকে নিঃশেষ করার হীন ষড়যন্ত্রে গুম-খুনের মতো নিষ্ঠুর পথও বেছে নিয়েছিল। আয়নাঘরের মতো অসহনীয় নির্যাতন সেল তৈরি করেছিল।
২০২৪ সাল। ছাত্র-জনতা সংঘবদ্ধ হয়ে শুরু করে বিদ্রোহ-বিপ্লব-সংগ্রাম। বিশেষভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী সমন্বয়ক হিসেবে শেখ হাসিনার স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্তির লক্ষ্যে শুরু করেন লাগাতার আন্দোলন। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন বাংলার আবালবৃদ্ধবনিতা। এই আন্দোলনকে নস্যাৎ করার লক্ষ্যে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা পুলিশ-বিজিবিকে লেলিয়ে দেয়। ছাত্র-জনতাকে উদ্দেশ্য করে নির্বিচারে গুলি চালায়।
স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ছাত্রদের পাশে জীবন-মরণ একাত্ম ঘোষণা করেছিলেন রোকেয়া হল, শামসুন নাহার হলের ছাত্রীরা। সমন্বয়ক হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন নুসরাত তাবাসসুম। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার নির্দেশে সমন্বয়কদের ধরে নিয়ে ডিবি অফিসে করা হয়েছিল নির্যাতন। সেই নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুম। সমন্বয়ক ছাড়াও এই আন্দোলনে যারা জীবন বাজি রেখে সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের একজন জীবন ভয়কে উপেক্ষা করে পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের পেছানোর কিছু নেই, পেছনে পুলিশ, সামনে স্বাধীনতা। ২৫ মার্চ শুরু হয়েছে, সামনে ১৬ ডিসেম্বর।’ এ কথায় তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ১৯৭১ সালের মতো সেই ভয়াবহ ২৫ মার্চের কালরাত শুরু হয়েছে, সামনে ১৬ ডিসেম্বর অর্থাৎ বিজয়ের হাতছানি। সেদিন এই সংগ্রামী বীর কন্যার বাণী লাখ লাখ মানুষের মনে সাহস সঞ্চার করেছিল। ভয়কে দূরে ঠেলে সারি সারি মানুষ দাঁড়িয়েছিল মিছিলে-বিক্ষোভে-বিপ্লবে।
সংগ্রামী সহযোদ্ধাকে যখন পুলিশ বন্দি করে প্রিজন ভ্যানে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন সাহসী বাংলার বীর কন্যা প্রিজন ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়েছিল দৃঢ়চিত্তে। শুধু ছাত্রছাত্রীই নয়, এই সংগ্রামে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকদের পাশাপাশি শিক্ষিকারাও। পুলিশ যখন নির্দয় নিষ্ঠুরভাবে সংগ্রামী ছাত্রদের কণ্ঠ রোধ করতে মুখ চেপে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, তখন সামনে এসে রুখে দাঁড়ান মমতাময়ী মাতৃরূপী শিক্ষিকা। অসীম সাহস নিয়ে প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, ‘আমার ছাত্রদের নিরাপত্তা দিতে পারছি না, এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে।’ এ কথায় একজন শিক্ষিকার কণ্ঠে যেমন প্রতিবাদের ভাষা শোনা যায়, তেমনিভাবে মাতৃস্নেহের সকাতর বাণী ফুটে ওঠে।
আন্দোলন যখন তুঙ্গে, স্বৈরশাসক আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে গুলি চালায়। হেলিকপ্টার থেকে গুলি বর্ষণ করে নির্দয়-নিষ্ঠুরভাবে। কোলের শিশুও রেহাই পায়নি এই বর্বরতার হাত থেকে। তখন সাহসের ভূমিকায় এগিয়ে এসেছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শামীমা সুলতানা। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে একাত্ম ঘোষণা করে স্বৈরশাসনের অবসানের লক্ষ্যে এক সাহসী ভূমিকা পালন করেন। নিজ অফিস কক্ষে টাঙানো স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা ও তার বাবা শেখ মুজিবের ছবি নিজ হাতে খুলে ফেলেন।
স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে শত শত নারী স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত করেছে রাজপথ। ব্যানার-ফেস্টুন হাতে, কপালে লাল-সবুজ পতাকা বেঁধে দাঁড়িয়েছিল প্রতিবাদে-প্রতিরোধে। মা হয়ে নিজের সন্তানকে ঠেলে দিয়েছেন মিছিলের অগ্রভাগে। নিজের হাতে গ্রাফিতি করেছেন দেয়ালে দেয়ালে। গ্রাফিতির চিত্রমালায়, কার্টুনে কার্টুনে দেয়াল হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের ভাষা। স্বৈরাচারের দোসরদের বুকে লেগেছে কম্পন। স্বৈরাচারী পুলিশ-বিজিবি গ্রাফিতির চিত্রমালা দেখে কম্পিত হয়ে উঠেছে। তাদের বন্দুকের নিশানা হয়ে পড়েছে লক্ষ্যভ্রষ্ট। অবশেষে ৫ আগস্ট কাপুরুষ-ভীরুর মতো পালিয়ে চলে গেছে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা। মুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। ৫ আগস্টের এই বিজয় নারী-পুরুষের সম্মিলিত সংগ্রামের ফসল। ৫ আগস্ট আজ ইতিহাসের পাতায় ৩৬ জুলাই!
লেখক : গবেষক ও লেখক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

