আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

‘বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই ছিল সবচেয়ে বড় দায়িত্ব’

রাজিয়া সুলতানা

‘বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই ছিল সবচেয়ে বড় দায়িত্ব’

মালেকা খাতুন সারা, ২১ বছর বয়সি একজন নির্ভীক দেশপ্রেমিক। জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। আহত হয়েছেন; একাধিকবার থাকার জায়গা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সারা ক্যাম্পাসের সমন্বয়ক এবং সিলেট জেলা কমিটির মুখপাত্র।

বিজ্ঞাপন

অনুপ্রেরণা

কোটা সংস্কার আন্দোলনের উত্তাল সময়। একদিকে শিক্ষার্থীদের স্লোগানে মুখরিত রাজপথ, অন্যদিকে ফ্যাসিস্ট শাসনের রক্তচক্ষু। কেমন করে যুক্ত হলেন আন্দোলনে, এ প্রশ্নের উত্তরে সারা খুব সাদামাটাভাবে কিন্তু দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, ‘আমি আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলাম শুধু নিজের বিবেকের ডাকে। সিলেটে কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরুটা হয় শাবিপ্রবিতেই। ৩ জুলাই ২০২৪, একটি বিক্ষোভ মিছিলের মাধ্যমে আমরা আমাদের দাবি জানাই। আমি দেখেছি, কীভাবে কোটা প্রথার নামে মেধাবী শিক্ষার্থীদের অবহেলা করা হচ্ছিল। বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই তখন আমার কাছে ছিল সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।’

আন্দোলনের মূলমন্ত্র ছিল একটাই, ন্যায় ও সমতার দাবি। সারা বলেন, ‘আমি সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলাম, আছি এবং থাকব। বৈষম্যের কাছে মাথা নত করব না। এই মানসিকতাই আমাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছে।’

নিষ্প্রভ শহরে আশার আলো

কোটা সংস্কার আন্দোলন সারাকে বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা চিনিয়েছে। তার ভাষ্যমতে, ‘শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, সাধারণ মানুষও একসময় আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। বাংলা ব্লকেড কর্মসূচিতে যখন আমরা রাস্তায় বসে থাকতাম, রোদের তাপে ক্লান্ত হয়ে পড়তাম, তখন পথচারীরা আমাদের পানি, খাবার দিয়ে সাহায্য করত। এমনকি কেউ কেউ রাস্তায় নামতে না পারলেও নিজেদের অবস্থান থেকে আমাদের পাশে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন।’

সারার তথ্যমতে, ৪ আগস্ট, সিলেটের বন্দর পয়েন্টের সেই আন্দোলন জুলাই ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে। সেদিন সিলেট শহর ছিল কার্যত স্তব্ধ। দোকানপাট অধিকাংশই বন্ধ। সন্ত্রাসী হামলার শঙ্কায় পথচারীরাও ভীত। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সমন্বয়ক সারাসহ সবাই বন্দর পয়েন্টে একত্রিত হয়েছিলেন। এ যেন জনতার সমুদ্র। এই সমুদ্রকে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন একটি মাইক। কিন্তু সেই দিন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল একটি মাইক জোগাড় করা। বিভিন্ন দোকানে ফোন করেও সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে এক মাইকের দোকানদার, তাদের অবস্থার কথা শুনে দোকান খুলে মাইক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি বললেন, ‘আমি হয়তো রাজপথে নেমে তোমাদের পাশে দাঁড়াতে পারছি না, কিন্তু আমার মাইকটুকু তোমাদের কাজে লাগুক, এটুকুই আমার সহায়তা।’ এই ঘটনা সারাকে এখনো মুগ্ধ করে।

আক্রমণের ভয়াবহতা এবং সাধারণ মানুষের সাহস

১৮ জুলাই, দুপুরের গণসমাবেশে যখন রাজপথ সরব, ঠিক তখনই পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কিছু কর্মী একসঙ্গে সবার ওপর আক্রমণ চালায়। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মধ্যে সারাসহ কিছু সহযোদ্ধা আহত হন। এক মুহূর্তে শহরের সাধারণ মানুষ এগিয়ে এলেন। কেউ আহত বন্ধুদের নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে গেলেন, কেউ পানি বা গ্লুকোজ নিয়ে ছুটে এলেন। আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে না পারলেও মানুষের এই অদৃশ্য সমর্থন সারাদের অনুপ্রাণিত করেছিল।

আরো একটি ঘটনা উল্লেখ করেন সারা। “সারা দিনের ক্লান্ত শরীর, কোথাও কোনো খাবার নেই। আমরা সারা দিন আন্দোলন শেষে সন্ধ্যায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তখন একজন বয়স্ক মুরব্বি, মাথায় পাতিল নিয়ে খাবার বিতরণ করছিলেন। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আঙ্কেল, আপনি তো জীবন ঝুঁকিতে আছেন, ছাত্রলীগ আর পুলিশের তাণ্ডব চলছে!’ উনি বলেছিলেন, ‘আমি যুদ্ধের ময়দানে আছি। এখানে যদি মরেও যাই, তবে সেটাই হবে শহীদি মৃত্যু।’ এমন সাহসী মানুষেরাই তো আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশের অংশ।”

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। একজন বয়স্ক পথচারী, কাছে ছুটে এসে বলেছিলেন, ‘বাবারা, অন্যায় কখনো চিরস্থায়ী হয় না। তোমাদের সাহসেই দেশটা নতুন আলো পাবে।’ তার সেই কথা সারাকে এখনো শক্তি জোগায়।

সারা মনে করেন, এসব কারণেই তাদের লড়াই সেদিন থেমে থাকেনি। শাসকের নিপীড়ন যতই বাড়ুক, ন্যায়ের পক্ষে তাদের আওয়াজ ততই জোরালো হয়েছিল। আর সেই দিন সারা শিখেছেন, মানুষের ঐক্যই কোনো আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি।

পরিবারই যার সাহস

এই সংগ্রামে সারার পরিবারের সমর্থনই তাকে সবচেয়ে বেশি সাহস দিয়েছে। ১৮ জুলাই হামলার পর আমাকে বাড়ি ছেড়ে থাকতে হয়েছিল ৫ আগস্ট পর্যন্ত। কিন্তু আমার বাবা-মা কখনোই আমাকে ঘরে আটকে রাখেননি। বরং তারাই আমাকে বলতেন, ‘সত্যের পক্ষে থেকো, বিজয় আসবেই।’

যেমন দেশের স্বপ্ন দেখেন

সারার স্বপ্নের বাংলাদেশ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এমন একটি বাংলাদেশ কল্পনা করি, যেখানে সব নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচবে। যেখানে শিক্ষার আলো শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম সবখানে পৌঁছাবে। স্বাস্থ্যসেবাও হবে সবার জন্য সহজলভ্য।’

একটু থেমে দৃঢ় কণ্ঠে আবার বলেন, ‘গণতন্ত্র, সুশাসন, ন্যায়বিচার আর দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাই। আমাদের তরুণরা এখন অনেক বেশি সচেতন, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়। এটাই তো নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন।’

আন্দোলনে নারী; নারীর আন্দোলন

নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন করতেই সারা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। ‘বাংলাদেশের প্রতিটি গণআন্দোলনেই নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এখনো নারীদের সমানভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ কম। নানা সামাজিক বাধা, হুমকি আর ভীতি নারীদের দমিয়ে রাখে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, নারীদের অংশগ্রহণ ছাড়া সত্যিকারের উন্নত বাংলাদেশ সম্ভব নয়।’

সারার চোখে একরাশ স্বপ্ন। এই স্বপ্ন শুধু তার নয়, পুরো প্রজন্মের। এক নতুন বাংলাদেশ, যেখানে থাকবে ন্যায়, সমতা আর মানবতা। সারার সেই স্বপ্ন যেন সত্যিই বাস্তব হয়ে ওঠে, এই প্রত্যাশাই রইল।

শেষ কথা

জুলাই-আগস্টের সেই দিনগুলো শুধু কোটা সংস্কার আন্দোলনের নয়, বরং সাহস, মানবতা ও ঐক্যের এক জীবন্ত উদাহরণ। সেই অজানা দোকানদার, বৃদ্ধ পথচারী এবং সিলেটের সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও সহায়তা আজও সারার মনে আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন