আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে করণীয়

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে করণীয়

মশা পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ফাইলেরিয়া, জিকা ও জাপানিজ এনসেফালাইটিসের মতো রোগ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে ভোগাচ্ছে। এই রোগগুলো শুধু মানুষের জীবন নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বিরূপ প্রভাব ফেলে।

মশার বিস্তার ও প্রজনন

বিজ্ঞাপন

১. এক ফোঁটা পানিতেই শত শত ডিম ফোটে।

২. উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু মশার বৃদ্ধি বাড়িয়ে দেয়।

৩. প্লাস্টিক বোতল, টায়ার, ড্রেন, ফুলের টব ইত্যাদি জায়গায় পানি জমে মশার আবাস গড়ে।

৪. বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও বর্ষার পরিবর্তন মশার বিস্তারকে উৎসাহিত করে।

৫. মশারি না ব্যবহার, জমে থাকা পানি না ফেলা, দরজা-জানালা খোলা রাখাÑসবই মশার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে।

দেশে মশাবাহিত রোগের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ মশাবাহিত রোগের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। দেশে ১২৩ প্রজাতির মশা শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকায় ১৪ প্রজাতি রয়েছে। ডেঙ্গু প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৬৪ সালে। তখন এটাকে ‘ঢাকা ফিভার’ বলা হতো। এর বাহক এডিস ইজিপ্টি ও এডিস অ্যালবোপিকটাস। জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনের ব্যথা, র‍্যাশ, জয়েন্টের ব্যথা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দেয়। জটিলতার মধ্যে বলা যায়, রক্তক্ষরণ, শক ও মৃত্যু। চিকুনগুনিয়া প্রথম শনাক্ত হয় ২০০৮ সালে। এর বাহক এডিস মশা। হঠাৎ জ্বর, তীব্র জয়েন্টের ব্যথা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দেয়। জটিলতা সৃষ্টির মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি জয়েন্ট ব্যথা, দুর্বলতা দেখা যায়। ম্যালেরিয়া বাহক অ্যানোফিলিস মশা। প্রাদুর্ভাব পার্বত্য ও সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় বেশি। জ্বর ওঠানামা করা, শীত লাগা, দুর্বলতা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়। জটিলতার মধ্যে অ্যানিমিয়া, কিডনি ও লিভার বিকল, মৃত্যুও হতে পারে। ফাইলেরিয়া রোগের বাহক কিউলেক্স ও ম্যানসোনিয়া। লক্ষণ হলো হাত-পা ফুলে যাওয়া। আজীবন অক্ষমতা, সামাজিক বৈষম্যের মতো জটিলতা দেখা দেয়।

ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য সুপারিশগুলো

পরিবেশ ও আবর্জনা নিয়ন্ত্রণ। ডেঙ্গু ছড়ানোর মূল উৎস হলো মশার লার্ভা। বাড়ির আশপাশের জায়গায় জমে থাকা পানি, যেমনÑটিউব, খোলা পাত্র, কুয়ো, ঝুরি, পাত্র বা নালি পরিষ্কার রাখতে হবে। আবর্জনা সঠিকভাবে ফেলে দেওয়া, যাতে মশা লার্ভা জন্মানোর স্থান না পায়। পানি সংরক্ষণের পাত্র ঢেকে রাখা বা ঢাকনা দিয়ে বন্ধ রাখা। ব্যবহার না হওয়া পানি খালি করা বা নিয়মিত পরিবর্তন করা। বৃষ্টির পানি জমে থাকা স্থান দ্রুত শুকিয়ে ফেলা। ঘরের ভেতরে মশারি ব্যবহার করা। মশার কিডি বা স্প্রে প্রয়োগ করা। রাতে ঘুমানোর সময় দীর্ঘ বাহুতে ও পায়ের কাপড় পরা। মশার জন্মনিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত স্প্রে দ্বারা মশা কমানো। হঠাৎ জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনের ব্যথা, মাংসপেশি বা জয়েন্টে ব্যথা, বমি বা গা ব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা। ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের জন্য দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করা। শরীর সুস্থ রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করা। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য ভিটামিন ও সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করা। মশাবাহিত রোগের প্রতিরোধ ও চিকিৎসা। ব্যক্তিগত সতর্কতাও মাথায় রাখতে হবে। ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার। সকাল ও সন্ধ্যায় দরজা-জানালা বন্ধ রাখা। মশা প্রতিরোধী লোশন বা স্প্রে ব্যবহার। লম্বা হাতার জামা পরিধান।

সামাজিক ও ঘরোয়া পদ্ধতি

প্রতি সপ্তাহে বাসার চারপাশে পানি জমা আছে কি না পরীক্ষা করা। ফুলের টব, টায়ার, ড্রেন, বোতল বা নির্মাণাধীন জায়গা পরিষ্কার রাখা।

নিম তেল, কর্পূর, লেবু-লবঙ্গ, শুকনো চা পাতার ধোঁয়া প্রয়োগ করে প্রাকৃতিকভাবে মশা তাড়ানো যায়।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান

জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন