মা, বোন ও কন্যার জীবনের নিরাপত্তা কোথায়?

আজমাল হোসেন মামুন

মা, বোন ও কন্যার জীবনের নিরাপত্তা কোথায়?

একটি মেয়েশিশুর পৃথিবী হওয়ার কথা ছিল রঙিন স্বপ্নে ভরা। তার হাতে থাকবে বই, খাতা, পুতুল আর রঙিন ফিতা। একজন কিশোরীর চিন্তা হওয়ার কথা পড়াশোনা, বন্ধুত্ব আর সুন্দর ভবিষ্যৎ। একজন নারীর প্রাপ্য সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন। তবে আজকের বাংলাদেশে বাস্তবতা যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমের পাতায় চোখ রাখলেই দেখা যায় নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, নিখোঁজ কিংবা আত্মহত্যার করুণ সংবাদ। কখনো রাস্তার পাশে, কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কখনো কর্মস্থলে, আবার কখনো নিজের ঘরের ভেতরেই নারীরা হয়ে উঠছেন সহিংসতার শিকার। ফলে প্রশ্নটি আজ আর কেবল একটি শিরোনাম নয়, বরং পুরো জাতির বিবেককে নাড়া দেওয়া এক আর্তনাদ! মা, বোন ও কন্যা কারো জীবন কি আর নিরাপদ?

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা সমাজকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। রাজধানীর মিরপুরে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। সিলেটে মাত্র চার বছরের এক শিশুর জীবন শেষ হয়েছে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে। ঠাকুরগাঁওয়ে আরেক কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জে এক শিশুকে ধর্ষণের পর হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে জঙ্গলে। এসব শিশু কোনো অপরাধ করেনি। তাদের একমাত্র অপরাধ তারা দুর্বল ও অসহায় ছিল। অথচ তাদের রক্ষা করার কথা যে সমাজের, সেই সমাজই তাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক গৃহশিক্ষিকাকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জীবিকার প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের পড়াতেন তিনি। কিন্তু সেই শিক্ষাদানই হয়ে উঠল তার মৃত্যুর কারণ। যে নারী জ্ঞানের আলো পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন, তিনিই আর নিরাপদে ফিরে আসতে পারেননি। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের নির্মম প্রতিচ্ছবি।

নারীর প্রতি সহিংসতার চিত্র কেবল এসব আলোচিত ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বামীর হাতে স্ত্রী হত্যা, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় হামলা, কর্মস্থলে যৌন হয়রানি, সাইবার বুলিং, ব্ল্যাকমেইলিং এবং পারিবারিক সহিংসতার অসংখ্য ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। অনেক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে আসে, আরো অসংখ্য ঘটনা নীরবে চাপা পড়ে যায় সামাজিক লজ্জা, ভয় কিংবা প্রভাবশালীদের চাপের কারণে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে অন্তত একজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় এই হার আরো উদ্বেগজনক। বাংলাদেশেও নারী ও শিশু নির্যাতনের উল্লেখযোগ্য অংশ ঘটে পরিচিত মানুষদের দ্বারাÑপ্রতিবেশী, আত্মীয়, সহকর্মী, শিক্ষক কিংবা পরিবারের সদস্যদের হাতে। অর্থাৎ সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, নারীর কাছে এখন অপরিচিতের চেয়ে পরিচিত মানুষই বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।

কেন বাড়ছে এই সহিংসতা?

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের সাহসী করে তুলছে। অনেক মামলার বিচার দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে। ভুক্তভোগী পরিবার হয়রানির শিকার হয়। অনেক অপরাধী রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়। ফলে অপরাধের প্রতি ভয় কমে যায়। এর পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার অবক্ষয়ও বড় কারণ। পরিবারে মানবিক মূল্যবোধ চর্চা কমে যাচ্ছে। শিশুদের ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেওয়ার চেয়ে কেবল পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ বেশি দেখা যায়। ফলে সহমর্মিতা, শ্রদ্ধাবোধ ও মানবিক দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠার সুযোগ কমে যাচ্ছে।

প্রযুক্তির অপব্যবহারও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। অনিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট ব্যবহার, সহিংস ও অশ্লীল কনটেন্টের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা ও নারীবিদ্বেষমূলক বক্তব্য অনেক তরুণের মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ভার্চুয়াল জগতের বিকৃত বিনোদন অনেক সময় বাস্তব আচরণেও প্রতিফলিত হচ্ছে।

তবে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দায়ী করলে হবে না। এই সংকটের দায় সমাজেরও। যখন একজন নির্যাতিত নারী বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো সামাজিক অপমানের মুখোমুখি হন, যখন ধর্ষণের শিকার মেয়ের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, যখন পরিবার ‘সম্মান’ রক্ষার জন্য অপরাধ গোপন রাখে, তখন অপরাধীরা আরো উৎসাহ পায়। নীরবতা অনেক সময় অপরাধের সবচেয়ে বড় সহযোগী হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরো দক্ষ ও স্বচ্ছ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা, মানবাধিকার ও লিঙ্গসমতার বিষয়ে কার্যকর পাঠদান জরুরি। পরিবারে ছেলেসন্তানদের শেখাতে হবেÑনারী কোনো ভোগের বস্তু নয়; তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ, যার সম্মান ও নিরাপত্তা রক্ষা করা প্রত্যেকের দায়িত্ব।

স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পাড়া-মহল্লায় সচেতন নাগরিক কমিটি, স্কুলভিত্তিক নিরাপত্তা কার্যক্রম, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে জনসচেতনতা এবং নারী ও শিশু সহায়তা কেন্দ্রগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে হবে। গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে অপরাধের বিরুদ্ধে জনমত আরো শক্তিশালী হয়। একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার সুউচ্চ ভবন কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; বরং সেই সমাজ কতটা নিরাপত্তা দিতে পারে তার নারী, শিশু ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকেÑসেখানেই তার প্রকৃত মূল্যায়ন। আজ যখন একটি মা মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, একজন কর্মজীবী নারী সন্ধ্যায় ঘরে ফিরতে ভয় পান, কিংবা একটি শিশুকে নিজের প্রতিবেশীকেও বিশ্বাস করতে শেখানো যায় না, তখন আমাদের উন্নয়নের বড় বড় পরিসংখ্যানও ম্লান হয়ে যায়।

রামিসার অসমাপ্ত শৈশব, সিলেটের সেই শিশুর নিথর দেহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গৃহশিক্ষিকার করুণ মৃত্যু, কিংবা প্রতিদিনের অগণিত নির্যাতিত নারীর অশ্রু আমাদের বিবেককে একটাই প্রশ্ন করছেÑআমরা কেমন সমাজ গড়ে তুলছি?

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো কন্যাশিশু ধর্ষণের ভয়ে বড় হবে না, কোনো নারী কর্মস্থলে গিয়ে আর ফিরে না আসার আশঙ্কায় থাকবে না, কোনো মা সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে রাত জেগে কাঁদবেন না। নারী যদি নিরাপদ না হন, তবে পরিবার নিরাপদ নয়; পরিবার নিরাপদ না হলে সমাজ নিরাপদ নয়; আর সমাজ নিরাপদ না হলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। তাই আজ সময়ের সবচেয়ে জরুরি আহ্বানÑনারীর নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক স্লোগান নয়, জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে। কারণ একটি জাতির মানবিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো, সে তার মা, বোন ও কন্যাদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে।

গত ১৯ মে ধর্ষণের পর রামিসাকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। তবে লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচারের রায় বাংলাদেশের একটি নজির স্থাপিত হলো। মাত্র ১৯ দিনের মাথায় ও ছয় কার্যদিবসের মধ্যে রোববার এ মামলার রায় দেওয়া হয়েছে। রায়ে প্রধান দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এত দ্রুততম সময়ে মামলার রায় ঘোষণা একটা মাইলফলক। রামিসার নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষুব্ধ শোকাহত অগণিত মানুষের মনে এ রায় কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিয়েছে। এ ধরনের অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রেও রামিসার মামলা একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে ভূমিকা পালন করবেÑএটাই এখন সবার প্রত্যাশা।

লেখক : শিক্ষক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...