আলোকিত শিক্ষক তাহমিনা পারভীন

এখলাছুর রহমান, জকিগঞ্জ (সিলেট)

আলোকিত শিক্ষক তাহমিনা পারভীন

ময়মনসিংহ শহরে একদা সচ্ছল জীবনের স্বপ্ন বোনা পরিবারটি হঠাৎ করেই গভীর আঁধারে নিমজ্জিত হয়েছিল। অগ্রণী ব্যাংকের একজন জুনিয়র কর্মকর্তা বাবা অকালে পরলোকগমন করেন, যখন তাহমিনা পারভীনের বয়স মাত্র দুই বছর এবং তার ছোট ভাইয়ের বয়স ছিল মাত্র ১৭ দিন। সেই অবুঝ বয়সে এক অদম্য সংগ্রামী মা ও তিন ভাই-বোনকে নিয়ে জীবনের যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা আজও জকিগঞ্জ উপজেলার অনেক মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।

জকিগঞ্জ উপজেলার ৪ নম্বর খলাছড়া ইউনিয়নের উত্তর মাদারখাল গ্রামের বাসিন্দা আলোকিত শিক্ষক তাহমিনা পারভীন।

বিজ্ঞাপন

তাহমিনা পারভীনের গল্প এক নিরলস সংগ্রামের গল্প, যেখানে অভাব-অনটন, দুঃখ-কষ্ট এবং সামাজিক নানা চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে উঠে এসেছে শিক্ষা ও নিষ্ঠার প্রতি তার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। তার মা নূরুন্নাহার সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার রহিমগঞ্জ ইউনিয়নের তিলাটিয়া গ্রামে নানাবাড়িতে গিয়ে ওঠেন এবং সেখানেই বসবাস শুরু করেন। অভাবের মধ্যেও সন্তানদের শিক্ষিত করার জন্য মায়ের সীমাহীন ত্যাগ বৃথা যায়নি। আজ বড় ভাই সরকারি চাকরিতে, ছোট ভাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এবং তাহমিনা পারভীন নিজে শিক্ষকতার মহৎ পেশায় আত্মনিয়োগ করেছেন।

শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল কঠোর পরিশ্রমের। নানাবাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি পঙ্গুয়াই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতেন। ১৯৯২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ফুলপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে বিএসএস ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ময়মনসিংহ থেকে বিএড ডিগ্রি লাভ করেন। তবে জ্ঞান অন্বেষণের এই স্পৃহা সেখানেই থেমে থাকেনি। ২০২৪ সালে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে সিজিপিএ ৩ দশমিক ৯৮ অর্জন করে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন এবং এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

স্বামী এমএ ফাত্তাহর সঙ্গে দাম্পত্য জীবন ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের মধ্যেও তিনি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। ১৯৯৯ সালের জুন মাসে তিনি সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ঈদগাহ বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ২৫ বছরের কর্মজীবনে তার মেধা, শ্রম, সৃজনশীলতা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে তিনি শিক্ষার্থী, সহকর্মী, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি এবং স্থানীয় জনগণের কাছে একজন জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকে পরিণত হয়েছেন।

তাহমিনা পারভীনের শিক্ষাদান পদ্ধতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। বিশেষ করে, বয়ঃসন্ধিকালীন ছাত্রীদের মানসিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে শোনেন। বন্ধুসুলভ ও মাতৃত্বসুলভ আচরণের মাধ্যমে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক দৃঢ় মানবিক সেতুবন্ধ গড়ে তুলেছেন, যা আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করে।

পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতেও তিনি অনন্য। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি)-ভিত্তিক মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের ‘কানেক্টিং ক্লাসরুম’ প্রশিক্ষণে সফলভাবে অংশ নিয়ে তিনি যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে সম্মানজনক একটি পুরস্কার লাভের অপেক্ষায় রয়েছেন।

তাহমিনা পারভীন বলেন, তিনি নিজেকে একজন সাধারণ নারী হিসেবেই দেখতে ভালোবাসেন। তবে তার জীবনগাথা যদি অন্যদের অনুপ্রাণিত করে, সেটিই হবে তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। বিশেষ করে, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ যেন তার জীবনসংগ্রাম থেকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পায়—এটাই তার বড় প্রত্যাশা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন