সংগ্রাম, সাহস ও সাফল্যের সাতকাহন

আমানুর রহমান

সংগ্রাম, সাহস ও সাফল্যের সাতকাহন

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের প্রধান কারিগর আজ নারী। পোশাক কারখানার চাকা ঘোরানো থেকে শুরু করে জননিরাপত্তায় পুলিশের উর্দিতে কিংবা আগামীর কারিগর গড়ার শ্রেণিকক্ষে—সব ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ আজ কেবল সংখ্যাতত্ত্বের বিষয় নয়, বরং তা এক মূর্ত বিপ্লব। তবে ক্ষমতায়নের এই সুদীর্ঘ পথটি এখনো কুসুমাস্তীর্ণ নয়; বরং সেখানে মিশে আছে গর্ভাবস্থায় চাকরি হারানোর শঙ্কা, সামাজিক কটূক্তি কিংবা পারিবারিক ও পেশাগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষার প্রাণান্তকর চেষ্টা।

সুইং অপারেটর রাবেয়া

বিজ্ঞাপন

​‘আমি রাবেয়া। ১৫ বছর ধরে পোশাক কারখানায় কাজ করছি; এখন আছি সুইং অপারেটর হিসেবে। মেশিনের চাকা ঘুরিয়েই আমার জীবন কাটে। কারখানার ভেতরে নিরাপত্তা এখন আগের চেয়ে ভালো হলেও ডিউটি শেষে বাড়ি ফেরার পথে আমাদের নারী শ্রমিকদের মনে অনেক ভয় কাজ করে। কারখানার ভেতরেও সবসময় স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বা পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পাওয়া যায় না। অন্যদিকে বাজারের যা অবস্থা তাতে এই সামান্য বেতনে সংসার টানা এখন এক কঠিন লড়াই। নিজেদের অধিকার আর আইন নিয়ে আগের চেয়ে সচেতন হলেও ন্যায্য পাওনা চাইতে গেলেই নানা বিপদে পড়তে হয়। সবচেয়ে বড় কষ্ট হয় গর্ভাবস্থায়। কাগজে-কলমে ছুটির কথা থাকলেও সন্তানসম্ভবা অবস্থায় ছুটি চাইতে গেলে অনেক গালমন্দ শুনতে হয়, এমনকি চাকরি হারানোর ভয়ও থাকে। আমরা তো বেশি কিছু চাই না; শুধু চাই কাজের জায়গায় নিরাপত্তা, শ্রমের সঠিক মূল্য আর সম্মানের সঙ্গে কাজ করার অধিকার।’

রাবেয়া খাতুন, সুইং অপারেটর, আরএস গার্মেন্টস, ঢাকা

পুলিশ কনস্টেবল সুমাইয়া

​‘আমি কনস্টেবল (২৩৪২) সুমাইয়া। আড়াই বছর ধরে ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ থানায় কর্মরত আছি। বাড়ি ছেড়ে একা নারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সমাজের কিছু মানুষের নেতিবাচক কটূক্তির শিকার হলেও আমি কখনো দমে যাইনি; কারণ আমার সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সবসময় পরিবারের মতো পাশে থেকে আমাকে সাহস জুগিয়েছেন।

ৃু

পুলিশ বিভাগে আমাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো সমাজের নির্যাতিত ও অবহেলিত নারীদের পাশে দাঁড়ানো। অনেক নারী ভয়ে বা লজ্জায় পুরুষ পুলিশের কাছে নিজেদের সমস্যার কথা বলতে দ্বিধা করেন, কিন্তু তারা আমাদের কাছে স্বচ্ছন্দে সবকিছু খুলে বলতে পারেন। তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সুগম করে দিয়ে আমি পেশাগতভাবে ভীষণ গর্ববোধ করি। আমাদের কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য নিরাপদ আবাসন থাকলেও জনবলের তুলনায় জায়গার স্বল্পতার কারণে অনেককেই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে হচ্ছে। এর দ্রুত সমাধান হওয়া জরুরি। বর্তমানে প্রতিটি থানায় নারী পুলিশ নিযুক্ত থাকায় সাধারণ নারীরা এখন নির্ভয়ে আইনি সহায়তা পাচ্ছেন, যা সমাজের জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবর্তন।’

সুমাইয়া ইসলাম শিমলা, কনস্টেবল, নবাবগঞ্জ থানা, বাংলাদেশ পুলিশ

শিক্ষিকা সোনিয়া সাহানী

​‘শিক্ষকতা আমার কাছে কেবল পেশা নয়; এটি মানুষ গড়ার ব্রত ও সততার সঙ্গে উপার্জনের একটি সম্মানজনক মাধ্যম। নারীদের জন্য এটি সুবিধাজনক বলে বিবেচিত হলেও বাস্তবে পেশাটি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ২০ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখেছি—সমাজ, পাঠক্রম ও শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্বে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষকদের ওপর এখন শুধু পড়ানোর দায়িত্বই নেই, বরং তথ্যপ্রযুক্তি ও বাড়তি প্রশাসনিক কাজের চাপও অনেক বেড়েছে।

টিপড

অনেক অভিভাবক দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা ক্লাসের ওপর নির্ভর করে সন্তানের সম্পূর্ণ নৈতিক, আচরণগত ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দায়ভার শিক্ষকের কাঁধে চাপিয়ে দেন। এমনকি শিক্ষার্থীর সামনেই তারা শিক্ষকের সমালোচনা করেন, যা শ্রেণিকক্ষের শৃঙ্খলা ও শিক্ষকের মর্যাদাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করে। এই বাস্তবতায় আমাদের প্রত্যাশা—অভিভাবকেরা শিক্ষকদের প্রতিযোগী না ভেবে সহযোগী ভাববেন এবং পরিবার থেকেই শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার ভিত তৈরি করবেন। সব প্রতিকূলতা, সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও মানসিক চাপের মাঝেও আমি চাই সঠিক সামাজিক মূল্যায়ন ও যথাযথ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে নারীরা এই মহান পেশায় আরো স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসুক।’

সোনিয়া সাহানী, সিনিয়র শিক্ষক, নারায়ণগঞ্জ আইডিয়াল স্কুল

ব্যাংকার হাসিনা মমতাজ

​‘ছোটবেলার করপোরেট স্বপ্নের হাত ধরে ব্যাংকিং পেশায় আমার ১৭ বছরের পথচলা। নারী ব্যাংকার হিসেবে পেশাগত লক্ষ্যমাত্রা ও পারিবারিক দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষা করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। এই চাপ সামলাতে আমি দিনের শুরুতেই কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করি এবং সময়ের কাজ সময়ে শেষ করে ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখার চেষ্টা করি। তবে নারীদের জন্য ঊর্ধ্বতন পদে যাওয়ার পথটি কখনোই মসৃণ নয়। মাতৃত্বকালীন ছুটি বা সময়মতো অফিস ত্যাগের মতো বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ সহকর্মীদের কাছে নেতিবাচক সমালোচনার শিকার হয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, বদলি-আতঙ্ক এবং ডে-কেয়ার ও নিরাপদ যাতায়াতের অভাব নারীদের ক্যারিয়ার বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

পডযড়

এত সব প্রতিকূলতার মাঝেও সঠিক সময় ব্যবস্থাপনা এবং জীবনসঙ্গীর অকুণ্ঠ সমর্থন আমাকে টিকিয়ে রেখেছে। কর্মক্ষেত্র ও পরিবারের সীমারেখা স্পষ্ট করে এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে কাজের ধরন নিয়ে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমেই আমি এই চ্যালেঞ্জিং অথচ স্বপ্নের পেশায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছি।’

হাসিনা মমতাজ, এসএভিপি, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি

​ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ শ্যামলী আক্তার

​‘২০০৭ সালে এসএসসি পাসের পর জীবিকার খোঁজে ঢাকায় এসে পোশাকশিল্পে কাজ শুরু করি। এরপর একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হওয়ার পর বদলে যায় আমার জীবনের গতিপথ। শিক্ষার্থী থেকে প্রশিক্ষক হয়ে ওঠার পাশাপাশি গ্রাফিক ডিজাইন, ইউআই/ইউএক্স (UI/UX), অ্যানিমেশন ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো নানা দক্ষতা অর্জন করেছি। বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করার মধ্য দিয়ে আজ আমি দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে এই সম্মানজনক পেশায় যুক্ত আছি।

চপড

আমার এই পথচলাই প্রমাণ করে, ডিজিটাল অর্থনীতি কীভাবে আমাদের কাজের ধরনে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। ফ্রিল্যান্সিং আজ নারীদের স্বাধীনভাবে কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দারুণ সুযোগ দিচ্ছে। তবে নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা না থাকায় অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বীকৃতির অভাবের মতো কিছু চ্যালেঞ্জও এখানে রয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং কেবল সাময়িক কাজ নয়, এটি ভবিষ্যতের অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ভিত্তি। তাই এ খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সরকারি নীতিগত সহায়তা, সামাজিক স্বীকৃতি এবং ফ্রিল্যান্সারদের স্বাস্থ্য ও সময় সচেতনতা। সঠিক পরিকল্পনায় এটি দেশের অর্থনীতিতে আরো বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম।’

শ্যামলী আক্তার, ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ; এনএসডিএ প্রত্যয়িত প্রশিক্ষক ও মূল্যায়নকারী

মনোবিদ সামছুন নাহার

​‘পেশাদার মনোবিজ্ঞানী হিসেবে দীর্ঘ ১৭ বছরের ক্যারিয়ারে অসংখ্য কর্মজীবী নারীর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছে। আমি দেখেছি, প্রতিটি কর্মক্ষেত্রেই নারীরা নিজস্ব স্বকীয়তায় সফলভাবে কাজ করছেন। তবে সফলতার পাশাপাশি তাদের মানসিক চাপ ও বিভিন্ন নেতিবাচক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। এক্ষেত্রে তারা আমার পরামর্শে চাপের উৎস ও নিজস্ব সক্ষমতা চিহ্নিত করে সমাধানের নতুন কৌশল বের করেছেন এবং পূর্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সাফল্য পেয়েছেন।

পডয

পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সঠিক মূল্যায়ন ও ন্যায্য প্রাপ্যতার মাধ্যমেই আদর্শ কর্মপরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। কর্মক্ষেত্রে রুক্ষ আচরণ, পরনিন্দা, অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দেওয়া বা যৌন নিপীড়নসহ যেকোনো হয়রানির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। মানসিক সুস্থতার জন্য কর্মক্ষেত্র ও ব্যক্তিগত জীবনকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা উচিত। অবসাদ কাটাতে প্রফেশনাল কাউন্সেলিং, শখের চর্চা, ভ্রমণ, নিয়মিত শরীরচর্চা, পরিমিত আহার ও পর্যাপ্ত ঘুম ভীষণ প্রয়োজন। সর্বোপরি নিজের আত্মবিশ্বাস, আত্মনিয়ন্ত্রণ, ইতিবাচক চিন্তা এবং সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাই একজন নারী কর্মীকে সব প্রতিকূলতা জয় করে সাফল্যের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।’

সামছুন নাহার, সিনিয়র কনসালট্যান্ট, এমএসই সেন্টার, মগবাজার, ঢাকা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন