নবজাতকের জন্য প্রথম ম্যালেরিয়া ওষুধ

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ

নবজাতকের জন্য প্রথম ম্যালেরিয়া ওষুধ

ম্যালেরিয়া এখনো বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ। প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ এতে আক্রান্ত হয় এবং সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল নবজাতক ও অতি অল্প বয়সি শিশুদের জন্য আলাদাভাবে অনুমোদিত কোনো ম্যালেরিয়া ওষুধ ছিল না। অবশেষে সেই ঘাটতি পূরণ হলো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সম্প্রতি নবজাতক ও ছোট শিশুদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি প্রথম ম্যালেরিয়া ওষুধ Coartem Baby অনুমোদন দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ‘major public health milestone’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

কেন এটি যুগান্তকারী

বিজ্ঞাপন

এত দিন নবজাতক শিশুদের ম্যালেরিয়া চিকিৎসায় বড় শিশুদের জন্য তৈরি ওষুধ ভেঙে বা অনুমানভিত্তিক ডোজে ব্যবহার করতে হতো। এতে ডোজের ভুল, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং চিকিৎসা ব্যর্থতার ঝুঁকি ছিল। নতুন ওষুধটি বিশেষভাবে দু-পাঁচ কেজি ওজনের নবজাতক ও অল্পবয়সি শিশুদের জন্য তৈরি, যা চিকিৎসাকে নিরাপদ, বৈজ্ঞানিক এবং সহজ করবে। এটি এমনভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে, যাতে সহজে গলিয়ে বা তরল আকারে শিশুকে খাওয়ানো যায়, যা নবজাতক চিকিৎসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

ওষুধটির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি

Coartem Baby একটি সমন্বিত অ্যান্টিম্যালেরিয়াল থেরাপি (Artemisinin-based Combination Therapy বা ACT)। এতে রয়েছেÑ

Artemether—দ্রুত ম্যালেরিয়া পরজীবী ধ্বংস করে।

Lumefantrine—অবশিষ্ট পরজীবী নির্মূল করে আবার সংক্রমণ কমায়।

এই যৌথ চিকিৎসা বিশেষ করে Plasmodium falciparum ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর, যা বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক ম্যালেরিয়া প্রজাতি।

বিশ্বব্যাপী প্রভাব

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুবরণকারী শিশুদের একটি বড় অংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। নবজাতকদের ক্ষেত্রে রোগ দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে এবং সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এই নতুন ওষুধ যে কাজগুলো করবেÑ

✔️ নবজাতকের জন্য নির্ভুল ডোজ নিশ্চিত করবে।

✔️ চিকিৎসা বিলম্ব কমাবে।

✔️ ভুল ওষুধ ব্যবহারের ঝুঁকি হ্রাস করবে।

✔️ শিশুমৃত্যু কমাতে সহায়ক হবে।

ফলে এটি বৈশ্বিক শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বাংলাদেশে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ আগের তুলনায় কমলেও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এখনো রোগটি বিদ্যমান। নবজাতক ও গর্ভবতী নারীরা বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। এই চিকিৎসা ভবিষ্যতেÑ

উপজেলা ও কমিউনিটি পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায়

নবজাতক চিকিৎসাব্যবস্থায়

জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে

একটি কার্যকর সংযোজন হতে পারে।

সামনে করণীয়

ওষুধ অনুমোদন একটি বড় সাফল্য হলেও বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছেÑ

নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা

স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ

দ্রুত রোগনির্ণয় সুবিধা সম্প্রসারণ

ওষুধপ্রতিরোধ ক্ষমতা (drug resistance) পর্যবেক্ষণ

সবশেষে বলব, নবজাতক শিশুদের জন্য প্রথম ম্যালেরিয়া ওষুধের অনুমোদন চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানবিক সাফল্যের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এটি শুধু একটি নতুন ওষুধ নয়Ñবরং পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জীবনরক্ষায় নতুন আশার আলো। ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলে প্রতিরোধ, টিকা, সচেতনতা এবং আধুনিক চিকিৎসার সমন্বয়ই ভবিষ্যতের পথ নির্দেশ করবে। নবজাতকের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি

শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ, ঢাকা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন