আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

শিশুর খাবারে অরুচি কেন

ডা. হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া

শিশুর খাবারে অরুচি কেন

‘আমার বাচ্চা কিছুই খেতে চায় না’—এই অভিযোগ প্রায় প্রতিদিনই শোনা যায়। বিশেষ করে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সের শিশুরা হঠাৎ খাওয়া কমিয়ে দেয়, পছন্দের খাবারেও মুখ ঘুরিয়ে নেয়। কেউ কেউ সারা দিন শুধু দুধ খেতে চায়, কেউ আবার কেবল ভাজাপোড়া, বাইরের খাবার বা মিষ্টির জন্য কান্নাকাটি করে। অনেক অভিভাবক দুশ্চিন্তায় পড়ে যান—‘এটা কি শিশুর শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে, নাকি এটা একেবারেই স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার অংশ?’

বিজ্ঞাপন

শিশুদের এই বয়সে শরীর বাড়ার গতি তুলনামূলকভাবে কমে যায়। জন্মের প্রথম বছরে যে শিশুর সাত কেজি ওজন বাড়ে, তার দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সে বছরে মাত্র দুই কেজির মতো বাড়ে। ফলে তাদের ক্যালরির চাহিদাও কমে যায়। আর তারই প্রভাব পড়ে খাওয়ার পরিমাণ ও আগ্রহে। এ বয়সে শিশুরা নিজের পছন্দ-অপছন্দ বুঝতে শেখে এবং ‘না’ বলার ক্ষমতা আবিষ্কার করে। তাই সুযোগ পাওয়া মাত্রই না করে দেয় খাওয়ানোর সময়!

অনেক সময় অভিভাবকের অতিরিক্ত উদ্বেগ, জোর করে খাওয়ানো, বা মোবাইল-টিভি দেখে খাওয়ানোর অভ্যাস শিশুর স্বাভাবিক ক্ষুধা নষ্ট করে দেয়। খাওয়াকে আনন্দের বদলে একটা শাসনের উপলক্ষ বলে তারা মনে করে। কখনো আবার ভাইরাল জ্বর, ঠান্ডা, পেটের অসুখ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা রক্তস্বল্পতা থেকেও খাবারে অনীহা দেখা দেয়।

তবে সব অরুচি চিন্তার কারণ নয়। যদি শিশু মাঝে মাঝে কয়েক দিন খাবার কম খায়, মাঝে মাঝে পছন্দের খাবারে আগ্রহ দেখায়, ওজন ঠিকমতো বাড়ে, খেলাধুলা করে, হাসিখুশি থাকে, তাহলে এটিকে স্বাভাবিক ধরা হয়। বিপদ তখনই যখন খাওয়া একেবারেই কমে যায়, একটানা দু-তিন সপ্তাহ ধরে কিছু খেতে চায় না, ওজন কমে যায় বা শিশুর মধ্যে দুর্বলতা, মনমরা ভাব ও অস্বাভাবিক স্থবিরতা দেখা দেয়।

শিশুকে সঠিকভাবে খাওয়াতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন আচরণগত পরিবর্তনের। শিশুকে ছোট ছোট পরিমাণে খেতে দিন, দিনে পাঁচ-ছয়বার খাওয়ান। খাবারে বৈচিত্র্য আনুন। খাবার খাওয়ানোর সময় স্ক্রিন বন্ধ রাখুন। পরিবারে সবাই মিলে একসঙ্গে বসে খাওয়ার পরিবেশ গড়ে তুলুন। বাচ্চাকে নিজের হাতে খেতে উৎসাহ দিন। রঙিন চামচ, প্লেট কিংবা বাটি ব্যবহারে আগ্রহ বাড়ে। কখনো জোর করে খাওয়ানো উচিত নয়। এতে শিশুর মধ্যে খাদ্যভীতি গড়ে ওঠে। খাবার নির্বাচনে মনোযোগী হোন। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় দুধ, ডিম, ভাত, ডাল, সবজি, ফলমূল ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। কলা, পেঁপে, শাক, খেজুর, ঘি, তিল ইত্যাদি খাবারে ক্যালরি ও আয়রন বেশি থাকে, যা ক্ষুধা বাড়াতে সাহায্য করে। শিশুকে জোর করে নয়, চমকপ্রদ গল্প বা খেলাধুলার ছলে খাওয়ানো যেতে পারে। ফল খাওয়ানোর ক্ষেত্রে জুসের পরিবর্তে চিবিয়ে খাওয়া যায়, এমন ফল অনেক বেশি উপকারী। যদি খাবারে অনীহা দীর্ঘস্থায়ী হয়, বা শিশুর ওজন স্বাভাবিক গ্রোথ চার্টের নিচে চলে যায়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। অনেক সময় রক্তস্বল্পতা, প্যারাসাইটিক ইনফেকশন (যেমন কৃমি), থাইরয়েড সমস্যা কিংবা আবেগ ও মানসিক কারণেও শিশুর ক্ষুধা কমে যেতে পারে। তখন প্রয়োজন হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ প্রয়োগ বা বিশেষজ্ঞের রেফার।

শেষ কথা হলো—খাবারের সঙ্গে শিশুর সম্পর্ক যেন ভয় নয়, আনন্দের হয়। শিশুকে নিয়ে খাওয়ার সময় ধৈর্য ধরুন, খাবার নিয়ে চাপ না তৈরি করে ভালোবাসার সঙ্গে খাওয়াতে চেষ্টা করুন। একদিন সে নিজেই খেতে চাইবে, যদি আপনি তাকে খাবারের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে শেখাতে পারেন।

লেখক : নবজাতক শিশু বিশেষজ্ঞ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন