মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ভাস্কর্য বিভাগের স্নাতকোত্তর শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী শাকিল আহমেদ (২৪) আত্মহত্যা করেছেন। ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়া ও পরিবারের ওপর চাপকে তার আত্মহত্যার কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে।
গত সোমবার দিবাগত রাতে নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন শাকিল। আজ মঙ্গলবার সকালে দক্ষিণ জামশা গ্রামে তার বাড়ি থেকে লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত শাকিল উপজেলার দক্ষিণ জামশা গ্রামের নাসিরুদ্দিন আহমেদের ছেলে।
কী ঘটেছিল?
শাকিলের সহপাঠী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৭-৮ মাস আগে শাকিল ফেসবুকে ইসলামিক একটি পোস্টে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন। পরে তিনি নিজেই তা মুছে ফেলেন। কিন্তু গতকাল সোমবার ওই মন্তব্য পুনরায় ফেসবুকে ভাইরাল হলে স্থানীয়রা তার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। সোমবার রাতে গ্রামের কয়েকশ লোক তার বাড়িতে গিয়ে তাকে ও তার পরিবারকে হুমকি দেন বলে জানা যায়। এ অবস্থায় নিজের ও পরিবারের সম্মানহানির আশঙ্কা ও সামাজিক চাপের কথা ভেবে রাত দুইটার দিকে শাকিল আত্মহত্যার পথ বেছে নেন বলে মনে করা হচ্ছে।
দক্ষিণ জামশা বাজারের দোকানি ও শাকিলের প্রতিবেশী দিদার আলী বলেন, প্রায় ৭-৮ মাস আগে নিজের ব্যবহৃত ফেসবুক আইডি থেকে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে কটুক্তিকর কমেন্ট করেন শাকিল। তবে পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে তিনি ওই কমেন্টস সরিয়ে ফেলেন। এরপর গত সোমবার ওই কমেন্ট ফেসবুকে নতুন করে ভাইরাল হয়।
আত্মহত্যার আগের ফেসবুক পোস্ট
শাকিল আত্মহত্যার আগে ফেসবুকে একের পর এক চারটি পোস্ট করেন। শেষ পোস্টে তিনি লেখেন, "আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী না। আমি নাস্তিক নই, গ্রামের সবাই আমাকে নাস্তিক বলছে। আমি জানি আর আমার আল্লাহ জানে, আমি নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে কোনো কটুক্তি করিনি। আমাকে নিয়ে আমার বাবা অনেক গর্ব করতেন, গ্রামের সবাই আমাকে সম্মান করত। আজ আমি আমার আপন মানুষের কাছেই সম্মান হারালাম। আগামীকাল আমার বাবাকে সবাই গালি দেবে, মাকে অসম্মান করবে—এই লজ্জা আমি সহ্য করতে পারব না। একটা ছেলে হয়ে বাবা-মায়ের মানসম্মান নষ্ট করে বাঁচতে পারব না। আত্মহত্যা মহাপাপ, কিন্তু আজ আমি শেষ পাপটাই করলাম।"
পুলিশ ও স্থানীয়দের বক্তব্য
সিঙ্গাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌফিক আজম বলেন, "শাকিলের আত্মহত্যার ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। তার লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে ধর্মীয় মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক চাপ ও পারিবারের মান-সমান রক্ষার তাগিদেই তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।"
এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে বলেও জানান ওসি।
শাকিলের খালাতো বোন মুক্তা আক্তার বলেন, "গত রাতেই লোকজন বাড়িতে এসে হুমকি দিয়েছিল। এরপরই শাকিল ভাই আত্মহত্যা করেন। আমরা সবাই হতভম্ব।"
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, "আমরা উক্ত ঘটনা তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবো।"
অন্যদিকে, সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগলেই যেন কাউকে বিচার-বহির্ভূত হুমকি না দেওয়া হয়— এমন দাবি তুলেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

