তোমরা কি কখনো ভেবেছ, গল্পের বইয়ের ভেতরে যে মজার মানুষগুলো থাকে, তারা কোথা থেকে আসে? তাদের হাসি, বুদ্ধি ও দুষ্টুমি কে বানিয়ে দেন? আমাদের বাংলা শিশুসাহিত্যে এমনই একজন গল্পের জাদুকর ছিলেন মোহাম্মদ নাসির আলী। তিনি জন্মেছিলেন ১৯১০ সালের ১০ জানুয়ারি, বিক্রমপুরের ধাইদা গ্রামে। আর ১৯৭৫ সালের ৩০ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ঢাকার গেন্ডারিয়ায় নিজ বাসায় তিনি পৃথিবীকে বিদায় জানান। কিন্তু তার গল্পগুলো আজও ছোটদের মুখে হাসি ফোটায়।
মোহাম্মদ নাসির আলী ছোটদের খুব ভালোবাসতেন। তিনি জানতেন—তোমরা শুধু পড়তে চাও না, জানতে চাও, ভাবতে চাও, কখনো রহস্যভেদ করতে চাও, কখনো আবার হেসে গড়িয়ে পড়তে চাও। তাই তার গল্পে কখনো আছে হাসির ফোয়ারা, কখনো আছে সাহসী মানুষের কাহিনি, কখনো আছে দূর দেশের রোমাঞ্চকর ভ্রমণ।
মোহাম্মদ নাসির আলী বই লিখেছেন ৪১টি। তার জনপ্রিয় বইয়ের মধ্যে অন্যতম বইটি হলো ‘লেবু মামার সপ্তকাণ্ড’। লেবু মামার কাণ্ডকারখানা পড়লে মনে হবে, এমন মজার মানুষ যদি সত্যিই আমাদের পাড়ায় থাকতেন। ‘বোকা বকাই’ বইটিতে আছে মজার সব ঘটনা। ‘ভিনদেশি এক বীরবল’ তোমাকে নিয়ে যাবে বুদ্ধির খেলায়। ‘আকাশ যারা করল জয়’ বইটি বিমান আবিষ্কারক দুই ভাই উইলবার রাইট ও অরভিল রাইটের দুঃসাহসিক আবিষ্কারের কথা বলে, যারা স্বপ্ন দেখেছিলেন আকাশ ছোঁয়ার। ‘ইতালির জনক গ্যারিবল্ডি’ জনপ্রিয় আরেকটি বই। এই বইয়ে আছে ইতালির স্বাধীনতা এনে দেওয়া এক বীর যোদ্ধার কথা, আর ‘ইবনে বতুতার সফরনামা’ পড়লে মনে হবে, তুমিও যেন দূর দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছ। ‘একটি গোয়েন্দা কুকুরের কাহিনি’ রহস্য আর রোমাঞ্চে ভরা, যেখানে এক কুকুরই হয়ে ওঠে নায়ক।
মোহাম্মদ নাসির আলী শুধু গল্প লিখেই থেমে থাকেননি। তিনি ছোটদের জ্ঞানের জগৎ বড় করে তুলতে চেয়েছেন। ইতিহাসকে সহজ করে বলেছেন, দূরের মানুষদের কাছে এনে দিয়েছেন গল্পের ভেতর দিয়ে। তার লেখার ভাষা সহজ, মিষ্টি আর প্রাণবন্ত। তিনি কঠিন শব্দে ভরিয়ে দেননি কোনো বই, যেন পরিবারের একজন অভিভাবক বসে গল্প শোনাচ্ছেন। বই প্রকাশনাকে নিয়মিত রাখার জন্য তিনি ‘নওরোজ কিতাবিস্তান’ নামে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তোমরা জেনে উচ্ছ্বসিত হবে, নওরোজ কিতাবিস্তান নামটি রেখেছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুল মোহাম্মদ নাসির আলীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।
শিশুসাহিত্যের অঙ্গনে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন বাংলা একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, ইসলামি ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক (মরণোত্তর হিজরি ১৪০০ সাল), ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক সম্মাননা (১৯৬৮ সাল), পাকিস্তান রাইতার’স গিল্ড স্বর্ণপদক, লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের স্বীকৃতি এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র স্বর্ণপদকসহ (মরণোত্তর ১৯৭৮ সাল) আরো নানা পুরস্কার। এসব পুরস্কার প্রমাণ করে, তিনি শুধু ছোটদের প্রিয় ছিলেন না, বড়দের কাছেও সম্মানিত ছিলেন।
তোমরা যদি মোহাম্মদ নাসির আলীর কোনো বই হাতে নাও, দেখবে বইয়ের পাতাগুলো যেন তোমাদের সঙ্গে কথা বলছে। গল্পের ভেতর দিয়ে তুমি শিখবে নতুন কিছু, জানবে অজানা অনেক কথা; আর সবচেয়ে বড় কথা—বই ভালোবাসতে শিখবে। বই হয়ে উঠবে তোমার প্রিয় সঙ্গী। কারণ ছোটদের এই প্রিয় সাহিত্যিক বিশ্বাস করতেন—যে শিশু বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, সে কখনো একা থাকে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

