দেশ গত দুই দশকে স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য, কমিউনিটি ক্লিনিকভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং গড় আয়ু বৃদ্ধির মতো সূচক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে দাঁড়িয়েছেÑদেশের স্বাস্থ্যনীতি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা কি সাধারণ মানুষের জন্য সত্যিকার অর্থে কার্যকর, স্বচ্ছ ও রোগীকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে?
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে নীতিমালা, কৌশলপত্র ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব নেই। জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি, ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ (ইউএইচসি) রোডম্যাপ, জলবায়ু-সংবেদনশীল স্বাস্থ্য পরিকল্পনা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার উদ্যোগÑসবই কাগজে-কলমে সুসংগঠিত। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো রয়ে গেছে বহু সীমাবদ্ধতা। দেশ এখনো মূলত ২০১১ সালের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য উন্নয়ন, সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ নিশ্চিত করা এবং কমিউনিটি ক্লিনিকভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণ। এর পাশাপাশি ২০২৬-৩৫ সালের ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ (ইউএইচসি) রোডম্যাপ স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে সামনে এসেছে। এর লক্ষ্য চিকিৎসা ব্যয়ে আর্থিক সুরক্ষা, ধীরে ধীরে জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা চালু করা, রেফারেল সিস্টেম উন্নত করা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ। কিন্তু বাস্তবচিত্র এখনো উদ্বেগজনক। দেশে স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিগত ব্যয় অত্যন্ত বেশি; অনেক পরিবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছে।
অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ২০২৬ সালে ‘হেলথ ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান (এইচএনএপি)’ গ্রহণ করেছে। এতে জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি, রোগ নজরদারি এবং তাপজনিত অসুস্থতা মোকাবিলায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত চ্যালেঞ্জ শুধু নীতিমালায় নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আজও দেশের অনেক সরকারি হাসপাতালের গেট পেরোনোর আগেই রোগীরা অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েন। দূরদূরান্ত থেকে চিকিৎসার আশায় আসা মানুষজন প্রায়ই বুঝতে পারেন না কোথায় যাবেন, কোন বিভাগে দেখাবেন বা কীভাবে চিকিৎসা শুরু করবেন। এই অনিশ্চয়তার সুযোগে সক্রিয় হয়ে ওঠে একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালচক্র।
রাজধানী থেকে জেলা শহর অনেক বড় সরকারি হাসপাতালের আশপাশে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক। তারা নিজেদের কখনো ‘সহায়ক’, কখনো ‘গাইড’ বা ‘পরিচিত লোক’ হিসেবে পরিচয় দেয়। নতুন রোগীদের বিভ্রান্ত করে নির্দিষ্ট ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় কমিশনের ভিত্তিতে। এর ফলে চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই রোগী একটি অস্বচ্ছ ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে পড়েন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অসুস্থতার কারণে রোগী ও তার পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তখন দুর্বল থাকে। গ্রাম থেকে আসা মানুষদের জন্য সমস্যা আরো জটিল। হাসপাতালের টিকিট পদ্ধতি, বিভাগ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার নিয়ম সম্পর্কে অজ্ঞতা তাদের সহজ লক্ষ্য বানিয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রেই পরে দেখা যায়, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা অতিরিক্ত খরচ রোগীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার শিকড় শুধু দালালচক্রে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি হাসপাতালগুলোয় অতিরিক্ত রোগীর চাপ, জনবল সংকট, দীর্ঘ অপেক্ষা, তথ্যসেবার অভাব এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা রোগীদের বিকল্প ‘সহায়তা’ খুঁজতে বাধ্য করে। এই ব্যবস্থাগত দুর্বলতাই দালালচক্রকে টিকিয়ে রাখছে। এই পরিস্থিতি চিকিৎসক রোগী সম্পর্কের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক রোগী মনে করেন, চিকিৎসক বা হাসপাতাল প্রশাসন এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত, যদিও বাস্তবে অধিকাংশ চিকিৎসকই এ ধরনের কার্যকলাপের বিরোধী। ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানÑবিশ্বাস ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য খাতের আরো কিছু বড় চ্যালেঞ্জ হলো চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি, শহরমুখী স্বাস্থ্যকর্মী বণ্টন, দুর্বল রেফারেল ব্যবস্থা, প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্নীতি এবং সরকারি হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগীর চাপ। ২০২৫-২৬ সময়ে যক্ষ্মার ওষুধ, জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন, পরিবার পরিকল্পনাসামগ্রী এবং অ্যান্টিভেনম সরবরাহে বিঘ্নের খবরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এছাড়া ২০২৬ সালে হাম রোগের পুনরুত্থান জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। টিকাদান কাভারেজে ঘাটতি, নজরদারির দুর্বলতা এবং জনসচেতনতার অভাব ভবিষ্যতের জন্য বড় সতর্কবার্তা। তবু আশার জায়গা রয়েছে। বাংলাদেশের কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো দেশের অন্যতম শক্তি। কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, টিকাদান কর্মসূচি এবং এনজিও অংশীদারত্ব দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিয়েছে। একই সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমান বাস্তবতায় স্বাস্থ্য খাতকে আরো কার্যকর করতে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন
* স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেট বৃদ্ধি
* জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা চালু
* প্রতিটি হাসপাতালে দৃশ্যমান রোগী সহায়তা কেন্দ্র
* ডিজিটাল তথ্য ও টোকেনব্যবস্থা
* রেফারেল ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ
* হাসপাতাল এলাকায় নিরাপত্তা ও নজরদারি বৃদ্ধি
* দালালচক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান
* চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ বৃদ্ধি
* জেলাপর্যায়ে বিশেষায়িত সেবা সম্প্রসারণ
* রোগ নজরদারি ও জনসচেতনতা জোরদার করা
স্বাস্থ্যসেবা শুধু চিকিৎসা নয়; এটি আস্থা, নিরাপত্তা এবং মানবিকতার বিষয়। একজন রোগী যখন হাসপাতালে আসেন, তখন তিনি শুধু ওষুধ নয় নির্ভরযোগ্য দিকনির্দেশনা, সম্মান এবং নিরাপদ পরিবেশ প্রত্যাশা করেন। স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হবে, যখন হাসপাতালের গেট পার হওয়ার মুহূর্ত থেকেই রোগী নিজেকে সুরক্ষিত, সম্মানিত এবং সঠিক সেবার আওতায় মনে করবেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

