অসহায় রোগীদের পাশে ‘দিগন্ত মেমোরিয়াল ক্যানসার ফাউন্ডেশন’

অসহায় রোগীদের পাশে ‘দিগন্ত মেমোরিয়াল ক্যানসার ফাউন্ডেশন’

‘দিগন্ত মেমোরিয়াল ক্যানসার ফাউন্ডেশন’ সুন্দর একটা নাম। অথচ এই নামের পেছনে লুকিয়ে আছে এক বেদনাদায়ক গল্প। ঘটনাটা ২০০২ সালের। অধ্যাপক ডা. মো. নওফেল ইসলাম ও অধ্যাপক ডা. আইরিন পারভীন দম্পতির ছোট্ট ছেলে দিগন্ত; বয়স মাত্র এক বছর তিন মাস। ডাক্তার দম্পতি জানতে পারেন, তাদের ছোট্ট শিশু দিগন্ত মারণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত। শিগগিরই তার বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে হবে। এমন খবরে দিগন্তের বাবা-মা দুজনই ভেঙে পড়েন। ডা. নওফেল তার চিকিৎসক বন্ধুদের সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করেন। এর পরই বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মগবাজারের ইনসাফ বারাকাহ কিডনি অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে একটি বৈঠকে বসেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, যেহেতু এটি ব্যয়বহুল চিকিৎসা, তাই দিগন্তের জন্য একটি ফান্ড গঠন করা হবে। এরপর সিঙ্গাপুরে নিয়ে চিকিৎসা করানো হবে।

বৈঠকে এমন সিদ্ধান্তের পর খুব দ্রুতই একটি ফান্ড গঠন করা হয়। সেই ফান্ডে জমাও পড়ে অনেক টাকা। আর তাই দিগন্তকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে শুরুও করা হয় চিকিৎসা। কিন্তু ২০০২ সালের ১৩ মে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে দিগন্ত নামের প্রদীপটি নিভে যায়। এর পরই যাত্রা শুরু হয় ‘দিগন্ত মেমোরিয়াল ক্যানসার ফাউন্ডেশন’-এর। শুরুটা কীভাবে হয়েছিল জানতে চাইলে এই ফাউন্ডেশনের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘মরহুম বিচারপতি আব্দুর রউফ, ডক্টর ওমর ফারুক প্রমুখ এই প্রতিষ্ঠানের স্বপ্নদ্রষ্টা। ২০০২ সালে আমি তখন বরিশাল মেডিকেল কলেজ থেকে কেবল ঢাকা মেডিকেল কলেজে এসেছি। এসেই দিগন্তের জন্য তহবিল সংগ্রহ দিয়েই আমাদের অভিযান শুরু হয়। তহবিল গঠনে সাড়া ছিল ব্যাপক। কিন্তু আমাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়, দিগন্ত চলে যায় আল্লাহর কাছে। এরপর ২০০৩ সালে আমরা তহবিলে জমা টাকাগুলোর বিষয়ে বৈঠকে বসি; সিদ্ধান্ত হয় টাকাগুলো দিগন্তের বাবা-মায়ের হাতেই তুলে দেওয়া হবে। কিন্তু সন্তান হারানো বাবা-মা তহবিলের টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানান। যারা টাকাগুলো তহবিলে দিয়েছেন, তারাও ওগুলো নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাননি। তখন মরহুম বিচারপতি আব্দুর রউফ, ডা. মো. ওমর ফারুক, মাসুদ মজুমদার, ফারুক আল নাসির, ডাক্তার সাইফ উদ্দিন বেননুরসহ সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেন, চিকিৎসা তহবিলের টাকা দিয়ে এমন একটি প্রতিষ্ঠান শুরু করা যেতে পারে, যেখানে ক্যানসার-আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় সহযোগিতা করা যেতে পারে। এরপরই ২০০৩ সালের ২১ মার্চ যাত্রা শুরু হয় এই প্রতিষ্ঠানের ।’

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর মগবাজারে ‘দিগন্ত মেমোরিয়াল ক্যানসার ফাউন্ডেশন’ ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসাধীন সময়ে প্রতিদিন মাত্র ৩০০ টাকায় থাকা-খাওয়া, হাসপাতালে আসা-যাওয়া এবং কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করছে। ১২ বছর পর্যন্ত শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠানটি বিনা মূল্যে সেবা প্রদান করছে। ক্যানসার রোগীদের আর্থিক সহায়তাসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও মানসিক সহযোগিতা করে আসছে। দরিদ্র ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের জন্য বিশেষ সেবা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। নারী-পুরুষ সব মিলে প্রতিদিন প্রায় ৫০ জন রোগীর সেবা দিচ্ছে দিগন্ত মেমোরিয়াল ক্যানসার ফাউন্ডেশন। স্বাভাবিক খাবারের সঙ্গে রোগীদের সরবরাহ করছে পুষ্টিকর খাবার—দুধ, ডিম ও নানা রকমের ফল-মূল। যারা একেবারেই গরিব, যাদের চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য একেবারেই নেই, তাদের বিনা মূল্যে এই সেবা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। চিকিৎসাধীন কোনো রোগী যদি মারা যায়, তাহলে তাদের বাড়ি পাঠানো এবং দাফনের ব্যবস্থা বিনা মূল্যে করা হয়। এই ফাউন্ডেশনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ডা. রুহুল আমিন আরো বলেন, ‘আগামীতে আমাদের পরিকল্পনা আছে, হোম ডেলিভারি সিস্টেমের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপিসহ চিকিৎসাসামগ্রী দিয়ে যেন ক্যানসার-আক্রান্ত রোগীদের সাপোর্ট দিতে পারি। বাংলাদেশে একটি আধুনিক ক্যানসার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা আমাদের স্বপ্ন। হাসপাতালে ইনভেস্টিগেশন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সুলভ মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পরিকল্পনা আছে।’

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্যানসার-আক্রান্ত রোগীরা যখন ঢাকায় আসে বিভিন্ন হাসপাতালে ক্যানসারের চিকিৎসা নিতে, তখনই তারা থাকা-খাওয়ার জন্য বেছে নেয় ‘দিগন্ত মেমোরিয়াল ক্যানসার ফাউন্ডেশন’কে। সিরাজগঞ্জের তরুণী তিন্নি ইসলাম রাখী ঢাকায় পিজি হাসপাতালে নিচ্ছেন চিকিৎসা। থাকা-খাওয়ার জন্য তিনি বেছে নিলেন মগবাজারের এই প্রতিষ্ঠানকেই। তিনি বলেন, ‘আমার ব্রেস্টে টিউমার এবং টিউমারে ক্যানসার ধরা পড়েছে। আমি পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি। থাকা-খাওয়ার জন্য এই প্রতিষ্ঠানকে বেছে নিয়েছি। এখানে অল্প টাকায় খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা আছে; সুযোগ-সুবিধা আমার কাছে ভালোই মনে হচ্ছে।’

শুধু থাকা-খাওয়া নয়, ক্যানসার-আক্রান্ত রোগীদের বিভিন্ন হাসপাতালে আনা-নেওয়ার জন্য যাতায়াতের ব্যবস্থাও আছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (অপারেশন) ফরিদা ইয়াসমিন কণা বলেন, ‘যাতায়াতের জন্য আমাদের দুটো অ্যাম্বুলেন্স আছে। এগুলো দিয়ে আমরা রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ও আসার ব্যবস্থাটা করি। এছাড়া হাসপাতালে তাদের অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থাও আমরা করে দিই। অনেক সময় ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায় না, তখন আমরা ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা করি। নিউরো সার্জন অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদ স্যার আমাদের একটি অ্যাম্বুলেন্স দান করেছেন, অন্যটি রোটারি ক্লাব থেকে ডক্টর নাদিরা ইসলাম দান করেছেন।’

এখানে যে রোগীরা থাকেন তারা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সাপোর্টও পেয়ে থাকেন। এ প্রসঙ্গে ফরিদা ইয়াসমিন কণা আরো বলেন, ‘আমাদের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. রুহুল আমিন, মহাসচিব প্রফেসর নওফেল ইসলাম, ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফখরুল ইসলাম এখানে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এছাড়া আমাদের যে ডাক্তাররা বোর্ডে আছেন, তাদের আমরা যখন ডাকি তখনই পাই। এখানে কোনো রোগীর সমস্যা হলেই আমরা ডাক্তারদের সাপোর্ট পাই। রোগীদের চিকিৎসা-পরবর্তী প্রবলেমগুলো আমরা সল্‌ভ করি। ডাক্তারদের জন্য আমরা রোগীদের কাছ থেকে কোনো পেমেন্ট নিই না। এখানে যারা থাকেন, তাদের জন্য এই চিকিৎসা ফ্রি।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন