হৃদরোগ চিকিৎসায় গত দুই দশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে চিকিৎসার মূল লক্ষ্য ছিল করোনারি ধমনির সংকুচিত অংশ বা স্টেনোসিস খুলে দেওয়া, এখন সেখানে জোর দেওয়া হচ্ছে পুরো করোনারি ধমনিজুড়ে থাকা অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস বা প্লাকজনিত রোগকে নিয়ন্ত্রণ করার ওপর। এই পরিবর্তনকে বলা যায়—‘স্টেনোসিসকেন্দ্রিক চিকিৎসা’ থেকে ‘রোগকেন্দ্রিক চিকিৎসা’তে উত্তরণ।
স্টেনোসিসকেন্দ্রিক চিকিৎসা
অতীতে করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফিতে যদি ৭০ শতাংশ বা তার বেশি সংকোচন ধরা পড়ত, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে এনজিওপ্লাস্টি বা স্টেন্ট বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। ধারণা ছিল, সংকীর্ণ জায়গাটি খুলে দিলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যাবে। কিন্তু পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ হার্ট অ্যাটাকের কারণ সেসব প্লাক, যেগুলো খুব বেশি সংকীর্ণতা তৈরি করে না, কিন্তু হঠাৎ ফেটে গিয়ে রক্তনালিতে ব্লক সৃষ্টি করে।
করোনারি রোগের চিকিৎসা
বর্তমানে চিকিৎসা পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো পুরো করোনারি ধমনির স্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং প্লাককে স্থিতিশীল রাখা। এই পদ্ধতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে—
১. ওষুধভিত্তিক সমন্বিত চিকিৎসা
আধুনিক চিকিৎসায় উচ্চমাত্রার স্ট্যাটিন, অ্যান্টিপ্লেটলেট ওষুধ, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসবের মাধ্যমে প্লাক স্থিতিশীল হয় এবং নতুন করে জটিলতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমে।
২. রক্তপ্রবাহভিত্তিক মূল্যায়ন
সব সংকীর্ণতা সমান ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তাই এখন শুধু চোখে দেখা সংকোচনের ওপর নির্ভর না করে, রক্তপ্রবাহে এর প্রভাব যাচাই করা হয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায় কোন ব্লক সত্যিই চিকিৎসার প্রয়োজন।
৩. আধুনিক ইমেজিং প্রযুক্তি
ইনট্রাভাসকুলার আলট্রাসাউন্ড (IVUS) এবং অপটিক্যাল কোহেরেন্স টোমোগ্রাফি (OCT)-এর মতো প্রযুক্তির সাহায্যে ধমনির ভেতরের প্লাকের গঠন ও ঝুঁকি নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে। এতে এমন অনেক ঝুঁকিপূর্ণ প্লাক শনাক্ত করা যায়, যা সাধারণ অ্যাঞ্জিওগ্রাফিতে ধরা পড়ে না।
৪. সম্পূর্ণ রিভাসকুলারাইজেশন
বিশেষ করে হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে শুধু দায়ী ধমনি নয়, বরং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্লক থাকলে সেগুলোর চিকিৎসাও বিবেচনায় আনা হয়। এতে দীর্ঘ মেয়াদে রোগীর ফলাফল ভালো হয়।
গবেষণার প্রমাণ
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, স্থিতিশীল করোনারি রোগে শুধু স্টেন্ট বসানোর চেয়ে সঠিক ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা অনেক ক্ষেত্রে সমান কার্যকর। তাই অপ্রয়োজনীয় স্টেন্টিং এড়িয়ে চলা এখন চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বর্তমান কার্ডিওলজির মূল বার্তা
‘আমরা আর শুধু ব্লক খুলি না, আমরা পুরো করোনারি রোগের চিকিৎসা করি।’
হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সফলতার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত চিকিৎসা, নিয়মিত ফলোআপ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
গবেষণালব্ধ প্রমাণ
আধুনিক কার্ডিওলজিতে চিকিৎসা পদ্ধতির এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক গবেষণা।
COMPLETE trial-এ দেখা গেছে, হার্ট অ্যাটাক (STEMI) রোগীদের ক্ষেত্রে শুধু দায়ী ধমনি নয়, বরং অন্য উল্লেখযোগ্য ব্লকগুলোরও চিকিৎসা করলে ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাক ও কার্ডিওভাসকুলার মৃত্যুর ঝুঁকি কমে। অন্যদিকে, স্থিতিশীল করোনারি ধমনি রোগে পরিচালিত COURAGE trial প্রমাণ করে যে, শুধু স্টেন্ট বসানোর তুলনায় যথাযথ ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা (Optimal Medical Therapy) অনেক ক্ষেত্রেই সমান কার্যকর। একইভাবে, সাম্প্রতিক ISCHEMIA trial-এ দেখা গেছে, স্থিতিশীল রোগীদের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে আক্রমণাত্মক পদ্ধতি (PCI বা CABG) গ্রহণের পরিবর্তে ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা শুরু করলেও দীর্ঘ মেয়াদে মৃত্যুহার বা বড় ধরনের জটিলতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য হয় না।
গবেষণাগুলোর মূল বার্তা
* সব ব্লক স্টেন্ট দিয়ে ঠিক করার প্রয়োজন নেই।
* সঠিক রোগী নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
* ওষুধভিত্তিক চিকিৎসাই হচ্ছে মূল ভিত্তি।
অতএব, আধুনিক চিকিৎসায় লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ব্লক অপসারণ নয়, বরং পুরো করোনারি রোগকে নিয়ন্ত্রণ করা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

