আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

দেশে প্রতি ৪ জনে ১ জন প্রাপ্ত বয়স্ক উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত

এমরানা আহমেদ

দেশে প্রতি ৪ জনে ১ জন প্রাপ্ত বয়স্ক উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত

দেশে অসংক্রামক রোগ উচ্চ রক্তচাপ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন একটি দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যগত সমস্যা যা অকালমৃত্যু ঘটায়। উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, কিডনি রোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে বিশ্বে প্রতি বছর ৪ কোটিরও অধিক মানুষ মারা যায়, যা বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর প্রায় ৭৪ শতাংশ।

নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই মৃত্যুহার আরও বেশি, প্রায় ৭৭ শতাংশ। বাংলাদেশও উচ্চ রক্তচাপের নীরব মহামারির মধ্যে রয়েছে। চিকিৎসকদের মতে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত ওষুধ সেবনের কোনো বিকল্প নেই এবং অনিয়মিত ওষুধ সেবনে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে, ২০২২’ এর তথ্যানুযায়ী, প্রতি ৪ জনে ১ জন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপজনিত অসুস্থতা এবং অকালমৃত্যুর বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগজনিত অকাল মৃত্যু এক-তৃতীয়াংশে কমিয়ে আনা সংক্রান্ত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (লক্ষ্য ৩.৪) অর্জন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিওএইচও) হিসেব অনুযায়ী, বিশ্বে ১৪০ কোটি মানুষ (৩০-৭৯ বছর) উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে, যার বেশির ভাগ বাস করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে। উচ্চ রক্তচাপের কারণে হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং কিডনি রোগের মত মারাত্মক অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশ্বে প্রতিবছর ১ কোটিরও বেশি মানুষ উচ্চ রক্তচাপের কারণে মারা যায়, যা সকল সংক্রামক রোগে মোট মৃত্যুর চেয়েও বেশি।

বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ পরিস্থিতি

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে-২০২৫এর তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে শীর্ষ ১০টি রোগের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ। ডব্লিউএইচও’র ২০২৫ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের (৩০-৭৯ বছর বয়সি) অর্ধেকই (৫৩ শতাংশ পুরুষ, ৪৫ শতাংশ নারী) জানে না যে তাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসা সেবা গ্রহণের হার খুবই কম, মাত্র ৩৯ শতাংশ (৩৫ শতাংশ পুরুষ, ৪২ শতাংশ নারী)। নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে মাত্র ১৬ শতাংশ (১৫ শতাংশ পুরুষ, ১৬ শতাংশ নারী) অর্থাৎ প্রতি ৭ জনে ১ জন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ২ লক্ষ ৮৩ হাজার মানুষ হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেছে, যার ৫২ শতাংশের (৪৮ শতাংশ পুরুষ, ৫৬ শতাংশ নারী) জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ। অন্যদিকে ‘বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০১৭- ২০১৮’ অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৭-২০১৮ সাল সময়ের মধ্যে, ৩৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, পুরুষের মধ্যে ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৪ শতাংশে এবং নারীর ক্ষেত্রে এই হার ৩২ শতাংশ থেকে ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা রয়েছে এমন নারী এবং পুরুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার হার যথাক্রমে ৪৯ শতাংশ এবং ৪২ শতাংশ যেখানে স্বাভাবিক ওজনের নারী এবং পুরুষের মধ্যে এই হার যথাক্রমে ২৫ শতাংশ এবং ২৪ শতাংশ। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, প্রতি ১০টি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ৭টিতে উচ্চ রক্তচাপজনিত চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। তবে উচ্চ রক্তচাপ নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনা গাইডলাইন রয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। প্রশিক্ষিত কর্মী রয়েছে মাত্র ২৯ শতাংশ স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে। গ্লোবাল বারডেন অফ ডিজিজ স্টাডি (জিবিডি), ২০১৯ এর তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে মৃত্যু এবং পঙ্গুত্বের প্রধান তিনটি কারণের একটি উচ্চ রক্তচাপ। সার্বিকভাবে বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বিশ্বব্যাপী উচ্চ রক্তচাপ পরিস্থিতি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উচ্চ রক্তচাপ বিষয়ক ২য় বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডব্লিউএইচও। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০-৭৯ বছর বয়সি জনগোষ্ঠীর ৩৩ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত এবং ১৯৯০ সাল থেকে থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬৫ কোটি থেকে বেড়ে ১৪০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। এসময়ে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ ধনী দেশগুলি থেকে কমে নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে মাত্র ৩২০ মিলিয়ন ২৩ শতাংশ মানুষ তাদের রক্তচাপ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে মাত্র ৪টি দেশ- কানাডা, কোস্টারিকা, আইসল্যান্ড এবং দক্ষিণ কোরিয়াতে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার ৫০ শতাংশের বেশি; অন্যদিকে ৯৯টি দেশে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার ২০ শতাংশেরও কম। ২০১১ সালে উচ্চ রক্তচাপজনিত কারণে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর ১৬ শতাংশ এবং অসংক্রামক রোগের জন্য দায়ী অন্য যেকোনো ঝুঁকির থেকে বেশি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে আগামী কয়েক দশকে বিশ্বব্যাপী উচ্চ হাইপারটেনশন একটি দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যগত সমস্যা যা অকালমৃত্যু ঘটায়।

বিশ্ব ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী,দেশে স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করা হয়। অপর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের কারণে কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এনসিডি কর্নারগুলোতে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ নিয়মিত সরবরাহ বাধাগ্রন্ত হচ্ছে। ফলে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও তৃণমূল পর্যায়ে বিনামূল্যে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, টেকসই অর্থায়নের মাধ্যমে সকল কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উচ্চ রক্তচাপ ওষুধের নিয়মিত প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা গেলে উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ রক্তচাপ ঘটিত অন্যান্য অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এর মেডিকেল অফিসার ডা. গীতা রানী দেবী বলেন,উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সরবরাহ নিরবিচ্ছিন্ন করতে সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আশা করি সকল কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দ্রতই এই সুবিধার আওতায় আসবে। ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগজনিত অকাল মৃত্যু এক-তৃতীয়াংশে কমিয়ে আনা সংক্রান্ত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি, লক্ষ্য ৩.৪) অর্জন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। সম্প্রতি,অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আন্ত:মন্ত্রণালয় সহযোগিতা বাড়াতে সরকারের ৩৫টি মন্ত্রণালয়/বিভাগ একটি ‘যৌথ ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর (২০ আগস্ট ২০২৫) করেছে। এটি এসডিজি’র স্বাস্থ্য সংক্রান্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনবে বলে আশা করছি আমি।

বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপসমূহ:

বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপসহ অন্যান্য অসংক্রামক রোগ-এর ক্রমবর্ধমান প্রকোপ মোকাবেলায় সরকারিভাবে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, কমিউনিটি ক্লিনিকের ওষুধ তালিকায় উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়বেটিস এর ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট (সিসিএইচএসটি) এর কমিউনিটি ক্লিনিকে ব্যবহৃত ঔষধের তালিকা হালনাগাদকরণ কমিটির ১৪ই মে ২০২৩ তারিখে অনুষ্ঠিত সভায় কমিউনিটি ক্লিনিকের ওষুধ তালিকায় উচ্চ রক্তচাপের জন্য এমলোডিপিন ৫ মি: গ্রা: ও ডায়বেটিস এর জন্য মেটফরমিন ৫০০ মি:গ্রা: সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এটি বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার (সিবিএইচসি), এসেনসিয়াল ড্রাগস্ কোম্পানী লিমিটেড (ইডিসিএল)সহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। বাংলাদেশে তৃণমূল পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ মোকাবেলার ক্ষেত্রে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য বহুখাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ২০১৮-২০২৫ রয়েছে যেখানে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অনুসরণ করে ২০২৫ সালের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রাদুর্ভাব তুলনামূলকভাবে ২৫ শতাংশ কমানোর (রিলেটিভ রিডাকশন) জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উচ্চ রক্তচাপ ব্যবস্থাপনায় জাতীয় গাইডলাইনও এর চিকিৎসায় ন্যাশনাল প্রোটোকল প্রণয়ন করা হয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদী (২০১৭-২০২২) হেলথ, পপুলেশন অ্যান্ড নিউট্রিশন সেক্টর প্রোগ্রাম (৪র্থ এইচপিএনএসপি)-এ অসংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনায় উচ্চ রক্তচাপকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (এনসিডিসি) উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ২০১৮ সাল থেকে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে যার প্রধান উদ্দেশ্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে উচ্চ রক্তচাপ সনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও ফলোআপ কার্যক্রম শক্তিশালী করা। এখন পর্যন্ত সরকার সারাদেশে মোট ৪৩০টি এনসিডি কর্নার স্থাপন করেছে (৪১৪টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং ১৬টি সদর হাসপাতালে) যা পরিচলনায় সহযোগিতা করছে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ, ব্র্যাক হেলথ, ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্টস স্কুল অফ পাবলিক হেলথ, জাইকাসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা, অনুকরণযোগ্য মডেল হিসেবে দেশব্যাপী এই কার্যক্রমটি সম্প্রসারণ করা গেলে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে এবং স্বল্প খরচেই হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনি বিকল হওয়ার মত ব্যয়বহুল অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধের মাধ্যমে অসংখ্য জীবন বাঁচানো যাবে।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বাধাসমূহ:

কমিউনিটি ক্লিনিক ও এনসিডি কর্নারে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহে টেকসই অর্থায়নের অভাব,স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সরবরাহ নিরবিচ্ছিন্ন রাখতে টেকসইঅর্থায়নের অভাব একটি অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে, অপর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের কারণে কমিউনিটি ক্লিনিক ও এনসিডি কর্নারগুলোতে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ নিয়মিত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও অনেক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বিনামূল্যে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ রোগীরা পাচ্ছেন না, কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সরবরাহের সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাষ্ট কর্তৃক ২০২৩ সালে দেশের সকল কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ (অ্যামলোডিপিন ৫ মি. গ্রা:) সরবরাহের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, তা দ্রুত বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে। যার ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী বিশেষত সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ পৌছানো সম্ভব হচ্ছে না, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের উৎপাদন ও সরবরাহে ধারাবাহিকতার অভাব, কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা এবং ওষুধ সরবরাহ এখনো নিয়মিত নয়। বিশেষ করে প্রান্তিক এলাকায় প্রায়শই ওষুধের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। সরকারি দফতরগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। অনিয়মিত ওষুধ সরবরাহের ফলে দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষ অনেক সময় ওষুধ কিনে খাওয়ার বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করে।

করণীয়:

দেশের সকল কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ অ্যামলোডিপিন ৫ মি.গ্রা.সরবরাহের সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৪,০০০ কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী বিশেষত দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ পৌঁছানো সম্ভব হবে। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো আবাসস্থল থেকে স্বল্প দূরত্বে অবস্থিতহওয়ায় রোগীদের যাতায়াত ব্যয় কমবে। সময় সাশ্রয় হবে, সকল উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিকে ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এনসিডি কর্নারে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে ওষুধের উৎপাদন ও সরবরাহ নিরবিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। দেশের সকল উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিকে ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এনসিডি কর্নারে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হলে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করার জন্য আরো বেশি উদ্বুদ্ধ হবে। ফলে দেশে উচ্চরক্তচাপজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যু কমবে, সরকারের এ খাতে চিকিৎসা ব্যয় কমবে। উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এসেনসিয়াল ড্রাগস্ কোম্পানী লিমিটেড (ইডিসিএল)-সহ সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। উচ্চ রক্তচাপের ক্রমবর্ধমান প্রকোপ বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি ক্রমশ বাড়িয়ে তুলছে। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং কিডনির ক্ষতি প্রতিরোধসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলায় উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি সরকারের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন নীতি, পরিকল্পনা এবং প্রতিশ্রুতি পূরণ বিশেষ করে অসংক্রামক রোগজনিত অকাল মৃত্যু এক-তৃতীয়াংশে কমিয়ে আনা সংক্রান্ত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (লক্ষ্য ৩.৪) অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন