প্যাথলজি রিপোর্টে চিকিৎসকের সই বাধ্যতামূলক করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নতুন নির্দেশনাকে ‘অযৌক্তিক’ ও ‘বৈষম্যমূলক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকিউলার বায়োলজিস্টরা।
তারা বলেছেন, দীর্ঘদিনের স্বীকৃত ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ল্যাব ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে রিপোর্টে এককভাবে চিকিৎসকের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক করা হলে রোগ নির্ণয় ও ডায়াগনোস্টিক সেবার গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোর বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকিউলার বায়োলজি বিভাগে অধ্যয়নরত ও সাবেক শিক্ষার্থীরা এসব কথা বলেন। এতে কলেজের সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষকরাও একাত্মতা ঘোষণা করেন।
বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকিউলার বায়োলজিস্টরা বলেন, গত ৫ ও ৭ জানুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে প্যাথলজি ও রেডিওলজি সেবায় নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। নির্দেশনার ৫ নম্বর ধারায় রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় শুধু বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) রেজিস্টার্ড চিকিৎসকদের সইয়ের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক। এতে ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্টসহ, ল্যাব সায়েন্টিস্টগণের শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা উপেক্ষা করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকিউলার বায়োলজিস্টরা বলেন, বায়োকেমিস্ট্রি, ইমিউনোলজি ও মলিকিউলার ডায়াগনস্টিকের মেথডনির্ভর পরীক্ষাগুলোর রিপোর্ট প্রদানে নমুনা সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রি-এনালাইটিক্যাল, এনালাইটিক্যাল (ক্যালিব্রেশন, ইন্টারনাল কোয়ালিটি কন্ট্রোল, এক্সটারনাল কোয়ালিটি কন্ট্রোল ও মেথড ভ্যালিডেশন) ও পোস্ট এনালাইটিক্যাল ধাপ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের সাথে যুক্ত থেকে তারা রোগীর রিপোর্ট তৈরি করে রোগ নির্ণয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন।
তারা বলেন, ‘দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রথম সারির সকল বিশেষায়িত ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে হিস্টোপ্যাথোলজিস্ট, হেমাটোলজিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, মেডিকেল/ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট্র ও ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্টরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্টে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সই করে আসছেন। এটা দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পেশাগত চর্চা। এ ছাড়া বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিগত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টরা হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মানসম্মত রিপোর্ট তৈরিতে শ্রম দিয়ে আসছেন। এই খাতে যুক্ত উন্নত ল্যাব প্রযুক্তিগুলোর প্রায় সব তাদের প্রয়াসের ফল।’
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড আইএসও, কলেজ অব আমেরিকান প্যাথোলজিস্টস (ক্যাপ), ন্যাশনাল অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড ফর টেস্টিং অ্যান্ড ক্যালিব্রেশন ল্যাবরেটরিজ (ন্যাবল) অনুযায়ীও এই ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টগণ যোগ্য হিসেবে স্বীকৃত ল্যাব প্রফেশনাল। ভারত, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড ও ডেনমার্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বায়োকেমিস্টগণ স্বীকৃত ল্যাব প্রফেশনাল।
তারা আরও বলেন, ‘বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি বিষয় একটা ল্যাব কেন্দ্রীক গবেষণাধর্মী বিজ্ঞান, যার সম্পূর্ণ কোর্সে মেটাবলিজম, হেমাটোলজি, ইমিউনোলোজি, এন্ডোক্রাইনোলজি, ভাইরোলজি, ব্যাকটেরিয়াওলজি, ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট্রি, মলিকিউলার বায়োলজি ও অনকোলজি—এ সবই অধ্যয়ন করতে হয়। ফলে রোগ নির্ণয়ের প্রক্রিয়া বা ডায়াগনোস্টিক ল্যাবে কাজ করার প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত ও কারিগরি দক্ষতা অর্জন করছি।’
‘আমরা বিশ্বাস করি, একটা নির্ভুল রিপোর্ট বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের (যেমন—মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, বায়োকেমিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক) দক্ষ জনবলের সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রচেষ্টার ফল। কোনো একটি বিশেষ পেশাকে এককভাবে প্রাধান্য দিয়ে অন্য পেশাগুলোর অবদান অস্বীকার করা হলে ডায়াগনোস্টিক সেবার গুণগত মান গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, পেশাগত বৈষম্য সৃষ্টি হবে এবং সর্বোপরি রোগীরা প্রকৃত সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন’—যোগ করেন তারা।
বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকিউলার বায়োলজিস্টরা বলেন, ‘আমরা কোনো পেশার বিরোধিতা করছি না। আমরা চাই, একটা মাল্টিডিসিপ্লিনারি ল্যাবরেটরি সিস্টেম যেখানে ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট, ল্যাব সায়েন্টিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট, হেমাটোলজিস্ট, হিস্টোপ্যাথলজিস্ট—সবাই নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করব।’
বাস্তব ও বিজ্ঞানের আলোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে নীতি নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিন দফা দাবি তুলে ধরেন তারা।
এর মধ্যে ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট ও ল্যাবভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের 'প্রয়োজনীয় জনবল' হিসেবে স্বীকৃতি দিন, শুধুমাত্র স্বাক্ষরকে প্রাধান্য না দিয়ে বৈষম্যমূলক নির্দেশনাগুলো পুনরায় বিবেচনা করা হোক এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যুগোপযোগী একটি ল্যাবরেটরি নিয়ন্ত্রক সংস্থা (ল্যাবরেটরি রেগুলেটরি বডি) প্রতিষ্ঠা করুন, যাতে করে বাংলাদেশের প্রতিটি ল্যাবরেটরির গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

