প্রতিবছরের ৩ মার্চ বিশ্বব্যাপী পালিত হয় World Health Organization (WHO) ঘোষিত বিশ্ব শ্রবণ দিবস। ২০০৭ সাল থেকে শুরু হওয়া এই আয়োজনের লক্ষ্য একটাই—শ্রবণস্বাস্থ্য সম্পর্কে বৈশ্বিক সচেতনতা বৃদ্ধি। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য, ‘From communities to classrooms: hearing care for all children,’ আমাদের দেশের বাস্তবতায় অত্যন্ত সময়োপযোগী।
* কেন শিশুদের শ্রবণস্বাস্থ্য এত গুরুত্বপূর্ণ
শ্রবণশক্তি শুধু শব্দ শোনা নয়; এটি ভাষা শিক্ষা, বুদ্ধিবিকাশ, সামাজিক যোগাযোগ এবং শিক্ষার মৌলিক ভিত্তি। জীবনের প্রথম পাঁচ বছর একটি শিশুর মস্তিষ্ক ও ভাষা বিকাশের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। এ সময় শ্রবণ সমস্যা অশনাক্ত থাকলে শিশুটি কথা বলা, পড়াশোনা ও সামাজিক বিকাশে পিছিয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৯ কোটি (৫-১৯ বছর বয়সি) শিশু ও কিশোর-কিশোরী কোনো না কোনো ধরনের শ্রবণ সমস্যায় ভুগছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এদের একটি বড় অংশ অশনাক্ত থেকে যায়। ফল হিসেবে দেখা দেয় ভাষা বিকাশে বিলম্ব, শিক্ষাগত দুর্বলতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি।
* সচেতন হোক প্রতিটি পরিবার
২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যের প্রথম অংশ—‘From communities’—আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রতিরোধের কাজ শুরু হবে পরিবার থেকেই।
গর্ভকালীন সঠিক চিকিৎসা ও টিকাদান।
নবজাতকের শ্রবণ স্ক্রিনিং।
কানের সংক্রমণের দ্রুত চিকিৎসা।
শব্দদূষণ থেকে শিশুদের সুরক্ষা।
এসব ছোট উদ্যোগ বড় ক্ষতি প্রতিরোধ করতে পারে।
* দ্রুত শনাক্তকরণ
শিশুদের ৬০ ভাগ শ্রবণশক্তি হ্রাস প্রতিরোধযোগ্য। অনেক সময় অভিভাবক বুঝতেই পারেন না শিশুটি ঠিকমতো শুনছে না। কিছু সতর্ক লক্ষণ হলো—ডাকলে সাড়া না দেওয়া, বয়স অনুযায়ী কথা না বলা, টিভির শব্দ অস্বাভাবিক বাড়িয়ে শোনা, বারবার কানে সংক্রমণ হওয়া। এমন লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে ইএনটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
* শ্রেণিকক্ষেও শ্রবণ যত্নের সুযোগ
প্রতিপাদ্যের দ্বিতীয় অংশ—‘to classrooms’—স্কুলভিত্তিক উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে। স্কুলে নিয়মিত উপস্থিতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে সহজেই বৃহৎ পরিসরে শ্রবণ পরীক্ষা করা যায় এবং অভিভাবকদের কাছে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
শ্রবণ সমস্যাযুক্ত শিশুদের জন্য প্রয়োজন—
১. উপযুক্ত হিয়ারিং এইড বা ককলিয়ার ইমপ্লান্ট।
২. শিক্ষকদের সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ।
৩. অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থাসহ নানা পদক্ষেপ।
একটি শিশুর শ্রবণ সমস্যা যেন তার স্বপ্নকে থামিয়ে না দেয়—এটাই হওয়া উচিত আমাদের অঙ্গীকার।
* কানের যত্নে করণীয়
* ম্যাচের কাঠি, কটনবাড, ক্লিপ বা অন্যকিছু দিয়ে কানে খোঁচাখুঁচি নয়।
* কানে অপ্রয়োজনীয় পানি প্রবেশ এড়ানো।
* হাতুড়ে চিকিৎসা থেকে বিরত থাকা।
* হেডফোন ব্যবহারে ৬০ শতাংশের বেশি ভলিউম না রাখা।
পরিশেষে বলি, চোখে কম দেখা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি কানে কম শোনাও একটি প্রচলিত স্বাস্থ্য সমস্যা। কিন্তু সামাজিক হীনম্মন্যতার কারণে অনেকে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। সচেতনতা ও সঠিক সময়ে চিকিৎসাই পারে এ সমস্যা মোকাবিলা করতে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক (ইএনটি)
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

