আত্মীয়ের সঙ্গে বিয়ে কি নিরাপদ? গবেষণায় উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

আত্মীয়ের সঙ্গে বিয়ে কি নিরাপদ? গবেষণায় উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য

ফার্স্ট কাজিন বা আপন চাচাতো-মামাতো-খালাতো-ফুফাতো ভাইবোনদের মধ্যে বিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে প্রচলিত হলেও, এ ধরনের বিয়ের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ডভিত্তিক একটি বৃহৎ গবেষণা। গবেষকদের মতে, রক্তসম্পর্কিত দম্পতিদের সন্তানদের মধ্যে শুধু বংশগত রোগের ঝুঁকিই নয়, ভাষাগত বিকাশ, শিক্ষাগত অগ্রগতি এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতেও নেতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ড শহরে পরিচালিত ‘বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড’ গবেষণাকে এ বিষয়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া ১৩ হাজারেরও বেশি শিশুকে নিয়ে শুরু হওয়া এই গবেষণায় তাদের শৈশব থেকে কৈশোর এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের প্রাথমিক ধাপ পর্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের মধ্যে প্রতি ছয়জনের একজনের বাবা-মা ছিলেন ফার্স্ট কাজিন। অংশগ্রহণকারীদের বড় একটি অংশ পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত পরিবারের সন্তান।

গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাবা-মা রক্তসম্পর্কিত হলে সন্তানের মধ্যে সিস্টিক ফাইব্রোসিস, সিকল সেল ডিজিজসহ বিভিন্ন বংশগত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। সাধারণভাবে ফার্স্ট কাজিনদের সন্তানের ক্ষেত্রে বংশগত রোগ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৬ শতাংশ, যেখানে আত্মীয় নন এমন বাবা-মায়ের সন্তানদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৩ শতাংশ।

তবে ব্র্যাডফোর্ডের গবেষণা শুধু বংশগত রোগ শনাক্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গবেষকরা শিশুদের ভাষা শেখার গতি, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের হার, স্কুলে পারফরম্যান্স এবং সামগ্রিক বিকাশের শতাধিক সূচক বিশ্লেষণ করেছেন। একই সঙ্গে পারিবারিক দারিদ্র্য ও অভিভাবকদের শিক্ষার মতো প্রভাবগুলো পরিসংখ্যানগতভাবে আলাদা করে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

ফলাফলে দেখা গেছে, ফার্স্ট কাজিন দম্পতির সন্তানদের মধ্যে ভাষা ও কথা বলার সমস্যা শনাক্ত হওয়ার হার ১১ শতাংশ, যেখানে অন্য শিশুদের ক্ষেত্রে তা ৭ শতাংশ। পাঁচ বছর বয়সে শিশুদের বিকাশ মূল্যায়নের সরকারি সূচকে ‘ভালো উন্নয়ন পর্যায়ে’ পৌঁছানোর হার ছিল ৫৪ শতাংশ, যা আত্মীয় নন এমন বাবা-মায়ের সন্তানদের ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশ।

স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। গবেষণায় দেখা যায়, ফার্স্ট কাজিনদের সন্তানদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়েছে অন্য শিশুদের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ বেশি।

এদিকে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এ বিষয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কও তীব্র হচ্ছে। নরওয়ে ইতোমধ্যে ফার্স্ট কাজিনদের মধ্যে বিয়ে নিষিদ্ধ করেছে এবং সুইডেনেও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের প্রস্তুতি চলছে। যুক্তরাজ্যে কনজারভেটিভ পার্টির এমপি রিচার্ড হোল্ডেন এ ধরনের বিয়ে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করলেও বর্তমান লেবার সরকার জানিয়েছে, এ মুহূর্তে তাদের এমন কোনো পরিকল্পনা নেই।

বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ‘জেনেটিক কাউন্সেলিং’ পদ্ধতির মাধ্যমে কাজিনদের মধ্যে বিয়ে ও সন্তান জন্মদানের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিক্ষা ও জেনেটিক সচেতনতা বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান হতে পারে।

ব্র্যাডফোর্ড টিচিং হসপিটালসের গবেষক অধ্যাপক স্যাম অডির মতে, বংশগত রোগের ঝুঁকি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শুধু কাজিন বিয়েকে দায়ী করা বাস্তবতাকে অতিসরলীকরণ করা হবে। তার মতে, জেনেটিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবারগুলোকে যথাযথ তথ্য দেওয়া সবচেয়ে কার্যকর পথ।

গবেষণায় আরো দেখা গেছে, ব্র্যাডফোর্ডে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফার্স্ট কাজিনদের মধ্যে বিয়ের হার কমছে। ২০০০ সালের শেষ দিকে নতুন মায়েদের মধ্যে যাদের সন্তানের বাবা ছিলেন তাদের ফার্স্ট কাজিন, সেই হার ছিল ৩৯ শতাংশ। ২০১০ সালের শেষ দিকে তা কমে দাঁড়ায় ২৭ শতাংশে।

সূত্র: বিবিসি

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন