স্তনে গুটি বা টিউমার দেখা দিলে অনেকের মনেই প্রথমে ক্যানসারের আশঙ্কা তৈরি হয়। কিন্তু স্তনের সব টিউমার ক্যানসার নয়। কিছু টিউমার বিনাইন বা নিরীহ, আবার কিছু ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যানসারজাতীয়। তাই স্তনে নতুন কোনো গুটি দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত এর প্রকৃতি নির্ণয় করা জরুরি।
স্তনের টিউমার কী?
স্তনের কোষ যখন স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, তখন সেখানে গুটি বা টিউমার তৈরি হতে পারে। এর প্রকৃতি নির্ভর করে টিউমারের কোষ, বৃদ্ধি এবং আশপাশের টিস্যুর সঙ্গে এর সম্পর্কের ওপর।
সাধারণভাবে স্তনের টিউমারকে বিনাইন ও ম্যালিগন্যান্ট—এই দুই প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়।
ঝুঁকির কারণ
স্তনের টিউমারের একক কোনো কারণ নেই। বয়স, হরমোনের পরিবর্তন, পারিবারিক ইতিহাস, জিনগত পরিবর্তন, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান, অ্যালকোহল গ্রহণ এবং অতীতে বুকে রেডিয়েশন চিকিৎসার ইতিহাস স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অনেক স্তন ক্যানসারের রোগীর ক্ষেত্রে বয়স ও নারী হওয়ার বিষয়টি ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো ঝুঁকির কারণ পাওয়া যায় না। তাই ঝুঁকির কারণ নেই বলে স্তনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন উপেক্ষা করা ঠিক নয়।
প্রকারভেদ
১. বিনাইন টিউমার
বিনাইন টিউমার সাধারণত ক্যানসার নয় এবং শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে না। এর মধ্যে ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা একটি পরিচিত টিউমার। সাধারণত এটি শক্ত, মসৃণ ও নড়াচড়া করতে পারে। এছাড়া স্তনে সিস্ট ও ফাইব্রোসিস্টিক পরিবর্তনও গুটি বা অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
২. ম্যালিগন্যান্ট টিউমার
ম্যালিগন্যান্ট টিউমার হলো ক্যানসারজাতীয় টিউমার। এটি আশপাশের টিস্যুতে প্রবেশ করতে পারে এবং লসিকাগ্রন্থি বা রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে শরীরের দূরবর্তী অঙ্গেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। স্তন ক্যানসারের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। এর মধ্যে ইনভেসিভ ডাক্টাল কার্সিনোমা ও ইনভেসিভ লোবিউলার কার্সিনোমা উল্লেখযোগ্য।
লক্ষণ
স্তনের টিউমারের লক্ষণ ব্যক্তি ও টিউমারের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। সতর্ক হওয়ার মতো লক্ষণগুলো হলো—
* স্তনে নতুন গুটি বা শক্ত অংশ অনুভূত হওয়া
* বগলের নিচে গুটি
* স্তনের আকার বা আকৃতির পরিবর্তন
* স্তনের কোনো অংশ অস্বাভাবিকভাবে মোটা বা শক্ত হয়ে যাওয়া
* নিপল ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া
* নিপল দিয়ে অস্বাভাবিক তরল বা রক্তাক্ত নিঃসরণ
* স্তনের ত্বকে কুঁচকে যাওয়া বা টান পড়া
* ত্বক কমলার খোসার মতো পরিবর্তিত হওয়া
* স্তনের কোনো অংশে দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তি বা ব্যথা
তবে প্রাথমিক স্তন ক্যানসারে অনেক সময় কোনো লক্ষণই থাকে না। আবার স্তনে ব্যথা না থাকলেও গুটি ক্যানসার হতে পারে।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন
স্তনে নতুন গুটি পাওয়া গেলে, গুটি দ্রুত বড় হলে, বগলে নতুন গুটি দেখা দিলে, নিপল থেকে অস্বাভাবিক নিঃসরণ হলে, অথবা স্তনের ত্বক বা নিপলের গঠনে পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে আগে স্তনে অস্ত্রোপচার হয়ে থাকলে নতুন কোনো গুটি বা পরিবর্তনকে পুরোনো অপারেশনের দাগ ভেবে অবহেলা করা ঠিক নয়।
রোগ নির্ণয়
রোগ নির্ণয়ের প্রথম ধাপ হলো চিকিৎসকের শারীরিক পরীক্ষা। এরপর বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী আলট্রাসনোগ্রাম, ম্যামোগ্রাম বা অন্যান্য ইমেজিং পরীক্ষা করা হতে পারে। সন্দেহজনক গুটি পাওয়া গেলে বায়োপসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি। এতে টিউমারের টিস্যু নিয়ে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়। এর মাধ্যমে টিউমার বিনাইন না ম্যালিগন্যান্ট এবং ক্যানসার হলে তার ধরন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।
সব টিউমারে কি অস্ত্রোপচার লাগে
না। ছোট ও কম ঝুঁকির কিছু বিনাইন টিউমার চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে রাখা যেতে পারে। আবার টিউমার বড় হলে, দ্রুত বৃদ্ধি পেলে, উপসর্গ তৈরি করলে, অথবা পরীক্ষায় সন্দেহজনক বৈশিষ্ট্য থাকলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। ক্যানসারের ক্ষেত্রে রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী অস্ত্রোপচারের সঙ্গে রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, হরমোন থেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি বা অন্যান্য চিকিৎসা যুক্ত হতে পারে।
একবার অস্ত্রোপচারের পর আবার কেন করতে হয়
প্রথম অস্ত্রোপচারের পর প্যাথলজি রিপোর্টে যদি দেখা যায়, টিউমারের কোষ কেটে ফেলা অংশের কিনারায় রয়ে গেছে, তখন নিরাপদ মার্জিন নিশ্চিত করতে আরো কিছু টিস্যু অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে। একে রিএক্সিশন বা আবার অস্ত্রোপচার বলা হয়। এটি সবসময় চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ার অর্থ নয়। অনেক ক্ষেত্রে টিউমার সম্পূর্ণ অপসারণ নিশ্চিত করার জন্যই দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার করা হয়।
তৃতীয়বার অস্ত্রোপচারের কারণ
দুবার অস্ত্রোপচারের পর তৃতীয়বার সার্জারি প্রয়োজন হওয়ার সম্ভাব্য কারণ কয়েকটি—
অবশিষ্ট টিউমার কোষ : আগের অপারেশনের পর পরীক্ষায় কাটা অংশের প্রান্তে টিউমার কোষ পাওয়া গেলে আরো টিস্যু অপসারণ প্রয়োজন হতে পারে।
স্থানীয় পুনরাবৃত্তি : চিকিৎসার পর একই স্তনে আবার ক্যানসার দেখা দিলে পরিস্থিতি অনুযায়ী আবার অস্ত্রোপচার করা হতে পারে।
নতুন টিউমার : আগের রোগ ফিরে না এসে নতুন একটি টিউমারও তৈরি হতে পারে।
নতুন সন্দেহজনক গুটি : অপারেশনের জায়গায় নতুন গুটি হলে সেটি ক্যানসার, সিস্ট, দাগের টিস্যু বা অন্য কোনো পরিবর্তন হতে পারে। পরীক্ষা ছাড়া এর প্রকৃতি নিশ্চিত করা যায় না।
চিকিৎসা পরিকল্পনার পরিবর্তন : আগের প্যাথলজি বা নতুন পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেলে চিকিৎসার ধরন পরিবর্তনের অংশ হিসেবেও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
তাই তৃতীয়বার সার্জারি মানেই রোগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, এমন ধারণা সঠিক নয়।
জটিলতা
ম্যালিগন্যান্ট টিউমারের প্রধান জটিলতা হলো স্থানীয়ভাবে রোগের বৃদ্ধি পাওয়া এবং লসিকাগ্রন্থি বা শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়া। দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়াকে মেটাস্টেসিস বলা হয়। অন্যদিকে একাধিক অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণ, রক্তক্ষরণ, ক্ষত শুকাতে দেরি, ব্যথা, দাগ এবং স্তনের আকৃতিতে পরিবর্তনের মতো সমস্যা হতে পারে। রোগের অগ্রগতি যত বাড়ে, চিকিৎসা তত জটিল হতে পারে। তাই সন্দেহজনক পরিবর্তন দ্রুত পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিরোধ ও সচেতনতা
সব স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বয়স ও ঝুঁকি অনুসারে স্ক্রিনিং করা গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে স্তন বা ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করা উচিত।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

