আ.লীগ কেন বারবার পাকিস্তান ও ‘আইএসআই’ প্রসঙ্গ টানছে

আ.লীগ কেন বারবার পাকিস্তান ও ‘আইএসআই’ প্রসঙ্গ টানছে
ছবি: বিবিসি বাংলা

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে গত ৫ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্য বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তানেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

সজীব ওয়াজেদ জয় ওই সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ভারতের দক্ষিণে বাংলাদেশ পাকিস্তান হয়ে গেছে। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশে অবাধে কার্যক্রম চালাচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বিজ্ঞাপন

অবশ্য আওয়ামী লীগের নেতারা এর আগেও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। চলতি বছরের শুরুতে দলটির সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত ভারতের এশিয়া নিউজ নেটওয়ার্ক বা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেন, ‘আইএসআই এবং পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমও গত ২৪ জানুয়ারির এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে আইএসআইয়ের উপস্থিতি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বাড়তে থাকা সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ করেন।

প্রশ্ন উঠছে, আওয়ামী লীগ কেন বারবার পাকিস্তান ও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার প্রসঙ্গ সামনে আনছে?

রাজনৈতিক কারণ

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা ছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেকটাই শীতল হয়ে যায়।

গত দুই বছর ধরে হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী ভারতে অবস্থান করছেন।

ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারসহ দেশটির অনেকের কাছেই পাকিস্তান একটি সংবেদনশীল বিষয়। ফলে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের অনেকে ভারতে অবস্থান করায় ভারতকে খুশি করতেই পাকিস্তানের প্রসঙ্গ সামনে আনা হচ্ছে বলে মনে করেন কোনো কোনো বিশ্লেষক।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের পরিচালক অধ্যাপক তৌফিক এম হক বলেন, আওয়ামী লীগের ধারণা, এসব কথা বললে দলটিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে শুধু ভারত নয়, পশ্চিমা বিশ্বও সহায়তা করবে।

তার মতে, পাকিস্তান বা জঙ্গিবাদ নিয়ে আওয়ামী লীগ মূলত তাদের পুরোনো কৌশলই অনুসরণ করছে।

ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত অবশ্য ভিন্নভাবে বিষয়টি দেখছেন।

তার মতে, ভারতের মতো আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও পাকিস্তান নিয়ে সংবেদনশীলতা রয়েছে। তাই নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের উদ্বুদ্ধ করতে এবং দলের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করতেই আওয়ামী লীগ এসব প্রসঙ্গ সামনে আনছে।

ক্ষমতায় থাকাকালেও আওয়ামী লীগ প্রায়ই বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রসঙ্গ যুক্ত করে বক্তব্য দিয়েছে। ২০১৪ সালে গোপালগঞ্জে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘তার জন্ম ভারতে আর অন্তরে পাকিস্তান। উনি যদি পেয়ারে পাকিস্তানে চলে যেতে চান, যেতে পারেন।’

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর অবস্থানও আওয়ামী লীগের জন্য স্বস্তিকর নয় বলে মনে করেন কেউ কেউ।

মুক্তিযুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অনেক মানুষের মধ্যে পাকিস্তান নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। অন্যদিকে বর্তমান প্রজন্মের অনেকের মধ্যে বড় পরিসরে ভারতবিরোধী মনোভাবও তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিজেপির শাসনামলে এসব মনোভাবের পটভূমি তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হয়।

আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের সহযোগিতা ও সমর্থন বাংলাদেশের অন্য যেকোনো রাজনৈতিক দলের তুলনায় বেশি।

সজীব ওয়াজেদ জয়ও বক্তব্য দেওয়ার সময় ভারতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করাও এতে গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে করেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন।

তার মতে, পাকিস্তান ও জঙ্গিবাদের মতো পুরোনো বিষয়গুলোই আওয়ামী লীগ সামনে আনছে। এসব বিষয় বাংলাদেশ ও বর্তমান বিশ্বে আগের মতো গুরুত্ব বহন করে না।

এম সাখাওয়াত হোসেন অভিযোগ করেন, এসব বক্তব্যের পেছনে ‘পাশের দেশেরও কিছু প্রেসক্রিপশন আছে’।

ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের বক্তব্যের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা বা সমর্থনের কথা অস্বীকার করেছে। তবে বাংলাদেশের বিএনপি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা বলেছেন, ভারতের অনুমোদন ছাড়া হাসিনার ভারতে অবস্থান করা সম্ভব হতো না। অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তও একই ধরনের মত দিয়েছেন।

তার মতে, ঐতিহাসিকভাবেই ভারত হাসিনাকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। এখনো তিনি ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ—এই বার্তাও ভারত সরকারের দিক থেকে এসেছে।

তবে একই সময়ে ভারত বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং আমন্ত্রণও জানিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হাসিনার বক্তব্য ভারতের জন্যও ভালো ফল বয়ে আনছে না বলে মনে করেন শ্রীরাধা দত্ত।

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় ভারতকেও উনি কোণঠাসা করে ফেলছেন এই কথাগুলো বলে।’

পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া

আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া এসেছে পাকিস্তানের দিক থেকেও।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি আইএসআইয়ের ভূমিকা নিয়ে দেওয়া ইঙ্গিত স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।

তিনি বলেন, ‘আইএসআই নিয়ে ভারতের ভীতি আছে, তাকেও (হাসিনা) হয়তো সেটা আক্রান্ত করেছে যেহেতু তিনি ভারতে অবস্থান করছেন।’

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পাকিস্তান হস্তক্ষেপ করে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. ইশতিয়াক আহমেদ বিবিসি উর্দুকে বলেন, এই মুহূর্তে ভারতে বসে এ ধরনের বিবৃতি দেওয়া এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা ছাড়া হাসিনার হাতে আর কোনো কার্যকর রাজনৈতিক বিকল্প নেই।

দিল্লিতে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক হাইকমিশনার আবদুল বাসিত বিবিসি উর্দুকে বলেন, হাসিনা যেহেতু ভারতে অবস্থান করছেন, তাই সেখানকার লোকজনকে খুশি করতেই তিনি এমন মন্তব্য করছেন।

বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের বাড়তে থাকা সম্পর্ক

বিশ্লেষকেরা আওয়ামী লীগের পাকিস্তান প্রসঙ্গ টানার পেছনে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের বাড়তে থাকা সম্পর্ককেও একটি কারণ হিসেবে দেখছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক প্রায় তলানিতে ছিল।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের যোগাযোগ ও যাতায়াত বেড়েছে। বাণিজ্য, শিক্ষা ও সামরিক ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়েছে।

গত বছর পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান এবং দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ঢাকা সফর করেন। ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাকিস্তান থেকে যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

বিএনপি সরকারের সময়েও দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও অব্যাহত আছে।

এসব বিষয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির বিপরীতমুখী। এ কারণেও দলটি পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাড়তে থাকা সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে বলে মনে করেন কেউ কেউ।

বাংলাদেশে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উপস্থিতি আছে?

সর্বশেষ গত ১০ আগস্ট ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং বা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন ঢাকা সফর করেছেন। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা রয়েছে—এমন সন্দেহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে।

এখন আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতার অভিযোগ করছে।

গত মে মাসে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে মাদক নিয়ন্ত্রণে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এতে বলা হয়েছে, ‘উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো মাদক পাচারকারী এবং অপরাধী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে সময়োপযোগী গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করবে।’

বাংলাদেশে গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এ বিষয়ে তার জানা নেই।

তিনি বলেন, ‘এখানে তো অনেকে বলে, যে ‘র’ ভর্তি হয়ে আছে, মোসাদ ভর্তি হয়ে আছে। তো আমরা তো জানি না।’

তার মতে, প্রযুক্তির এত উন্নতি হয়েছে যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে এখন মানুষ পাঠানোর প্রয়োজন আগের মতো নেই।

তবে তিনি বলেন, ‘যেখানে যেখানে দূতাবাস আছে সেখানে সেখানে কিছু গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান হয়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’

বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে মানব গোয়েন্দা তৎপরতার প্রয়োজন হলেও ভারত বা পাকিস্তানের নিজেদের লোক নিয়োগের বদলে বাংলাদেশের মানুষকেই কাজে লাগানো হতে পারে বলে মনে করেন এম সাখাওয়াত হোসেন।

এ ধরনের কার্যক্রম সাধারণত গোপন থাকে। ফলে এর সঠিক তথ্যপ্রমাণ পাওয়া কঠিন।

অধ্যাপক তৌফিক এম হকও বলেন, ‘বাংলাদেশে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা, সবাই কাজ করে। আমরা কিছু বুঝতে পারি, কিছু বুঝতে পারি না।’

তবে বিশ্লেষকদের মতে, গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা থাকলেও পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত না থাকায় এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন।

তাদের মতে, আওয়ামী লীগের এসব অভিযোগ ভারত বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে দেওয়া হলেও বাংলাদেশের মানুষের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন