তিন দশক পেরিয়েও যার মৃত্যুরহস্যের জট খোলেনি, সেই সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন এক সময়ের চলচ্চিত্র খলনায়ক আশরাফুল হক ওরফে ডন। সৌদি আরব যাওয়ার পথে গত রোববার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে গ্রেপ্তার হয়ে তিনি এখন কারাগারে। তার গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ১৯৯৬ সালের সেই আলোচিত মৃত্যুর ঘটনায় পুরোনো নথি, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ১২ লাখ টাকার চুক্তি এবং পরস্পরবিরোধী তদন্ত-তথ্য ফের সামনে এসেছে।
গতকাল মঙ্গলবার সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পাশাপাশি সালমান শাহ হত্যার দিন অর্থাৎ ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ইস্কাটনের বাসায় ঠিক কী ঘটেছিল, কারা সেখানে ছিলেন, কেন মৃত্যুটিকে আত্মহত্যা বলা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে কেন পরিবার হত্যার অভিযোগে অনড় থাকল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই চলছে নতুন তদন্ত।
গত রোববার দুপুরে সৌদি আরবে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে যান ডন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরই ইমিগ্রেশন পুলিশের নজরে পড়েন তিনি। সালমান শাহ হত্যা মামলায় তার বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকায় তাকে আর যেতে দেওয়া হয়নি। পরে সিআইডিকে খবর দেওয়া হলে সংস্থাটির কর্মকর্তারা তাকে নিজেদের হেফাজতে নেন। গত বছর হত্যা মামলা হওয়ার পর আসামিদের দেশত্যাগ ঠেকাতে পুলিশের পক্ষ থেকে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে তথ্য দেওয়া হয়েছিল।
গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে আদালতে হাজির করা হয়। সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা আরিফুর রহমান তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। বিস্ফোরক তথ্য ও ১২ লাখ টাকা লেনদেন
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও পাবলিক প্রসিকিউটরের আদালতে দেওয়া বক্তব্য চলচ্চিত্রাঙ্গনসহ পুরো দেশে তোলপাড় ফেলে দিয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের বরাত দিয়ে সিআইডি সূত্র জানায়, রাজসাক্ষী রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ ১৯৯৭ সালের একটি মামলায় গ্রেপ্তারের পর আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছিলেন। সেখানে সালমান শাহকে হত্যার পরিকল্পনা, কয়েকজনের সম্পৃক্ততা ও অর্থ লেনদেনের কথা উঠে আসে বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করছে। গত সোমবার আদালতের বক্তব্য নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, সালমানের স্ত্রী সামিরার সঙ্গে ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সম্পর্কের জেরে হত্যার পরিকল্পনা হয়েছিল এবং ডনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তির কথা ওই জবানবন্দিতে রয়েছে।
সূত্র বলছে, রিজভী আহমেদ সম্প্রতি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন—এমন দাবি করেছেন। একই সঙ্গে তিনি সালমান ও শাবনূরকে ঘিরেও নানা বক্তব্য দিয়েছেন, যার কয়েকটি পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করেছেন শাবনূর। প্রায় তিন দশক আগের জবানবন্দি ও সাম্প্রতিক বক্তব্যের মধ্যে যে বিরোধ দেখা যাচ্ছে, সেটিও সিআইডির জন্য গুরুত্বপূর্ণ তদন্তের বিষয়। পুরোনো ১৬৪ ধারার বক্তব্য কোন পরিস্থিতিতে দেওয়া হয়েছিল, সেটি প্রত্যাহার বা পরিবর্তনের কোনো কারণ ছিল কি না, সেই বক্তব্যের সঙ্গে অন্য কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণের মিল আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে সিআইডির তদন্তে।
সালমানের পরিবারের অভিযোগ নিয়েও কাজ করবে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। ঘটনার দিন তার স্ত্রী সামিরা হক পরিবারের সদস্যদের বাসায় ঢুকতে দেননি বলে সালমানের পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া অভিযোগও গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হবে। পরে রাতে প্রোডাকশন ম্যানেজার খবর দিলে সালমানের পরিবার গিয়ে দেখে তার লাশ সিলিংয়ের সঙ্গে ঝুলছে। তার ছোট ভাইকে অপহরণেরও চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। পরবর্তীতে ক্যান্টনমেন্ট থানায় করা একটি মামলায় রিজভী আহমেদ স্বীকারোক্তি দেন, সামিরার সঙ্গে ডনের অবৈধ সম্পর্ক ছিল।
পুরোনো তদন্তে কী বের হয়েছিল
সালমান শাহর মৃত্যুর পর তার বাবা কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা করেছিলেন। পরে পরিবার থেকে হত্যার অভিযোগ তোলা হয়। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি তদন্ত শেষে আদালতে যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়, তাতে মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়েছিল। সেই প্রতিবেদন নিয়ে পরিবার আপত্তি জানায় এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর বিচার বিভাগীয় তদন্তও হয়। ২০১৪ সালে দেওয়া ওই তদন্ত প্রতিবেদনেও হত্যার অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ২০১৬ সালে পিবিআইকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিবিআই ৬০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দিয়ে জানায়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি; তিনি আত্মহত্যা করেছেন। পরিবার ওই প্রতিবেদনেও নারাজি দেয়।
মামলার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড় আসে ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় করা অপমৃত্যুর মামলা বাতিল করে ঘটনাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। পরদিন রমনা থানায় ১১ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করা হয়। মামলার আসামিরা হলেন- সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক, তার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, অভিনেতা ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু ও রিজভী আহমেদ।
লাশ তোলা নিয়ে অস্পষ্টতা
সালমান শাহ মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়েও নতুন করে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। গত জুনে আদালত তার দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলন করে সুরতহাল ও পুনরায় ময়নাতদন্তের অনুমতি দিয়েছিল। সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা ২০ মে এ আবেদন করেছিলেন এবং ২৪ মে আদালত তা অনুমোদন করে। পরে ২৩ জুন বাদীপক্ষের আবেদনের পর দেহাবশেষ উত্তোলনের আগের আদেশ বাতিলের বিষয়ে আদালতে প্রক্রিয়া শুরু হয়; একাধিক প্রতিবেদনে আদালত ওই আবেদন মঞ্জুর করে আগের আদেশ বাতিল করার কথা জানানো হয়েছে। বাদীপক্ষের যুক্তি ছিল, প্রায় তিন দশক পর দেহাবশেষ থেকে কার্যকর আলামত পাওয়ার সম্ভাবনা কম এবং ধর্মীয় ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়টিও তদন্তে খতিয়ে দেখবে সিআইডি।
সিআইডির এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
সিআইডি সূত্র জানায়, ডনের গ্রেপ্তার মামলার তদন্তে নতুন একটি দরজা খুলেছে। এখন তদন্তকারীরা তার বক্তব্যের সঙ্গে ১৯৯৭ সালের নথি, রিজভীর ১৬৪ ধারার জবানবন্দি, পুরোনো তদন্ত প্রতিবেদন, পরিবারের বক্তব্য ও নতুন মামলার এজাহার মিলিয়ে দেখতে পারবেন। ডনের কাছে তদন্তকারীদের সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে—১৯৯৬ সালের ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর তার চলাফেরা কোথায় ছিল, সালমানের সঙ্গে তার শেষ যোগাযোগ কবে, সামিরা ও অন্য আসামিদের সঙ্গে তার যোগাযোগের প্রকৃতি কী ছিল, রিজভীর সঙ্গে তার সম্পর্ক কী, ১২ লাখ টাকার চুক্তির কোনো বাস্তব ভিত্তি ছিল কি না এবং থাকলে অর্থের উৎস ও গন্তব্য কী। তদন্তের স্বার্থে পুরোনো সাক্ষীদের বক্তব্যও নতুন করে যাচাই করা হতে পারে। বিশেষ করে যারা ঘটনার দিন ইস্কাটনের বাসায় গিয়েছিলেন, সালমানকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় সঙ্গে ছিলেন কিংবা পরবর্তী সময়ে তদন্ত সংস্থার কাছে বক্তব্য দিয়েছেন—তাদের বক্তব্যের সঙ্গে নতুন তথ্যের মিল-অমিল খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে উঠেছে।
নীলা চৌধুরীর ক্ষোভ ও পরিবারের দাবি
ছেলের খুনিদের বিচারের আশায় তিন দশক ধরে পথ চেয়ে থাকা সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী খলনায়ক ডনের গ্রেপ্তারের খবরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, ডনের মতো একজন এজাহারভুক্ত আসামির গ্রেপ্তারে তদন্তের ইতি ঘটতে পারে না। আমার ছেলেকে যে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা এতদিন পর হলেও উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। তিনি আরো দাবি করেন, ডনকে সিআইডির হেফাজতে নিয়ে নিবিড় রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে পুরো হত্যাকাণ্ডের নকশা সামনে চলে আসবে। একইসঙ্গে তিনি প্রধান আসামি সামিরা হক ও তার মা লতিফা হক লুসিসহ পলাতক আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানোর জোর দাবি জানান।
সিআইডির বক্তব্য ও ৩০ আগস্টের অপেক্ষা
তদন্তের অগ্রগতি ও ডনের গ্রেপ্তার নিয়ে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান আমার দেশকে জানান, এজাহারভুক্ত চার নম্বর আসামি গ্রেপ্তার হওয়া এই মামলার তদন্তে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। হত্যাকাণ্ডের মূল নেপথ্য ও রহস্য উন্মোচনে আইনানুগ সব আইনি পথ অনুসরণ করছে সিআইডি। প্রয়োজন মনে হলে ডনকে হেফাজতে এনে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ইতোমধ্যেই এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা আটবার পেছানো হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৩ জুলাই আদালত তদন্ত প্রতিবেদন জমার জন্য আগামী ৩০ আগস্ট দিন ধার্য করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে তোলপাড়
ডনের গ্রেপ্তারের পর ফেসবুক ও ইউটিউবেও সালমান শাহর মৃত্যুর পুরোনো ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ভক্তদের বড় একটি অংশ দ্রুত বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানাচ্ছেন। একই সময়ে পুরোনো বক্তব্য, রাজসাক্ষী রিজভীর সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার এবং শাবনূরের প্রতিবাদ ঘিরেও আলোচনা চলছে। ১১ আগস্টের সর্বশেষ আলোচনায় শাবনূর; রিজভীর সাম্প্রতিক বক্তব্যকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন; তিনি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের করার দাবি জানিয়েছেন। ফেসবুক ও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সালমান ভক্তদের তৈরি গ্রুপগুলোতে বইছে প্রশ্নের ঝড়। নেটিজেনদের দাবি, ডন যেহেতু ঘটনার দিনগুলোতে সালমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে ছিলেন, তাই তাকে নিবিড় রিমান্ডে নিলে সেই অন্ধকার রাতের বহু অজানা তথ্য উন্মোচিত হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


