দেশের সব নাগরিকের পরিচয় হবে বাংলাদেশি, সবার অধিকার সমান: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

দেশের সব নাগরিকের পরিচয় হবে বাংলাদেশি, সবার অধিকার সমান: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব নাগরিকের পরিচয় বাংলাদেশি—এটাই সাংবিধানিক সমাধান বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ‘আমরা সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী হব, আদিবাসী কেউ হব না। বাংলাদেশের সব নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে।’

মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে চিটাগাং হিল ট্র্যাক্ট রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সমাধান কেন সবাই চাইছেন, জানি না। যেখানে সমস্যা নেই, সেখানে সমাধানের প্রশ্নও আসে না। কেউ কেউ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের প্রতিনিধিত্ব না করলে এবং ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের “ডিক্লারেশন অন দ্য রাইটস অব ইন্ডিজেনাস পিপলস” সনদে বিভিন্ন দেশ স্বাক্ষর না করলে এই প্রসঙ্গটিই উঠত না।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ওই সনদে ভোটদানে বিরত ছিল। প্রভাবশালী কিছু রাষ্ট্রও সেখানে বিরোধিতা করেছে, বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। তাই এই সনদ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না—এর জবাব হচ্ছে, প্রযোজ্য নয়। আমরা এটার অংশীদার নই। আইএলও কনভেনশন ১৬৯-এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।’

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘তারপরও যদি কেউ শব্দের মধ্যে, বাক্যের মধ্যে সমস্যার সমাধান খুঁজতে চান, তাহলে বলা যায়—আমরা সবাই আদিবাসী না হয়ে যদি বাংলাদেশের অধিবাসী হই, তাহলেই সমাধান।’

জুলাই সনদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কয়েকজন বক্তা গণরায়ের কথা বলেছেন। কিন্তু জুলাই সনদ নিয়ে নতুন করে গণরায়ের প্রয়োজন নেই। কারণ এটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে সবাই স্বাক্ষর করেছেন। কেউ নির্বাচনের আগে, কেউ নির্বাচনের পরে স্বাক্ষর করেছেন। তবে স্বাক্ষরিত দলিল হিসেবে সেখানে যেসব বিষয়ে সবাই ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছাড়া একমত হয়েছেন, তার একটি হলো—বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরে বসবাসকারী সব নাগরিকের পরিচয় হবে বাংলাদেশি।

তিনি বলেন, ‘এটি পঞ্চম সংশোধনীর ভাষা। আমরা এটিকে আবার আগামী পঞ্চদশ সংশোধনীতে নিয়ে আসব। এটা আমাদের সমঝোতা, এটা আমাদের কমিটমেন্ট। এটি একটি সাংবিধানিক সমাধান।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তবে বাস্তবে যে বিভেদগুলো সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোর পেছনে একসময় কিছু বিদেশি উসকানি ছিল। এই সমস্যা শুধু একজনের ভাষণের প্রেক্ষিতে তৈরি হয়নি। এখনো ওই অঞ্চলে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র চালু নেই—এ কথা কেউ হলফ করে বলতে পারবেন না। সেই সীমানা আমাদের পূর্বদিকে, বাংলাদেশের ভূখণ্ডের পূর্ব দিকেও আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল তাদের বিভিন্ন স্বার্থে এসব পরিকল্পনা করছে।’

এ অবস্থায় করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের করণীয় হচ্ছে, আমরা বাংলাদেশি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ থেকে আমাদের বক্তব্য দিয়ে যাব। আমরা জাতীয় রাষ্ট্রের (ন্যাশনাল স্টেট) ধারণা থেকে কথা বলতে পারি।’

তিনি বলেন, জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণায় কোনো জাতিগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের স্বীকৃতি পায়। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পাওয়ার জন্য পৃথিবীর বহু জাতি শত বছর ধরে সংগ্রাম করেছে। বাঙালিরাও সেই সংগ্রাম করেছে।

‘পাল বা লক্ষ্মণ সেনের বহু আগে থেকেই আমরা এই ভূখণ্ডে একটি জাতি হিসেবে ছিলাম, ন্যাশনাল স্টেট হিসেবে একটাই ছিলাম। তবে বিভিন্ন সময়ে এই ভূখণ্ড উপমহাদেশের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে শাসিত হয়েছে। তারপরও আমরা নিজস্ব আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছি। ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়—ইশাখার সময় থেকে, তারও আগে এবং পরবর্তী সময়েও,’ বলেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মডার্ন ন্যাশনাল স্টেটের ধারণায় স্বাধীন রাষ্ট্রের সংখ্যা গণনা করলে বাংলাদেশ কবে ন্যাশনাল স্টেট, স্বাধীন দেশ ও রাষ্ট্র হয়েছে—সেটা আমরা ১৯৭১ সাল থেকে গণনা করি। কিন্তু তার আগেও আমাদের জাতিসত্তা ছিল।’

তিনি বলেন, ‘এই জাতিসত্তার মধ্যে, এই ভূখণ্ডের মধ্যে, এই টেরিটরির মধ্যে ন্যাশনাল স্টেট হিসেবে নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে আমরা সবাই বাংলাদেশি। এর মধ্যে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতি ও ভাষাভাষীর মানুষ থাকবে—এটাই স্বাভাবিক।’

পার্শ্ববর্তী দেশের উদাহরণ দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সেখানে কমবেশি ৩৬টি ভাষা ব্যবহৃত হয় এবং আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে বিভিন্ন স্টেট মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার ভাষা রয়েছে। ‘কিন্তু তারা তো দেড় হাজার জাতীয় নয়, ৩৬টি জাতীয়ও নয়। তাদের মধ্যেও আদিবাসী ঘোষণার জন্য কোনো কোনো জায়গায়, কোনো কোনো স্টেটে দাবি উঠে থাকে। কিন্তু তারাও সেটি স্বীকৃতি দেয়নি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের পার্বত্য অঞ্চলে এই দাবি এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলের উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে এই দাবি উচ্চারণের পেছনে কী কারণ থাকতে পারে, সেই কারণগুলো আমি আজকে উদ্ঘাটন করতে চাই না। আমাদের সামরিক বাহিনীর সিনিয়র বন্ধুরা, যারা এ বিষয়ে গবেষণা করছেন, তারা বিষয়গুলো নিয়ে বলেছেন।’

আলোচনায় সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টি তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সাংবিধানিকভাবে আমরা এখন পর্যন্ত যেটা স্বীকৃতি দিয়েছি, তা হচ্ছে—উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং বিভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আমরা বিকশিত করব এবং ধারণ করব। এটাই আমাদের বর্তমান অবস্থান।’

তিনি বলেন, ‘পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হিসেবে সমতলের মানুষের তুলনায় নারী, শিশু এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু কিছু রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেওয়া আছে। এটিও বিভিন্ন দেশে হয়ে থাকে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশেও তফসিলি জাতিসহ অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কোটা, রিজার্ভেশন এবং অন্যান্য সুবিধা রয়েছে।’

এসব সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের মধ্যে বিকাশের ক্ষেত্রে যাতে সমতা আসে, সেজন্য সংবিধান ও রাষ্ট্র এসব সুবিধার স্বীকৃতি দিয়েছে। সে হিসেবে তারা এসব সুবিধা পায়। কালের বিবর্তনে এসব সুবিধা পেতে পেতে হয়তো একসময় তারা সমতার জায়গায় চলে আসবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘আমরা কেন নদীর অববাহিকায় বসবাস করলাম, আরেকজন কেন পাহাড়ি জনপদে বসবাস করল—সেটার ভিত্তিতে তো কোনো ন্যাশনাল স্টেট হতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেছেন, ভুল প্রশ্নের সঠিক উত্তর হয় না। আমরা আসলে ভুল প্রশ্নেও নেই। এটা কোনো প্রশ্নই নয়।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী হব। আদিবাসী কেউ হব না। এখানে সব নাগরিকের সমান অধিকার। বাংলাদেশের সব ধর্মের, সব বর্ণের, সব সংস্কৃতির, সব ভাষাভাষীর মানুষ—সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। নাগরিক হিসেবে সংবিধান প্রদত্ত অধিকার আমাদের সবার সমান। এই পরিচয়েই আমরা থাকব।’

গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ামসহ অন্যরা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন