পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র করছে ইসরাইল

পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র করছে ইসরাইল

পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে গোপনে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইসরাইলের বিরুদ্ধে। এর উদ্দেশ্য হতে পারে পাকিস্তানের ওপর নতুন ধরনের চাপ সৃষ্টি করা এবং দেশটির ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও নতুন ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে বিষয়টি পাকিস্তানের অখণ্ডতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

তবে ইসরাইলি সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক সমর্থনের ঘোষণা পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি এখনো রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের বক্তব্য এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বেলুচিস্তানকে পাকিস্তান থেকে আলাদা করার আন্দোলনের সঙ্গে ইসরাইলের গোপন যোগাযোগ বা সমর্থনের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানবিরোধী বিভিন্ন বেলুচ গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং তথাকথিত ‘স্বাধীন বেলুচিস্তান’ ঘোষণার দাবিকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে।

গত জুলাইয়ে ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’-এর নামে একটি চিঠি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দাবি করা হয়, বেলুচিস্তান পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো অঞ্চলটির প্রায় ৮৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে এ দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা রাষ্ট্রও বেলুচিস্তানকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।

পাকিস্তানের আয়তনে সবচেয়ে বড় প্রদেশ বেলুচিস্তান। খনিজসম্পদ, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং আরব সাগরসংলগ্ন কৌশলগত অবস্থানের কারণে অঞ্চলটির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বেলুচিস্তানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে অঞ্চলটিকে ঘিরে অস্থিরতা শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে ভারত, চীন, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক স্বার্থও জড়িয়ে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বঞ্চনা, প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ এবং নিরাপত্তা অভিযান নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। এসব কারণেই বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শক্তিশালী হয়েছে। ফলে বেলুচ সংকটকে শুধু বাইরের ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখলে এর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলো আড়ালে থেকে যেতে পারে।

সম্প্রতি পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। একই সময়ে পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরেও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশি গণমাধ্যমের স্থানীয় কর্মীদের চলাচল ও রিপোর্টিংয়ের ওপরও নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে পাকিস্তান।

ইসরাইলের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলের কঠোর সমালোচক। ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ সংক্রান্ত ইসরাইলি বক্তব্যেরও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, এ ধরনের ধারণা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের নীতির পরিপন্থী এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।

এই রাজনৈতিক বৈরিতার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের সম্ভাব্য তৎপরতা নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রকাশ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত প্রমাণ সামনে আসেনি, যার ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে ইসরাইল রাষ্ট্রীয়ভাবে বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে অর্থ, অস্ত্র বা সামরিক সহায়তা দিচ্ছে।

তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, পাকিস্তান বর্তমানে একাধিক অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক চাপের মুখে রয়েছে। বেলুচিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্রোহ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা সমস্যা দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে বেলুচিস্তান প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। পাকিস্তানকে ঘিরে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। ফলে কোনো বহিরাগত শক্তি যদি বেলুচিস্তানের অস্থিরতাকে নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে, তাহলে পাকিস্তানের জন্য নতুন নিরাপত্তা সংকট তৈরি হতে পারে।

পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার ক্ষেত্রে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বেলুচিস্তানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের কার্যকর সমাধান করা। কারণ অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ যত বাড়বে, বহিরাগত শক্তির জন্য সেই দুর্বলতাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগও তত বাড়বে।

ইসরাইল বেলুচিস্তান আন্দোলনকে গোপনে সমর্থন দিয়ে পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র করছে—এমন অভিযোগ এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়। তবে বেলুচিস্তানের চলমান অস্থিরতা, স্বাধীনতার দাবি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা পাকিস্তানের সামনে নতুন ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ইসলামাবাদের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা, অন্যদিকে বেলুচিস্তানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অভিযোগের কার্যকর সমাধান। তা না হলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা ও রয়টার্স

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন