দেশে আবার ভাইরাসজনিত রোগ হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। চলতি মাসেই অন্তত ২১ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং বিভিন্ন জেলার হাসপাতালে প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। এতে শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী, ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, পাবনা, যশোর ও নাটোরে সংক্রমণের হার বেশি। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ শিশু, ময়মনসিংহে তিনজন, রাজধানীর সংক্রামক রোগ হাসপাতালে তিনজন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে আরো তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে পরীক্ষায় আক্রান্ত শিশুদের শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ সতর্কতা না নিলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে মহামারির রূপ নিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের শুরু থেকেই হাম আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ঢাকার সংক্রামক রোগ হাসপাতালে মাত্র তিন মাসেই ২৫০-এর বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। আক্রান্তদের বড় অংশই পাঁচ বছরের নিচের শিশু। বিশ্ব পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ হাম আক্রান্ত হয় এবং এক লক্ষাধিক মৃত্যু ঘটে। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে ঝুঁকি বেশি। হাম রোগের ইতিহাস অনেক পুরোনো। নবম শতকে আবু বকর মুহাম্মদ ইবন জাকারিয়া আল রাজি প্রথম এই রোগের বিস্তারিত লিখিত বর্ণনা দেন। পরে ১৭৫৭ সালে ফ্রান্সিস হোম প্রমাণ করেন যে হাম একটি সংক্রামক জীবাণুর কারণে হয়ে থাকে। ১৯৫৪ সালে জন এন্ডার্স এবং টমাস পিবলস যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন শহরে হামে আক্রান্ত রোগীর নমুনা থেকে ভাইরাসটি আলাদা করতে সক্ষম হন।
হামের প্রকারভেদ
সাধারণ হাম
* জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া
* চোখ লাল হওয়া
* মুখ থেকে সারা শরীরে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়া। সঠিক যত্নে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুস্থ হওয়া সম্ভব
জটিল হাম
* দীর্ঘস্থায়ী জ্বর
* তীব্র দুর্বলতা
* শ্বাসকষ্ট বা অন্যান্য জটিলতা।
অপুষ্ট শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
অপ্রচলিত হাম
* অস্বাভাবিক র্যাশ
* উচ্চমাত্রার জ্বর
* শরীরে অস্বস্তি
লক্ষণ : ধাপে ধাপে প্রকাশ
প্রাথমিক পর্যায়
* উচ্চ জ্বর
* শুকনো কাশি
* নাক দিয়ে পানি পড়া
মধ্যবর্তী পর্যায়
* চোখ লাল হওয়া
* আলোতে অস্বস্তি
পরবর্তী পর্যায়
* মুখে লালচে ফুসকুড়ি
* পরে তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া
হামের জটিলতা
হাম অবহেলা করলে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে—
* নিউমোনিয়া : ফুসফুসে সংক্রমণ হয়ে শ্বাসকষ্ট
* এনসেফালাইটিস : মস্তিষ্কে প্রদাহ ও স্নায়বিক সমস্যা
* ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা : শরীর দুর্বল হয়ে পড়া
* অপুষ্টি বৃদ্ধি : খাওয়ার রুচি কমে যাওয়া। গবেষণায় দেখা গেছে, গুরুতর আক্রান্তদের একটি অংশ এসব জটিলতায় ভোগে এবং সময়মতো চিকিৎসা না পেলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে
সংক্রমণ কীভাবে ছড়ায়?
* কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ছড়ায়
* একই ঘরে থাকলে দ্রুত সংক্রমণ হয়
* একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে গড়ে ৯-১০ জন সংক্রমিত হতে পারে
শিশু সুরক্ষায় করণীয়
আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা
* অন্তত ৮-১০ দিন অন্যদের থেকে দূরে রাখুন
* বাইরে যাওয়া বন্ধ রাখুন
পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
* নিয়মিত হাত ধোয়া
* কাশি-হাঁচির শিষ্টাচার মানা
* ব্যবহার্য জিনিস পরিষ্কার রাখা
পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা
* ফল, সবজি ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার
* সহজপাচ্য ও তরল খাবার
পর্যাপ্ত বিশ্রাম
* শিশুকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখা
পানিশূন্যতা প্রতিরোধ
* পর্যাপ্ত পানি ও তরল গ্রহণ
ত্বক ও চোখের যত্ন
* পরিষ্কার পানি দিয়ে চোখ ধোয়া
* ফুসকুড়ি পরিষ্কার রাখা
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে—
* শ্বাসকষ্ট
* খিঁচুনি
* অতিরিক্ত দুর্বলতা
* খাওয়াতে না পারা
* তীব্র ডায়রিয়া
ঝুঁকিপূর্ণ শিশু
* ৫ বছরের নিচের শিশু
* অপুষ্টিতে ভোগা শিশু
* দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশু
পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে সতর্কবার্তা দিচ্ছে। সঠিক সময়ে শনাক্তকরণ, পরিচর্যা ও সচেতন আচরণই পারে এই রোগের ঝুঁকি কমাতে। প্রকারভেদ, লক্ষণ ও জটিলতা সম্পর্কে ধারণা থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব, যা একটি শিশুর জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

