বর্তমান সময়ে Measles একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। শিশুদের মধ্যে এটি জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে র্যাশ সৃষ্টি করে, যার ফলে অভিভাবকরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হন। অনেক ক্ষেত্রে হামের পরে ফুসফুসে সংক্রমণ হয়ে পোস্ট-মিজেল নিউমোনিয়া দেখা দেয়, যা হামের সবচেয়ে বিপজ্জনক জটিলতাগুলোর একটি।
হাম কীভাবে নিউমোনিয়ার কারণ হয়?
হামের ভাইরাস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। ফলে—
* ভাইরাস নিজেই ফুসফুস আক্রান্ত করতে পারে।
* ব্যাকটেরিয়া সহজে সংক্রমণ ঘটায়।
* অপুষ্ট শিশুর ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়।
পোস্ট-মিজেল নিউমোনিয়ার ধরন
১. ভাইরাল নিউমোনিয়া—হামের ভাইরাসের সরাসরি প্রভাব
২. ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়া
সবচেয়ে বেশি—Streptococcus pneumoniae, Staphylococcus aureus ও Haemophilus influenzae
হামের সাধারণ লক্ষণ
উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া, মুখের ভেতরে Koplik spot ও শরীরে লাল র্যাশ।
পোস্ট-মিজেল নিউমোনিয়ার লক্ষণ
হামের কয়েকদিন পরে যদি দেখা যায়, জ্বর আবার বেড়ে যাচ্ছে, কাশি বাড়ছে, শিশু দ্রুত শ্বাস নিচ্ছে, বুক বসে যাচ্ছে, খেতে কষ্ট হচ্ছে বা শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, তাহলে শিশুর নিউমোনিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিপদের লক্ষণ
ঠোঁট নীল হয়ে যাওয়া, শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া, শিশুর অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব, খেতে না পারা, খিঁচুনি হওয়া বা শ্বাস নেওয়ার সময় বুক বেশি ভেতরে বসে যাওয়া—এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে শিশুকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
করণীয়
হাসপাতালে প্রয়োজন হতে পারে—অক্সিজেন, অ্যান্টিবায়োটিক, IV fluid, নেবুলাইজেশন, Chest X-ray ও CBC, CRP
বাড়িতে যত্ন
শিশুকে পর্যাপ্ত তরল খাবার ও পানি দিতে হবে। বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যেতে হবে এবং পুষ্টিকর ও সহজপাচ্য খাবার খাওয়াতে হবে। জ্বর থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। পাশাপাশি শিশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হবে।
ভিটামিন A এর গুরুত্ব
হাম আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন A দিলে জটিলতা কমে, চোখের ক্ষতির ঝুঁকি হ্রাস পায় এবং মৃত্যুঝুঁকিও কমতে পারে।
সম্ভাব্য জটিলতা
* Pneumonia * Empyema * Lung abscess
* Sepsis * Respiratory failure
প্রতিরোধ
হাম ও এর জটিলতা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা। বাংলাদেশের EPI কর্মসূচির আওতায় MR vaccine দেওয়া হয়, যা শিশুদের হাম ও এর জটিলতা থেকে সুরক্ষা দেয়।
কোন শিশু বেশি ঝুঁকিতে?
অপুষ্ট শিশু, টিকা না নেওয়া শিশু, কম বয়সী শিশু এবং যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তারা হামের জটিলতায় বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
হামের টিকা (Measles vaccine) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টিকা, যা হাম রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়। এটি সাধারণত শিশুদের দেওয়া হয়, তবে প্রয়োজন হলে বড়দেরও দেওয়া যেতে পারে।
হামের টিকা কী
হামের টিকা সাধারণত এমএমআর টিকা (MMR vaccine) এর অংশ হিসেবে দেওয়া হয়। এই টিকা তিনটি রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়—হাম (Measles), মাম্পস (Mumps) ও রুবেলা (Rubella)।
কখন দেওয়া হয়?
বাংলাদেশসহ অনেক দেশে সাধারণ সময়সূচি:
* ১ম ডোজ : ৯ মাস বয়সে
* ২য় ডোজ : ১৫ মাস বা ১৮ মাসে (দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে)
বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়াতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিকমেন্ডেশন গাইডলাইন অনুসারে ছয় মাস বয়স থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত বাচ্চাদের EPI শিডিউলের বাইরে অতিরিক্ত এক ডোজ হামের টিকা দেওয়ার কার্যক্রম গুরুত্ব অনুযায়ী শুরু করা হয়েছে। ফলে আপনার বাচ্চাকে হামের প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা করার জন্য টিকা দিন।
কেন এই টিকা জরুরি?
হাম একটি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং সারা শরীরে লাল ফুসকুড়ি সৃষ্টি করে। গুরুতর ক্ষেত্রে এটি নিউমোনিয়া বা মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো বিপজ্জনক জটিলতা ঘটাতে পারে। তাই এই রোগ প্রতিরোধে টিকা দেওয়া খুবই জরুরি।
টিকা দিলে…
টিকা দিলে রোগ প্রতিরোধ করা যায়, জটিলতা কমে এবং অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া থেকেও সুরক্ষা পাওয়া যায়।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
হামের টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাধারণত খুব হালকা হয়। হালকা জ্বর হতে পারে, ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা বা ফোলা দেখা দিতে পারে এবং কখনও কখনও সামান্য ফুসকুড়ি হতে পারে। গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই বিরল।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা
* টিকা নেওয়া শিশুদের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ।
* টিকা না নিলে হাম দ্রুত ছড়াতে পারে।
* জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির অংশ হিসেবে এটি বিনা মূল্যে দেওয়া হয়।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, পালমোনোলজি বিভাগ
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

