একসময় নতুন মোবাইল কিনলেই প্রথম কাজ ছিল একটি ছোট্ট প্লাস্টিকের সিম কার্ড ফোনে ঢোকানো। সেই সিমের আকারও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে। স্ট্যান্ডার্ড সিম থেকে মিনি, মাইক্রো, তারপর ন্যানো সিম। কিন্তু প্রযুক্তি এখন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সেই প্লাস্টিকের সিম কার্ডেরও প্রয়োজন ফুরিয়ে যেতে পারে। বিশ্বজুড়ে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ই-সিম (eSIM) বা Embedded SIM প্রযুক্তি। এতে ফোনের ভেতরেই স্থায়ীভাবে একটি ডিজিটাল সিম চিপ সংযুক্ত থাকে। ফলে আলাদা করে কোনো ফিজিক্যাল সিম কার্ড ব্যবহার করতে হয় না। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই মোবাইল যোগাযোগের ধরন বদলে দিতে পারে এই প্রযুক্তি।
ই-সিম মূলত একটি প্রোগ্রামযোগ্য ডিজিটাল সিম, যা ফোনের মাদারবোর্ডের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত থাকে। এটি খুলে বা বদলে ফেলা যায় না। বরং মোবাইল অপারেটরের দেওয়া একটি কিউআর (QR) কোড স্ক্যান করলে বা ডিজিটাল প্রোফাইল ডাউনলোড করলেই কয়েক মিনিটের মধ্যে সংযোগ চালু করা যায়। অর্থাৎ নতুন সিম কিনে ফোনে লাগানোর ঝামেলা ছাড়াই ব্যবহারকারী মোবাইল নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারেন।
ই-সিম প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো উপযোগিতা ও নমনীয়তা। ধরুন, আপনি বিদেশে ভ্রমণে গেলেন। আগে স্থানীয় সিম কিনে পুরোনো সিম খুলে নতুন সিম বসাতে হতো। এখন ই-সিম থাকলে কয়েক মিনিটেই স্থানীয় অপারেটরের ডিজিটাল প্রোফাইল ডাউনলোড করে সংযোগ চালু করা সম্ভব। ফলে সময়ও বাঁচে, আবার ছোট্ট সিম কার্ড হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে না।
এই প্রযুক্তি স্মার্টফোনের নকশাতেও পরিবর্তন আনছে। যেহেতু সিম ট্রে প্রয়োজন হয় না, তাই ফোনের ভেতরে কিছু অতিরিক্ত জায়গা পাওয়া যায়। নির্মাতারা সেই জায়গা বড় ব্যাটারি, উন্নত কুলিং সিস্টেম কিংবা নতুন হার্ডওয়্যার সংযোজনের জন্য ব্যবহার করতে পারেন। পাশাপাশি সিম ট্রে না থাকায় পানি ও ধুলাবালু প্রতিরোধী (Water & Dust Resistant) ডিজাইন আরো সহজে তৈরি করা সম্ভব।
স্মার্টওয়াচ, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ ও ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) ডিভাইসেও ই-সিম প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ছোট আকারের এসব ডিভাইসে ফিজিক্যাল সিমের জন্য আলাদা জায়গা রাখা কঠিন। সেখানে ই-সিম একটি কার্যকর সমাধান। ভবিষ্যতে স্মার্ট কার, শিল্পকারখানার সেন্সর ও স্মার্ট সিটির বিভিন্ন সংযুক্ত ডিভাইসেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার আরো বিস্তৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ই-সিমের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অনেক ব্যবহারকারীর জন্য নতুন ফোনে নম্বর স্থানান্তরের প্রক্রিয়া এখনো ফিজিক্যাল সিমের তুলনায় কিছুটা জটিল হতে পারে। আবার সব মোবাইল অপারেটর এখনো পূর্ণাঙ্গ ই-সিম সেবা চালু করেনি। ফলে ব্যবহারকারীদের সুবিধা অনেকাংশে অপারেটরের অবকাঠামো ও নীতিমালার ওপর নির্ভর করে।
নিরাপত্তার দিক থেকেও ই-সিম কিছু সুবিধা দেয়। ফোন চুরি হলে চোর সহজে সিম খুলে ফেলতে পারে না, ফলে ডিভাইস ট্র্যাক করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। তবে ডিজিটাল প্রোফাইল ব্যবস্থাপনার কারণে সাইবার নিরাপত্তা এবং পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অপারেটরদের শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বের বড় স্মার্টফোন নির্মাতারা ইতোমধ্যে ই-সিমের দিকে ঝুঁকছে। কিছু দেশে এমন স্মার্টফোনও বিক্রি হচ্ছে, যেখানে ফিজিক্যাল সিম স্লটই নেই। পুরোপুরি ই-সিমের ওপর নির্ভর করেই ডিভাইসটি কাজ করে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে আরো বেশি নির্মাতা এই পথেই হাঁটবে। যেমন একসময় হেডফোন জ্যাক বা অপটিক্যাল ডিস্ক ড্রাইভ ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে, তেমনি ফিজিক্যাল সিমও একদিন ইতিহাস হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে ই-সিমের ব্যবহার বাড়ছে। দেশের কয়েকটি মোবাইল অপারেটর ইতোমধ্যে এই সেবা চালু করেছে এবং নতুন প্রজন্মের অনেক স্মার্টফোনে ই-সিম সমর্থন রয়েছে। যদিও এখনো অধিকাংশ ব্যবহারকারী ফিজিক্যাল সিম ব্যবহার করছেন। তবু ডিজিটাল সেবার বিস্তার ও আধুনিক ডিভাইসের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ই-সিমের জনপ্রিয়তা বাড়বে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

