মহাকাশ প্রযুক্তি

মাহদী হাসান

মহাকাশ প্রযুক্তি

বর্তমান সময়টা মূলত বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করেই অতিবাহিত হচ্ছে। মানুষের মেধা, গবেষণার শক্তির মাধ্যমেই পৃথিবী প্রতিনিয়ত উন্নতির নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক সভ্যতার যতগুলো আবিষ্কার রয়েছে, মহাকাশ প্রযুক্তি তার মধ্যে অন্যতম একটি বিপ্লবের নাম।

একসময় যেগুলো মানুষের চিন্তার বাইরে ছিল, সেগুলো আজ হাতের মুঠোয়। বিজ্ঞানীরা চাঁদে ভ্রমণ করেছেন, মঙ্গল গ্রহে রোবট পাঠিয়েছেন এবং মহাবিশ্বের অনেক কিছু আজ আমাদের সামনে স্পষ্ট।

বিজ্ঞাপন

এই প্রযুক্তি শুধু আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেনি, বরং আধুনিক জীবনযাত্রাকে করেছে অনেক বেশি সহজ ও উন্নত। আজকের যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে আবহাওয়ার খবর, জিপিএস, টেলিভিশন সম্প্রচার এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে মহাকাশ প্রযুক্তির অবদান অনস্বীকার্য।

তাই বলা যায়, আধুনিক সভ্যতার পথচলায় এই প্রযুক্তির ভূমিকা নিরন্তর। মহাকাশ প্রযুক্তি বলতে আসলে মহাকাশ সম্পর্কিত সব ধরনের গবেষণা, পর্যবেক্ষণ এবং অভিযান পরিচালনার কৌশলকে বোঝায়। এর ভেতরে রকেট, কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট, মহাকাশযান, স্পেস স্টেশন, টেলিস্কোপ এবং রোবোটিক সিস্টেমের মতো উন্নত সব যন্ত্রপাতি অন্তর্ভুক্ত।

সহজভাবে বললে, মহাকাশকে চেনা এবং সেখানে মানুষের কার্যক্রম চালানোর জন্য যে প্রযুক্তি কাজ করে, তাই মহাকাশ প্রযুক্তি। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ মহাকাশ নিয়ে আগ্রহী ছিল। সে সময়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা গ্রহ-তারা নিয়ে অনেক পড়াশোনা করতেন।

তবে আধুনিক মহাকাশ প্রযুক্তির প্রকৃত বিপ্লব ঘটে বিংশ শতাব্দীতে। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন পৃথিবীর প্রথম স্যাটেলাইট স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণ করে, তখন থেকেই মহাকাশ গবেষণার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। এরপর ১৯৬১ সালে ইউরি গ্যাগারিন প্রথম মানব হিসেবে মহাকাশ ভ্রমণ করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন।

১৯৬৯ সালে নাসার অ্যাপোলো-১১ অভিযানে যখন নীল আর্মস্ট্রং চাঁদের মাটিতে প্রথম পা রাখলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘এটি একজন মানুষের জন্য ছোট পদক্ষেপ হলেও মানবজাতির জন্য এক বিরাট অগ্রগতি।’ তার সেই কথাটি আজও ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। এরপর থেকে পৃথিবীজুড়ে মহাকাশ গবেষণার প্রতিযোগিতা শুরু হয় এবং প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতি ঘটতে থাকে। মহাকাশ প্রযুক্তির একটি প্রধান হাতিয়ার হলো রকেট।

এটি এমন একটি শক্তিশালী বাহন, যা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ টান ছিঁড়ে মহাকাশে পৌঁছাতে পারে। রকেটের ওপর ভর করেই স্যাটেলাইট বা মহাকাশযানগুলো গন্তব্যে পৌঁছায়। বর্তমানে পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট তৈরি হওয়ার ফলে মহাকাশ অভিযানের খরচ অনেক কমে এসেছে। কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট এই প্রযুক্তির আরেকটি বড় অর্জন। এগুলো পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে এবং আমাদের নিরন্তর তথ্য পাঠায়। আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায় মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট টেলিভিশন এবং জিপিএস সিস্টেম সবই এই স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে পৃথিবীর এক প্রান্তের তথ্য অন্য প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যেই পৌঁছে যাচ্ছে।

মহাকাশচারীদের যাতায়াত এবং অন্যান্য গ্রহে গবেষণার জন্য যেসব যান ব্যবহার করা হয়, সেগুলোকে মহাকাশযান বলা হয়। চাঁদ ও মঙ্গলে পাঠানো বিভিন্ন যান আমাদের নিয়মিত মহাবিশ্বের নতুন নতুন ছবি ও তথ্য দিচ্ছে।

এমনকি বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানুষ পাঠানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। মহাকাশ গবেষণার জন্য ‘আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন’ বা আইএসএস এক অনন্য নাম। এটি পৃথিবীর কক্ষপথে ভাসমান একটি আধুনিক গবেষণাগার, যেখানে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ সময় ধরে মহাকাশের পরিবেশ এবং বিজ্ঞানের জটিল সব বিষয় নিয়ে কাজ করেন। টেলিস্কোপের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে আমরা মহাকাশের অতি দূরের নক্ষত্রপুঞ্জ বা গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করতে পারি। একসময় হাবল টেলিস্কোপ আমাদের মহাবিশ্বের চমৎকার সব ছবি দিয়েছে আর এখন জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ মহাবিশ্বের গূঢ় রহস্য খুঁজে বের করার কাজ করছে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনেও এই প্রযুক্তির প্রভাব ব্যাপক। বিশেষ করে, যোগাযোগ ব্যবস্থায় এটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। পৃথিবী আজ যে ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বা বিশ্বগ্রামে পরিণত হয়েছে, তার মূলে রয়েছে স্যাটেলাইট প্রযুক্তি। আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রেও এর জুড়ি মেলা ভার। উপগ্রহের মাধ্যমে আমরা আগেভাগেই ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা খরা সম্পর্কে জানতে পারি, ফলে দুর্যোগের ক্ষতি মোকাবিলা করা অনেক সহজ হয়। বাংলাদেশেও বড় বড় দুর্যোগের সংকেত পেতে আমরা এই প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করি। কৃষি ও চিকিৎসায়ও এর ছোঁয়া লেগেছে। স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করে মাটির অবস্থা বা ফসলের স্বাস্থ্য বোঝা যায়।

অন্যদিকে টেলিমেডিসিন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীরাও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। শিক্ষাক্ষেত্রেও মহাকাশ প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ভিডিও কনফারেন্সিং, অনলাইন লাইব্রেরি এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসারে স্যাটেলাইটের অবদান অনেক। এমনকি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সীমান্ত রক্ষা এবং তথ্যের নিরাপত্তার জন্য অনেক দেশ সামরিক স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে। তবে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার যেন বিশ্বশান্তির পথে বাধা না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। মহাকাশ প্রযুক্তির সুফলের পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। এই গবেষণায় যেমন বিশাল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়, তেমনি মহাকাশে ভাঙাচোরা যন্ত্রাংশের জঞ্জাল বেড়ে যাওয়া এক বড় সমস্যা। এসব বর্জ্য পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। বাংলাদেশও আজ মহাকাশ বিজ্ঞানে পিছিয়ে নেই। ২০১৮ সালে ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে আমরা বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি। এর ফলে আমাদের দেশের সম্প্রচার এবং টেলিকম খাতে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। আগামী দিনে বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে আরো বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা আকাশচুম্বী। বিজ্ঞানীরা স্বপ্ন দেখছেন মঙ্গলে মানুষের বসতি গড়ার এবং মহাকাশ ভ্রমণকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর রোবোটিকসের সমন্বয় মহাকাশ অভিযানের ধরনকেই বদলে দেবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন