মহাবিশ্বে এযাবৎকালের সবচেয়ে হালকা দুটি দানবীয় গ্রহের খোঁজ পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। পৃথিবী থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ আলোকবর্ষ দূরে একটি নক্ষত্রমণ্ডলে এই গ্রহ দুটির অবস্থান।
নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য জানানো হয়েছে।
গবেষকদের মতে, এই গ্যাসীয় গ্রহ দুটির ঘনত্ব তুলার চেয়েও কম। এই আবিষ্কার অত্যন্ত চরম ও অস্বাভাবিক উপায়ে গ্রহ গঠনের প্রক্রিয়াটি আরো ভালোভাবে বুঝতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করবে।
মডেলের বাইরে ‘সুপার-পাফ’
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানী জর্জ ড্র্যান্সফিল্ড এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা গ্রহের গঠন ও বিবর্তনের পুরো গল্পটি বুঝতে চাই। তবে সুপার-পাফ গ্রহগুলোর সমস্যা হলো, এগুলো আমাদের প্রচলিত মডেলের সঙ্গে মেলে না।’
বিজ্ঞানীদের মতে, একটি সুপার-পাফ গ্রহের অস্তিত্ব থাকাটাই প্রায় অসম্ভব। এটি মূলত এমন এক গ্যাসীয় গ্রহ, যার কেন্দ্র বা কোর অত্যন্ত ছোট। সাধারণত বায়ুমণ্ডলে থাকা বিপুল পরিমাণ গ্যাসকে মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে ধরে রাখার জন্য এই কেন্দ্রটি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক ছোট।
একটি সাধারণ গ্যাসীয় গ্রহের কেন্দ্রের ভর পৃথিবীর ভরের চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু অনেক সুপার-পাফ গ্রহের কেন্দ্র ও বায়ুমণ্ডল মিলিয়ে মোট ভরও এর চেয়ে কম।
ইউনিভার্সিটি অব ট্যাম্পার জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেসিকা লিবি-রবার্টস বলেন, ‘পৃথিবীর ভরের চেয়ে মাত্র এক, দুই বা পাঁচ গুণ বড় একটি কেন্দ্র কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ গ্যাস টেনে নেয়, তা পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে মেলানো কঠিন।’
নজিরবিহীন আবিষ্কার
২০১৪ সালে কেপলার-৫১ নামের একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করা তিনটি গ্রহে প্রথম এমন অস্বাভাবিক কম ঘনত্বের দেখা মেলে। ২০১৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইভ জে লি প্রথম ‘সুপার-পাফ’ শব্দটি ব্যবহার করেন এবং এর গঠনের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে কাজ করেন।
তার মতে, নির্দিষ্ট ঠান্ডা পরিবেশ এবং কম ধূলিকণার সঠিক পরিস্থিতিতেই কেবল এমন গ্রহ গঠন সম্ভব।
বর্তমানে মহাবিশ্বে ৩৯টি সুপার-পাফ গ্রহের সন্ধান মিলেছে এবং প্রতিটির বৈশিষ্ট্যই অদ্ভুত। তবে উইসকনসিন-ম্যাডিসন ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানী জুলিয়েট বেকার জানান, কিছু গ্রহ টেলিস্কোপের দূরত্বের কারণে বা শনির মতো বলয় থাকার কারণেও এমন কম ঘনত্বের দেখাতে পারে।
একই মণ্ডলে দুই সহোদর
নাসার ‘ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট’ প্রজেক্টের স্বেচ্ছাসেবকেরা প্রথম এই জোড়া গ্রহের সন্ধান পান। বিজ্ঞানীরা এই গ্রহ দুটির নাম দিয়েছেন ‘টিওআই-৭৯১বি’ এবং ‘টিওআই-৭৯১সি’।
গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রহ দুটির আকার বৃহস্পতির সমান বা তার চেয়ে বড় হলেও এদের ভর বৃহস্পতির ভরের মাত্র ৩ থেকে ৬ শতাংশ। এদের ঘনত্ব মানুষের তৈরি সবচেয়ে হালকা পদার্থ ‘অ্যারোজেল’-এর সঙ্গে তুলনীয়।
ড. লিবি-রবার্টস বলেন, ‘সুপার-পাফ গ্রহ এমনিতেই বিরল। একই নক্ষত্রমণ্ডলে একাধিক এমন গ্রহের দেখা পাওয়া আরো বেশি বিরল।’
এর আগে মাত্র চারটি নক্ষত্রমণ্ডলে একাধিক সুপার-পাফ গ্রহের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। একই সিস্টেমে একাধিক গ্রহের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে এটি টেলিস্কোপের কোনো ভুল নয়, বরং বাস্তবে এমন গ্রহের অস্তিত্ব রয়েছে।
ভবিষ্যত গবেষণা
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই গ্রহগুলোর গতিবিধির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে প্রায় এক শতাব্দী সময় লাগবে। তবে আপাতত গ্রহ দুটির গঠন ও আকৃতি বিস্তারিত জানতে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহারের আশা করছেন গবেষক জর্জ ড্র্যান্সফিল্ড।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


