ঈদের প্রস্তুতি ও কেনাকাটা

বিউটি হাসু

ঈদের প্রস্তুতি ও কেনাকাটা

দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদ। ঈদ আয়োজন মানেই হাজারো রকমের কাজ। আর কোরবানির ঈদে সে কাজ আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়। গৃহিণীদের ঈদের দিনের বেশির ভাগ সময় রান্নাঘরেই ব্যয় হয়। মাংস কাটা, সংরক্ষণ, অতিথি আপ্যায়নের ব্যবস্থা, রান্নাবান্না, ঘর পরিষ্কার—সব মিলিয়ে ঈদের দিন যেন দম ফেলারই ফুরসত থাকে না। তবে পরিকল্পনামাফিক কিছু কাজ আগেই গুছিয়ে রাখলে ঈদের সব কাজ সহজেই সম্পন্ন করা যায়; এতে সময়ও বাঁচে, সারা দিনের চাপও কমে। আর ঈদের রান্নাও দ্রুত সেরে ফেলা সম্ভব হয়। কোরবানির ঈদে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা ও রান্নাঘরের প্রস্তুতি নিয়ে আজকের বিশেষ আয়োজন।

কোরবানির আগে কেনাকাটা

বিজ্ঞাপন

ঈদের ঝামেলাহীন আয়োজনে ঠিক কী কী জিনিস আপনার প্রয়োজন, প্রথমেই তা দেখে নিন। প্রয়োজনীয় কোনো জিনিস খুঁজে পাচ্ছেন না বা নেই কি না, তা ভালোভাবে যাচাই করে একটি তালিকা তৈরি করে ফেলুন। পছন্দের খাবার রান্না করতে যেসব উপাদান লাগবে, তার সবকিছু ঠিকমতো আছে কি না—তাও নিশ্চিত করুন। এরপর সেই তালিকা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো কিনে নিন।

কোরবানির মাংসের বিভিন্ন পদ রান্নার জন্য আগেভাগেই মসলার ভান্ডার সমৃদ্ধ রাখুন। অত্যাবশ্যকীয় মসলা যেমন—কাবাব মসলা এবং আস্ত অথবা গুঁড়া গরম মসলা কিনে রেখে দিন।

হলুদ, মরিচ, তেজপাতা, গরম মসলা, গোলমরিচ, জায়ফল, শাহি জিরা, জয়ত্রি, পোস্তদানা, সয়া সস, তেল, টকদই এবং প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে রাখুন। গুঁড়া মসলাগুলো আলাদা আলাদা কৌটায় নাম লিখে গুছিয়ে রাখুন।

বিভিন্ন ধরনের মিক্স মসলা, যেমন—বিরিয়ানির মসলা বা চটপটির মসলা আগেই গুঁড়া করে আলাদা আলাদা কৌটায় রেখে দিন। গোটা গরম মসলা, যেমন—এলাচ, দারুচিনি, তেজপাতা প্রভৃতি সংগ্রহ করে পৃথক কৌটায় সংরক্ষণ করুন। তালিকা অনুযায়ী এসব মসলা বাজার থেকে কিনে ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে কৌটায় তুলে রাখুন।

ঈদের বেশ কয়েক দিন আগেই পোলাওয়ের চাল, মাংসের মসলা, টকদই, সেমাই ইত্যাদি শুকনা বাজার করে রাখুন।

বাসার পরিচ্ছন্নতার কথাও মাথায় রাখতে হবে। কোরবানি-পরবর্তী দিনগুলোয় বাসা পরিষ্কার এবং জীবাণুমুক্ত রাখতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্লিচিং পাউডারসহ পরিষ্কারক ও জীবাণুনাশক দ্রব্য কিনে রাখুন। একই সঙ্গে মাংস গরম করার জন্য মাইক্রোওভেনেরও প্রয়োজন হয়। প্রতিবছর কোরবানির আগে কেউ কেউ নতুন ফ্রিজ কেনেন, মাইক্রোওভেন কেনেন, কেউ আবার পুরোনো ফ্রিজ পরিষ্কার করেন।

নতুন ফ্রিজ কেনার ক্ষেত্রে

নতুন ফ্রিজ কেনার আগে কিছু বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। যেমন—ফ্রিজটি বিদ্যুৎসাশ্রয়ী কি না। বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্রিজগুলো সাধারণত মানেও ভালো হয়, তাই দামও তুলনামূলক বেশি হয়। তবে দাম বেশি হলেও এমন ফ্রিজ কেনাই উচিত। কারণ এতে বিদ্যুৎ বিল কম আসবে।

ফ্রিজের কম্প্রেশারের মান জেনে নিন। কারণ এর ওপর নির্ভর করে ফ্রিজটি কত ভালোভাবে কুলিং করতে পারবে।

ফ্রিজের আকারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী আকার বেছে নিন। প্রয়োজন না হলে শখের বশে বড় ফ্রিজ কেনার দরকার নেই। কারণ বড় ফ্রিজে বিদ্যুৎ বিলও বেশি আসে।

ফ্রিজের ধারণক্ষমতা সম্পর্কে জেনে নিন এবং আপনি ফ্রস্ট নাকি নন-ফ্রস্ট ফ্রিজ কিনতে চান, তা ভেবে নিন। ফ্রস্ট ফ্রিজে বরফ জমে, আর নন-ফ্রস্ট ফ্রিজে সাধারণত বরফ জমে না।

অবশ্যই ভালো কোনো ব্র্যান্ডের ফ্রিজ কিনবেন। এতে ঠকার সম্ভাবনা থাকবে না।

ঈদের আগে ফ্রিজ পরিষ্কার

ঈদ উপলক্ষে থাকে নানা ধরনের প্রস্তুতি। আর কোরবানির ঈদের আগে সর্বাগ্রে প্রয়োজন ফ্রিজ পরিষ্কার করার দিকে নজর দেওয়া। ঈদ ছাড়াও নিয়মিত ফ্রিজ পরিষ্কার করতে হয়, না হলে ফ্রিজের ভেতরে জীবাণু বাসা বাঁধতে পারে। সেখান থেকে নানা ধরনের অসুখ হতে পারে। কিছু কৌশল ব্যবহার করলে সহজে ও কম সময়ে ফ্রিজ পরিষ্কার করা যায়।

আগে গুছিয়ে রাখবেন যেসব কাজ

মাংস রাখার জন্য পর্যাপ্ত পলিথিন বা অন্যান্য সামগ্রীর জোগান রাখুন। পলিব্যাগও সংগ্রহ করে নিন। কোরবানির মাংস বণ্টনের জন্যও পলিব্যাগের প্রয়োজন হবে। মাংস সংরক্ষণের জন্য পলিব্যাগ, জিপলক ব্যাগ আগে থেকেই সংগ্রহ করে হাতের কাছে রাখুন। আত্মীয়স্বজন, গরিব-দুঃখীকে দেওয়ার পর ফ্রিজে মাংস সংরক্ষণ করা হবে। তাই ফ্রিজ যতটা সম্ভব খালি করে রাখতে হবে। আগের জমানো খাবারগুলো রান্না শেষ করে ফেলুন।

যেসব কাজ এগিয়ে রাখবেন

কোরবানির সময় মাংস রান্নার জন্য বড় পাতিলের প্রয়োজন হয়। এই পাতিলগুলো সারা বছর তেমন ব্যবহার না হওয়ায় অনেক সময় ময়লা হয়ে থাকতে পারে। তাই ঈদের আগেই সেগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখুন। আর নতুন কেনার প্রয়োজন হলে আগেই কিনে রাখুন।

রান্নার কাজে প্রয়োজনীয় সামগ্রী—ওভেন, রাইস কুকার, ব্লেন্ডার ও ফুড প্রসেসর—এসবও পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখুন। রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় হাঁড়িপাতিলগুলোও ভালোভাবে ধুয়ে-পরিষ্কার করে প্রস্তুত রাখুন।

মাংস কাটার জন্য ব্যবহৃত সরঞ্জাম যেমন—দা, বঁটি, ছুরি, কাঁচি, চপার বোর্ড—এসব আগেই পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখুন। এগুলোর ধার পরীক্ষা করে প্রয়োজনে আগে থেকেই ধার করিয়ে নিন, যাতে ঈদের দিন কোনো ধরনের ঝামেলা না হয়। এসব সরঞ্জাম বাচ্চাদের নাগালের বাইরে নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করুন।

তৈরি থাক মসলাপাতি

ঈদের দিনের অন্যতম অংশ হলো রান্না। কোরবানিতে মাংসের বিভিন্ন পদ তৈরি হয়, যার জন্য প্রয়োজন নানা ধরনের মসলাপাতি। রান্নার কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যায় যদি আগে থেকে কিছু প্রস্তুতি নেওয়া হয়। যেসব মসলা গুঁড়া করা দরকার, সেগুলো গুঁড়া করে আর যেগুলো বেটে রাখা দরকার, সেগুলো বেটে বা ব্লেন্ড করে আগেই প্রস্তুত করে রাখতে পারেন। এতে প্রয়োজনের সময় সব মসলা হাতের কাছে পাওয়া যাবে এবং রান্না অনেকটাই সহজ ও স্বস্তিদায়ক হবে।

ঈদের আগেই মাংসের জন্য পেঁয়াজ, রসুন কেটে রাখতে পারেন। আদা, পেঁয়াজ, রসুন, জিরা আগে থেকেই বেটে বা ব্লেন্ড করে নিন। তবে একসঙ্গে অনেক বাটা মসলা রাখলে পরে পরিমাণমতো ব্যবহার করা কঠিন হতে পারে। তাই ব্লেন্ড করা ভেজা মসলা ছোট ছোট বক্স বা আইস ট্রেতে রেখে বরফ করে নিন। এরপর সেগুলো জিপ-লক ব্যাগ বা পলিব্যাগে সংরক্ষণ করতে পারেন। এতে প্রয়োজনের সময় এক-দুটি কিউব দিয়েই সহজে রান্না করা যায়। গরম মসলাও কিনে আগেই হাতের কাছে রেখে দিন।

কোরবানির গোশত দিয়ে অনেকেই চালের আটার রুটি খেতে পছন্দ করেন। আবার অনেকে মাংস দিয়ে পিঠা তৈরি করে খেতেও ভালোবাসেন। সে ক্ষেত্রে আতপ চাল কিনে মেশিনে গুঁড়া করে নিন। এরপর প্যাকেট করে ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষণ করুন।

গরু বা খাসির পা দিয়ে নেহারি কিংবা স্যুপ খেতে অনেকেই পছন্দ করেন। তাই এসব তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মসলা যেমন—শাহি জিরা, পোস্তদানা, জায়ফল, জয়ত্রি ও সাদা গোলমরিচ সংগ্রহ করুন। স্যুপ বা নেহারি রান্নার সময় এসব মসলা পাটায় বেটে বা গুঁড়া করে শুধু মিশিয়ে দিলেই হবে।

আগেই ডিপ ফ্রিজ ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিন। আত্মীয়স্বজন, গরিব-দুঃখীকে মাংস বিতরণের পর আপনার অংশের মাংসগুলো অনায়াসেই ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে পারবেন।

জীবাণু দূর করতে সচেতনতা

মাংস ভাগবাটোয়ারা ও বিলি-বণ্টনের সময় হাত, শরীরের অন্যান্য অংশ, কাপড় ও ঘরের মেঝেতে রক্ত লেগে যেতে পারে। লাগলে যত দ্রুত সম্ভব সাবান দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করে ফেলুন। সহজে পরিষ্কার না হলে কুসুম-গরম পানি ও সাবান ব্যবহার করতে পারেন। পরিষ্কার করার পর ত্বক মুছে শুকনা করে নিন। চাইলে কাজ শুরুর আগে গ্লাভস পরে নেওয়া যেতে পারে। মেঝে পরিষ্কার করতে কুসুম গরম পানি ও জীবাণুনাশক ব্যবহার করুন। কাটাকাটির কাজ করুন সাবধানে। হাতের কাছেই রাখুন তুলা, ব্যান্ডেজ ও জীবাণুনাশক তরল বা ক্রিম।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা

কোরবানির সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। এ সময় কোরবানি করা পশুর রক্ত ও বর্জ্য জমে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে ছড়াতে পারে বিভিন্ন রোগজীবাণুও। তাই আগে থেকেই এসব বর্জ্য পরিষ্কারের ব্যবস্থা করে রাখুন। পশু জবাইয়ের পর যেন বর্জ্য জমে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন এবং সতর্ক থাকুন।

ভালো মসলা কীভাবে সংগ্রহ করবেন

মসলা শুধু খাবারের স্বাদই বৃদ্ধি করে না, এর রয়েছে পুষ্টিগুণও। তবে বাজারে ভেজাল মসলার ভিড়ে ভালো মসলা নির্বাচন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ভালো মসলা সংগ্রহের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।

প্রথমে প্যাকেজিং এবং লেবেলিং পরীক্ষা করে নিন। ভালো মসলার প্যাকেজিং সাধারণত মানসম্মত হয়। লেবেলে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ উল্লেখ করা থাকে। বিএসটিআই বা আইএসওর মতো কোনো সনদপত্রের অনুমোদন চিহ্নও দেওয়া থাকে। উপাদান তালিকা, গুণগত মান, কোম্পানির নাম, ঠিকানা প্রভৃতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে।

খাঁটি মসলার রঙ উজ্জ্বল হয়, তবে অতিরিক্ত নয়। আর মসলার গন্ধ হয় তীব্র এবং সুঘ্রাণময়।

চাইলে ল্যাব থেকেও পরীক্ষা করে নিতে পারেন।

ভালো মসলা কোথায় পাবেন

ভালো মসলা সংগ্রহের জন্য দুটি কাজ করতে পারেন। প্রথমত, অবশ্যই ভালো কোনো ব্র্যান্ডের মসলা কিনবেন। অন্যথায়, আপনার পরিচিত বা বিশ্বস্ত কেউ যদি বিক্রির জন্য হোমমেড মসলা তৈরি করে থাকেন, সেখান থেকেও সংগ্রহ করতে পারেন। এছাড়া জানাশোনা ও বিশ্বস্ত দোকান থেকেও মসলা কিনতে পারেন।

মসলার দাম

মসলা কেনার আগে মসলার বর্তমান বাজারমূল্য সম্পর্কে ধারণা থাকা ভালো। বাজারে বিভিন্ন ধরনের মসলা পাওয়া যায়। যেমন—লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি, তেজপাতা, গোলমরিচ, জয়ফল, জয়ত্রি, হলুদ গুঁড়া, মরিচ গুঁড়া, ধনে, আলুবোখারা ইত্যাদি। কারওয়ান বাজার কিচেন মার্কেট ঘুরে জানা যায়, কেজিপ্রতি সাদা গোলমরিচ ১৪০০ টাকা, গোলমরিচ ১৩০০, আলুবোখারা ১২০০, লবঙ্গ ১৬০০, এলাচ ৫৪০০, দারুচিনি ৫২০, তেজপাতা ৩০০, জয়ফল ১৭০০, জয়ত্রি ৩৪০০, জিরা ৬৮০, শাহি জিরা ১৮০০ এবং কিশমিশ ৮৬০ টাকা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...