আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

পূর্ণিমার আলোয় সেন্টমার্টিন

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

পূর্ণিমার আলোয় সেন্টমার্টিন

যখন-তখন মাথায় ভ্রমণের নেশা ওঠে; না যাওয়া অবধি মন থাকে পুরাই উতলা। হুটহাট সিদ্ধান্ত নিয়েই ছুটলাম সেন্টমার্টিন। লম্বা ছুটি থাকায় সেন্টমার্টিনগামী জাহাজের টিকিট নেই। তাতে কী! টেকনাফ থেকে ট্রলারে চেপে যাব। পৌঁছাতে পৌঁছাতে ততক্ষণে ভাটা হয়ে যাওয়ায় শেষ ট্রলারটাও মিস করছি। ট্রলার নেই তো কী হয়েছে, স্পিডবোটে যাব। কিন্তু কাহিনি ঝিরঝির। স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়া পর্যটক অ্যালাউ নয়। কী মুসিবত! মনে হচ্ছে যেন আমরাই বিতাড়িত রোহিঙ্গা। ঘাটে কিছুক্ষণ দহরম-মহরম হওয়ার পরে আমজাদ রফিকুল ইসলামের কারিশমায় স্পিডবোটে চড়তে সক্ষম হই। তবে যাচ্ছি চোর-চোর ভাব নিয়ে। ঠিকই কিছুক্ষণ পর কোস্ট গার্ড আটকে দিল। আমাদের হয়ে মাঝি মিথ্যা কথা বলল। আমরা শুধু তার কথায় সায় দিলাম। যেতে যেতে আরো দুবার জিজ্ঞাসাবাদ হলো। তখন আর মিথ্যা না বলে কিছুটা কৌশলী হলাম। প্রায় ঘণ্টাখানেক বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি পাড়ি দিয়ে সেন্টমার্টিন জেটি ঘাটে প্রায় ২০ বছরের মাথায় এসে পা ফেলি। শেষবার এসেছিলাম ২০০৪ সালে। পা ফেলতেই কেমন যেন একটা থমথমে ভাব। ভেতর থেকে তখনো আতঙ্ক কাটেনি—যদি জেটিঘাটের কোস্ট গার্ড ফেরত পাঠিয়ে দেন। বেশ একটা ভাব নিয়ে তাদের চৌকি পার হলাম। রাতে থাকব হলা বুনিয়ায়। তাই শুরুতেই মাছসহ প্রয়োজনীয় বাজারসদাই সেরে নিলাম। এবার বাইকে করে ছুটলাম দক্ষিণ পাড়া। পৌঁছেই আগেভাগে ঠিক করে রাখা পূর্ব সৈকতের কেয়া বন লাগোয়া সুবিধাজনক এক স্থানে তাঁবু টানিয়ে ফেলি। স্থানীয় জনৈক ভদ্রলোকের বউ পারভীনকে রান্নার দায়িত্ব দিয়ে চলে যাই তরমুজ ক্ষেতে। ঢাকা শহরে থেকে খাই তো আর কম না; তবে সরাসরি ক্ষেত থেকে তুলে খাওয়ার মজাই আলাদা, যা শিক্ষণীয় ভ্রমণের জন্য বাড়তি পাওনা।

মাগরিবের আজান হতেই নামাজ আদায়ের প্রস্তুতি নিই। নামাজ শেষে চোখ যায় আকাশে। ইয়া বড় ডাউস সাইজের পূর্ণিমার চাঁদ। এ রকম মায়াবী চাঁদ দেখে আনমনেই বিড়বিড় করে বলতে ইচ্ছা করবে—‘আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা।’ আহ নস্টালজিয়ায় হারিয়ে যাই। সময়ের স্রোতে রাত বাড়ে। জোছনার আলো সাগরের বুকে উথলিয়ে পড়ে। রাতেও চারদিক ফর্সা। দক্ষিণ পাড়ার সৈকতের বালিয়াড়িতে জোছনার আলোয় হেঁটে বেড়াই। মজার ব্যাপার হলো এই দক্ষিণ পাড়াটাই প্রথম বঙ্গোপসাগরের বুক ফুঁড়ে বর্তমান সেন্টমার্টিনের অস্তিত্ব জানান দিয়েছিল। আর আজ সেই স্থানেই তাঁবু গেড়ে আড্ডা জমিয়েছি। নানা খোশগল্প চলাকালেই অন্দরমহল থেকে ডাক আসে। আমরা বলি, ‘খাবার ঢেকে রেখে দাও, আজ না হয় ঠান্ডাই খাব।’ পূর্ণিমার আলো উপভোগ শেষে খাবার খেতে যাই। বুদ্ধি করে খাবার হটপটে রেখে দেওয়ায় উড়ুক্কু মাছের টেস্ট ছিল লা-জবাব। খেয়েদেয়ে তাঁবুতে ফিরি। সকালে ছেঁড়া দ্বীপ যাব, তাই চটজলদি শুয়ে পড়ি। প্রকৃতির চাপে ঘুম ভাঙে রাত ৪টার কিছু আগে-পরে। তাঁবুর জিপার খুলে মাথা বের করতেই আবিষ্কার করি ভিন্ন এক জগৎ। পূর্ণিমার আলো এতটাই প্রখর ছিল যে, সাগরে নোঙর করা দূরের ট্রলারগুলোও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। আহ কী যে সুন্দর লাগছিল, লিখে বোঝানো দায়। কোলাহলমুক্ত বিচে রাত গভীরে একাকী চাঁদের কিরণে, জোছনার আলোর সঙ্গে জুটি বেঁধে এক দারুণ সময় পার করে তাঁবুতে ঢুকি।

বিজ্ঞাপন

গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হওয়ার আগেই ফজর আজানের ধ্বনি। নামাজ পড়েই পায়ে হেঁটে ছেঁড়া দ্বীপের দিকে এগোই। কেয়া বনের পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকি। সাগর থেকে ভেসে আসা বিশুদ্ধ হাওয়ায় শরীর-মন জুড়ায়। সেন্টমার্টিনের অন্যতম আকর্ষণ সাগরের নীলাভ রঙের পানি, যা দেশের অন্য কোনো বিচ থেকে তেমন দেখা মেলে না। বালিয়াড়িতে হাঁটতে হাঁটতে ক্ষুধা পেলে বিচে থাকা এক ছালাদিয়া (অস্থায়ী) রেস্টুরেন্টে গরম গরম খিচুড়ি দিয়ে নাশতা সেরে নিই। এরপর আবারও ছুটে চলা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবার চোখে পড়ে মোটরবাইক ও অটোয় চড়ে বানের জলের মতো ধেয়ে আসা পর্যটকদের ঢেউ। ততক্ষণে আমরা ছেঁড়া দ্বীপে ঢুকে যাই। ও মোর খোদা! এখানে তো দেখছি রীতিমতো বাজার মিলে গেছে। বিক্রেতারা নানা খাদ্যপণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে আছে। আহ ২০ বছর আগে-পরের ছেঁড়া দ্বীপের চিত্র এখন পুরাই আকাশ-পাতাল। যেতে যেতে দক্ষিণের শেষ প্রান্তরে; যেখানটায় দাঁড়িয়েছিলাম তার পরে আর কোনো মাটি নেই, শুধু পানি আর পানি। উত্তাল সাগরের নোনা জলের আছড়ে পড়া ঢেউ শরীর ভিজিয়ে দেয়। তখন গলা ছেড়ে আকাশপানে তাকিয়ে বলতে ইচ্ছা করবে—‘জীবনের মানে শুধু জীবিকার জন্য রাতদিন ব্যস্ত থাকা নয়; জীবনের মানে হলো হুটহাট প্রকৃতির সান্নিধ্যে ছুটে চলা, নিজেকে সময় দেওয়া। বুকভরা নিঃশ্বাস নিয়ে জীবনকে উপভোগ করার নামই হলো প্রশান্তির যাপিত জীবন।’

sen

দেশে থাকা বেশ কিছু দ্বীপের মধ্যে সেন্টমার্টিন দ্বীপটিরও রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। গোড়ার দিকে এর নাম ছিল নারিকেল জিঞ্জিরা। পরবর্তী সময়ে ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯৩ সালে এর নাম রাখেন সেন্টমার্টিন। আমেরিন্ডিয়ানরা শুরুর দিকে সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা ছিল। পরে ইউরোপীয়রা ব্যবসা করতে এসে তাদেরই নিজেদের দাসে পরিণত করে নেয়। ব্যাপারটা আজকের প্রজন্ম অনেকেই হয়তো জানে না। সেন্টমার্টিন দ্বীপটি নিয়ে একদা ফরাসি, ডাচ ও স্পেন দ্বারা দখল-পাল্টা দখলের খেলাও চলত। দ্বীপটির বয়স প্রায় ৩ হাজার ৫০৫ বছর। এরও আগে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে এটি টেকনাফের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ছিল। পরবর্তী সময়ে সাগরগর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের নয়নাভিরাম দ্বীপটির আরো অনেক ইতিহাস রয়েছে, যা ভ্রমণগল্পের লিখনীতে তুলে ধরা সম্ভব নয়। সেন্টমার্টিনে বর্তমানে প্রায় দেড় লাখ নারিকেল গাছ রয়েছে, যা দ্বীপটিকে করেছে আরো বেশি দৃষ্টিনন্দন। রোদের প্রখরতা চেতিয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও ছেঁড়া দ্বীপ থেকে সটকে পড়তে শুরু করি। ছেঁড়া দ্বীপ নামকরণের রহস্য না জানালেই নয়; জোয়ারের সময় সেন্টমার্টিনের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বলেই এর নাম ছেঁড়া দ্বীপ।

ফিরছিও হেঁটে, তবে এবার পশ্চিম পাশ দিয়ে। হাঁটতে হাঁটতে হলা বুনিয়া তাঁবুর ধারে। গাছ থেকে ডাব নামাই, টাটকা তরমুজ খাই আর হ্যামোকে দুলে তপ্ত দুপুর পার করে বিকাল বেলা বিচ দিয়ে হেঁটেই উত্তর পাড়া যাই। দক্ষিণ পাড়া জেগে ওঠারও প্রায় ১০০ বছর পরে উত্তর পাড়া জেগে উঠেছিল। এই পাশটায় এসে মনটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল প্রচুর মৃত কচ্ছপ দেখতে পেয়ে। এর কারণ খোঁজতে গিয়ে জানা যায়, দ্বীপটিতে প্রচুর কুকুর বেড়ে যাওয়ায় কচ্ছপের ওপর আক্রমণের মাত্রাও বেড়ে গেছে। বিচে সাইক্লিং ও বাজার ঘুরে বোল কোরাল মাছ কিনে ভ্যানে চড়ে অস্থায়ী নিবাসে ছুটলাম। পথে দেখা হলো জালাল ভাই, জিয়া ভাই ও বাতেন ভাইয়ের সঙ্গে। রাজধানী ছেড়ে দূরে বহু দূরে তারা এখানে আছেন পর্যটকদের সেবক হিসেবে। খানিকটা সময় তাদের সঙ্গে চলল কফি আড্ডা। তাঁবুতে ফিরে শুরু হলো ক্যাম্প ফায়ার ও বারবিকিউ। ডিনার শেষে ঘুমের প্রস্তুতি।

sen1

এক ঘুমেই সুবহে সাদিক। দ্রুত সাফসুতর হয়ে পশ্চিম দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। বিচ-লাগোয়া পুচকাটা বুনিয়া গ্রামের এক মসজিদে জামাতে ফজরের নামাজ আদায় করেই দক্ষিণে হাঁটা শুরু করি। হাঁটি আর প্রকৃতির আপন রঙ্গলীলার সঙ্গে পরিচিত হতে থাকি। চরম গরমেও হুট করেই মাঘের কুয়াশায় ঢেকে যায় চারপাশ। কুয়াশার চাদর ভেদ করেই হেঁটে হেঁটে প্রবালের প্রান্তরে। ভাটা থাকায় যতদূর চোখ যায় শুধু প্রবাল আর প্রবাল। আট কিলোমিটার দীর্ঘ সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। এদের প্রাণ থাকলেও সাগরতলে পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় কোনো দৃঢ় তলের ওপর গেড়ে বসে বাকি জীবন পার করে দেয় নিশ্চল হয়েই। পর্যটকদের বেশ কিছু পছন্দের তালিকায় প্রবাল অন্যতম, যা সেন্টমার্টিন ভ্রমণে দেশি-বিদেশি ভ্রমণপিপাসুদের আকৃষ্ট করে থাকে। লক্ষ কোটি প্রবালের সারি সারি পাথুরে আকৃতির স্তূপ দেখার মধ্য দিয়ে সেন্টমার্টিন ভ্রমণের ইতি টানি।

যাবেন কীভাবে : দেশের যেকোনো স্থান থেকে বাসে বা ট্রেনে প্রথমে কক্সবাজার/টেকনাফ। সেখান থেকে ট্রলার, স্পিডবোট কিংবা জাহাজে সেন্টমার্টিন।

থাকা-খাওয়া : প্রচুর হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। ভাড়া যার যেমন সাধ্য অনুযায়ী মেলাতে পারবেন। খাবার হোটেলও রয়েছে অনেক।

ছবির ছৈয়াল : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন