আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সাক্ষাৎকার

‘দুর্বল জায়গাগুলোতে বেশি এফোর্ট দিতাম’

ওমর শাহেদ

‘দুর্বল জায়গাগুলোতে বেশি এফোর্ট দিতাম’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের কারুশিল্প বিভাগে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছেন মুমতাহিনা বিনতে সুলতান।

বিজ্ঞাপন

আপনার ফলাফল কেমন? এত ভালো ফলের রহস্য কী?

আমার মাস্টার্সে সিজিপিএ ছিল ৩.৫৬, অনার্সে সিজিপিএ ছিল ৩.৮৯। এটিই আমাদের সর্বোচ্চ ফলাফল এবং বিগত বছরগুলোর তুলনায় সর্বোচ্চ রেজাল্ট কারুশিল্প বিভাগে। এই ভালো ফলাফলের রহস্য হলো আমার কঠোর পরিশ্রম এবং প্রতিদিন কাজের প্রতি একনিষ্ঠ শ্রম। আমার মনে হয়, পরীক্ষার আগে প্রস্তুতি নেওয়া এক দিনে কখনোই সম্ভব নয়। চেষ্টা করতাম ক্লাসের পড়া ক্লাসেই সম্পন্ন করে রাখতে। প্রতিদিন একটু একটু করে পড়ালেখায় আরো ভালো করার চেষ্টা করেছি, যার ফলে আমার পরীক্ষার আগের রাতে খুব বেশি একটা কষ্ট হতো না কখনো।

পড়ালেখা কীভাবে করতেন?

আমাদের একাডেমিক ক্লাসগুলো থাকে সকাল ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত। চেষ্টা করতাম সেখানেই আমার পড়াটি সম্পন্ন করে ফেলার জন্য। ভালো ফলাফলের রহস্য হলো—অনেকে আছে খুব ভালো মেধা নিয়ে জন্মায়। আবার কারো একটু সময় লাগে পড়াটি ভালোভাবে আয়ত্ত করতে। আমার ক্ষেত্রে আমি বলব, ছোটবেলায়ই বুঝতে পেরেছিলাম আমি একটু স্লো লার্নার। পড়াটি পারি, কিন্তু সেটি আয়ত্ত করতে বা ধরে রাখতে বেশ সময় লাগে। সেক্ষেত্রে অন্যদের হয়তো একটি পড়া শেষ করতে দুঘণ্টা লাগবে। আর আমার দুদিন লাগতে পারে। সেই অনুযায়ী পড়ার গতিটাকে ধরে রাখতাম।

খাতায় কীভাবে লিখতেন?

খাতায় সবসময় চেষ্টা করতাম ক্লাসে স্যাররা যে পয়েন্টগুলো বলতেন, সে অনুযায়ী পয়েন্ট টু পয়েন্ট উল্লেখ করে দেওয়া। এ সময় কিছু জিনিস হাইলাইটিং করে এরপর হয়তো ভেতরে ওটার বিশ্লেষণটা লিখতাম। সেক্ষেত্রে এমনও হয়েছে অনেক সময় পয়েন্টটি বোঝানোর জন্য বিভিন্ন রকমের গ্রাফ কিংবা ছবিরও ব্যবহার করতাম, যাতে মনের বিষয়গুলো সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি।

প্র্যাকটিক্যালের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিতেন?

প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার আগে আমাদের দেখা যায়, একটা লেআউট করতে হয় বা চিন্তার একটি জায়গা রয়েছে। প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় কিছু কাজ সাত দিনের, কিছু কাজ ১০ দিনের থাকে। কিন্তু এই ১০ দিনের যে কাজ, সে কাজের চিন্তাটি আমাদের অনেক আগে শুরু করতে হয়। দেখা যায়, আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে আইডিয়াগুলো ব্রাউজ করি, বিভিন্ন রকমের টেক্সট বইগুলোকে ঘাঁটি যে কীভাবে আমাদের কাজগুলো থিমের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে আরো সমৃদ্ধ করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে বুক ওয়ার্কস প্রচুর করতে হতো।

সাধারণ দিনগুলোয় কীভাবে লেখাপড়া করতেন?

সাধারণ দিনগুলো আমার কাছে খুব অসাধারণই ছিল বটে। সবসময় দেখা গেছে প্রত্যেকটা টাইমই আলাদা করে রাখতাম। কিছু সময় রাখতাম আড্ডার জন্য, কিছু সময় রাখতাম নিজেকে এক্সপ্লোর করার জন্য, কিছু সময় রাখতাম একাডেমিক পড়ালেখার জন্য, কিছু সময় রাখতাম প্র্যাকটিক্যালের জন্য। সেজন্য দেখা গেছে, প্রতিদিন ২০ মিনিট করে হলেও সময় দিতে পারতাম। যাতে শেষ মুহূর্তে আমার প্রস্তুতিতে কোনো হ্যাম্পার না হয়, সেদিকে মনোযোগ দিতাম।

যেসব বিষয় ভালোভাবে পারতেন না, সেগুলোয় কীভাবে প্রস্তুতি নিতেন?

আমার কাছে মনে হয়, কখনো একটি মানুষ সবদিকে এক্সপার্ট হতে পারে না। সেক্ষেত্রে আমারও অনেক দুর্বলতার জায়গা রয়েছে। যে জায়গাগুলোয় বুঝতাম যে এখানে পারছি না, সেখানে আরো বেশি সময় ও এফোর্ট দিতে হতো নির্দ্বিধায়। যেমন স্ক্রিন প্রিন্টের কাজগুলো ও রঙের কাজগুলো ভালো লাগত, কিন্তু স্ক্রিন প্রিন্টের বিভিন্ন প্রসেস রয়েছে। কেমিক্যালের রেশিওতে যদি সমস্যা হয়, সেক্ষেত্রে প্রচুর পরীক্ষা করতাম—কাজগুলো খারাপ হচ্ছে কীভাবে? ওই রেশিওগুলো ঠিক রেখে কাজটাকে ভালো করতে পারি কি না, সে চেষ্টা করতাম, সে জায়গায় সবসময় মনোযোগ থাকত। যে জায়গাটি খারাপ হবে, সে জায়গায় সবসময় সবচেয়ে বেশি এফোর্ট দিতাম যেন ওটাতেই সবচেয়ে ভালো করতে পারি।

এই নম্বরগুলো তুলতে কষ্ট হয়েছে কেমন?

নম্বরগুলো তুলতে কষ্ট হয়েছে বটেই; কিন্তু কখনো নম্বরের জন্য কাজ করিনি। কাজের প্রতি আগ্রহের একটি জায়গা সবসময় ছিল। সবসময় চেষ্টা করেছি সেই আগ্রহের জায়গা থেকেই নিজের সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার, বাকিটা হচ্ছে আল্লাহ আমার প্রতি খুব সহায় ছিলেন। এটা বলাই শ্রেয়। যখন দেখা গেছে, দিনশেষে আমার মনমতো একটি কাজ দাঁড় করিয়েছি এবং ওটার জন্য ভালো নম্বর পেয়েছি—তার থেকেও বড় কথা, শিক্ষকরা এসে যখন ‘বাহ্‌!’ এই যে একটি ছোট ওয়ার্ড বলছেন, সেটা আমার কাছে দারুণ একটি অনুপ্রেরণার জায়গা ছিল। এ কারণে মনে হয়েছে, তাদের সেই মূল্যায়নে আরো ভালো কিছু করেছি। নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি সবসময়।

চারুকলার লেখাপড়া কেমন ছিল?

২০১৭-১৮ সেশনে ছিলাম। ২০১৭ সালের শেষের দিকে ভর্তি হয়েছিলাম। লেখাপড়ার ক্ষেত্রে আমার মনে হয়েছে, ওই গৎবাঁধা থেকে অনেকাংশেই বাইরে। আমার ডিপার্টমেন্টের কথা যদি বলি, এখানে অনেক নতুন কাজ এক্সপ্লোর করার সুযোগ পেয়েছি। অনেক নতুন বিষয় সম্পর্কে জানতে পেরেছি। অন্য কোথাও থাকলে হয়তো এই সুযোগটি হতো না। প্রতিটা বছরেই নতুন নতুন টপিক শিখেছি, নতুন বিষয় সম্পর্কে অবগত হয়েছি। আমাদের দেশের সংস্কৃতি বা বিশ্বের অন্যান্য দেশের আর্ট সম্পর্কে জানতে পেরেছি। এখানে একটি পার্ট ছিল তত্ত্বীয়, যেখানে আমরা সমসাময়িক শিল্পধারা অধ্যয়ন করতাম। আমাদের দেশে কী রকম শিল্পচর্চা হচ্ছে, সেইসঙ্গে তাল মিলিয়ে ইউরোপ বা অন্যান্য দেশে কীভাবে আর্টচর্চাটি হয়েছে—সেসব বিষয়ে এখানে পড়ালেখার কারণে শিল্পকে বিশ্লেষণ করার মনোভাব তৈরি হয়েছে। প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসগুলো ছিল পাঁচ বছরের, প্রতিটি ইয়ারে বিষয়গুলো ভাগ করা। ফার্স্ট ইয়ারে আমরা যে কাজটি করতাম, তা ছিল কলম বা পেন্সিল দিয়ে স্কেচ করা, বা ল্যান্ডস্কেপ; তারপর স্টিল লাইফের কাজ।

তারপর ছিল কাগজের কাজ, ব্লকের কাজ, টাইডাইয়ের কাজ। সেকেন্ড ইয়ারে উঠে আরেকটু অ্যাডভান্সড লেভেলে গিয়ে করেছিলাম অ্যাক্রেলিকের কাজ, কিংবা মেটালের কাজ। এরপর ফোর্থ ইয়ারে ট্যাপেস্ট্রি বা কাঠের কাজ ছিল, যেজন্য দেখা গেছে একটি ক্লাস ভালো না হলে পরের ক্লাসে আমাদের ভালো করার সুযোগ ছিল। প্রতিটি ক্লাসের গড় করে মার্কিং করা হতো।

এই রেজাল্ট করতে কষ্ট হয়েছে কেমন?

কষ্ট হয়েছে বটেই, যেহেতু প্র্যাকটিক্যালগুলো অনেক সময়সাপেক্ষ বা অনেক শ্রমলব্ধ কাজ ছিল, কিন্তু দিনশেষে কাজটি দেখে সবাই প্রশংসা করেছে। যে কাজটি চিন্তা করছিলাম সেই কাজটি দাঁড় করাতে পেরেছি, সেক্ষেত্রে আনন্দের জায়গাটি অকল্পনীয়ই বটে। এ কারণে দেখা গেছে আমরা সাত দিন বা ১৪ দিনের ধারাবাহিক কষ্টের কাজ করার পর আমাদের সেই কষ্টটি আর লাগেনি। দিন শেষে এত আমরা ধরে ধরে কাজগুলো করতাম, মনে হতো কাজগুলো আমাদের বাচ্চা। মনে হতো সন্তানের মতো বা খুবই কাছের। প্রচুর যত্ন করে, প্রচুর ভালোবেসে কাজগুলো করা। একটু যদি অন্যমনস্ক হই, তাহলে কাজটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। প্রচুর সাবধানে ধরে ধরে কাজগুলো করতে হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন