ত্যাগের মহিমায় শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা

আমানুর রহমান

ত্যাগের মহিমায় শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা

পবিত্র ঈদুল আজহা শুধু উৎসব নয়, ত্যাগ ও দায়িত্ববোধের এক মহান শিক্ষা। এবারের ঈদে তরুণ শিক্ষার্থীদের ভাবনায় মিশে আছে পারিবারিক সৌহার্দ্য, সামাজিক দায়বদ্ধতা, প্রাণিপ্রেম ও পরিবেশ সচেতনতা। ত্যাগের মহিমায় ঈদুল আজহাকে অর্থবহ করে তোলার চমৎকার এই পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরেছেন শিক্ষার্থীরা।

​সুশৃঙ্খল প্রস্তুতিতে অনাবিল উৎসবের প্রত্যাশা

বিজ্ঞাপন

​ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব হলেও এটি কেবল আনন্দ উদ্‌যাপন নয়; বরং আত্মত্যাগ, নিঃশর্ত আনুগত্য ও স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের এক অনন্য উপায়। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর চরম ত্যাগের সুমহান আদর্শ এই দিনটির কেন্দ্রে প্রোথিত। ইসলাম শেখায়, আল্লাহর দরবারে কোরবানির পশুর রক্ত বা মাংস পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় আমাদের অন্তরের নিগূঢ় তাকওয়া।

পবিত্র এই দিনটিকে ঘিরে আমাদের থাকে নানা সুপরিকল্পিত আয়োজন ও প্রত্যাশা। এবারের ঈদ উদ্‌যাপনের মূল পরিকল্পনায় রয়েছে ত্যাগের শিক্ষাকে ধারণ করে পরিবারের সান্নিধ্যে নিবিড় সময় কাটানো। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় মানুষের দোরগোড়ায় কোরবানির মাংস পৌঁছে দেওয়ার দৃঢ় ইচ্ছা রয়েছে। একটি সুশৃঙ্খল পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সঠিক সময়ে পশু ক্রয়, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে কোরবানি সম্পন্ন করা এবং আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের মাঝে সুষমভাবে মাংস বণ্টন নিশ্চিত করতে চাই। পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত এবারের ঈদ সবার জন্য অনাবিল আনন্দ, শান্তি ও সার্থকতা বয়ে আনুক।

তানজিলা আক্তার তানু, শিক্ষার্থী, সরকারি আদমজীনগর এম ডব্লিউ কলেজ, নারায়ণগঞ্জ

পরিবারের বড় মেয়ের ঈদ ভাবনা

​ঈদুল আজহা মানেই ত্যাগের মহিমা আর নাড়ির টানে নীড়ে ফেরার আকুলতা। একজন শিক্ষার্থী এবং পরিবারের বড় মেয়ে হওয়ায় আমার কাছে ঈদের আনন্দ দায়িত্ব ও সৌহার্দ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। উৎসবের দিন ভোর থেকে শুরু হবে আমার ব্যস্ততা। মায়ের সহায়ক হয়ে ঘর গোছানো, রান্নার কাজে সাহায্য করা, আর কোরবানির তদারকিতে বাবাকে সহযোগিতা করার মধ্য দিয়েই দিনটি শুরু হবে।

সচরাচর রন্ধনশালায় যাওয়া না হলেও বড় মেয়ে হিসেবে ঈদের দিনে ঐতিহ্যবাহী মাংসের পদ ও ঝাল রেজালা রান্না করা আমার বিশেষ শখ। পরম মমতায় রান্না করা সেই পদগুলো বাবা-চাচাকে খাওয়াব। তৃপ্তিসহ খাওয়ার পর তাদের মুখে প্রশংসা শোনাই হবে আমার শ্রেষ্ঠ ঈদ উপহার। এরপর মাংস বণ্টন এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ঘরে তা পৌঁছে দেওয়ার মানবিক দায়িত্বটুকু নিজেই তদারকি করব। অনুজদের সালামি বিতরণ আর আনন্দঘন সেলফি তো থাকবেই। বিকালে সবার সঙ্গে মচমচে নকশি পিঠা তৈরির পর্ব তো আছেই। পড়াশোনার ক্লান্তি ভুলে মায়ের হাতের ছোঁয়া, বাবার সঙ্গে মধুর খুনশুটি আর স্বজনদের আড্ডায় মোড়ানো এই ঘরোয়া পরিকল্পনাগুলোই আমার ঈদকে করে তুলবে সার্থক ও স্মৃতিময়।

মাহজাবীন তাসনীম রুহী, শিক্ষার্থী, এমসি কলেজ, সিলেট

​ক্লান্তি মুছে স্বস্তির ঈদের ইচ্ছেমালা

​চলমান পরীক্ষার চাপ আর ব্যস্ততার মাঝেই এবারের ঈদুল আজহার ছুটি আমার জন্য নিয়ে এসেছে দারুণ এক স্বস্তির খবর। ঈদে বাড়ি ফিরে তাই কিছুদিন পুরোপুরি বিশ্রামে কাটানোর ইচ্ছে আছে। সবচেয়ে বেশি মুখিয়ে আছি আমার আদরের বিড়ালগুলোর জন্য; অনেক দিন পর ওদের সঙ্গে অনেকটা সময় কাটাব। পরিবারের সঙ্গে আড্ডার পাশাপাশি বিকালে হয়তো অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় খালামণির ডাকে অটোতে চেপে আশপাশের এলাকায় বেরিয়ে পড়ব। জীবনের প্রয়োজনে দূরে চলে যাওয়া বন্ধুদের সঙ্গেও এবার দেখা করার প্রবল ইচ্ছে রয়েছে।

আগে ঈদের দিন আমাদের এলাকায় চমৎকার জাঁকজমকপূর্ণ মেলা বসত, যা দুঃখজনকভাবে এখন আর হয় না। তাই এবারের আনন্দটা খুঁজে নেব ছিমছাম কিছু আয়োজনে। আশপাশে কিছুটা ঘোরাঘুরি, প্রিয় বই পড়া আর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় ও মজার খুনশুটিতেই কাটবে সময়। তবে এবারের ঈদের সবচেয়ে সুন্দর পরিকল্পনাটি হলো—প্রিয় কয়েকজন অ্যানিমেল অ্যাক্টিভিস্টকে ভালোবেসে সালামি পাঠানো। সব মিলিয়ে আপনজন, প্রশান্তি ও প্রাণিপ্রেমেই কাটুক আমার এবারের ঈদ।

—শামা মেহজাবিন, শিক্ষার্থী, রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী

​পরিকল্পিত পদক্ষেপে অর্থবহ ঈদ

​বছর ঘুরে আমাদের দুয়ারে আবারও কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আজহা। আত্মত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের এই মহিমান্বিত উৎসবকে সত্যিকার অর্থে অর্থবহ ও সর্বজনীন করতে আমি কিছু বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। প্রথমত, ঈদের কেনাকাটায় অযথা অপচয় ও লোকদেখানো প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি পরিহার করে সাধারণভাবে উৎসব উদ্‌যাপন করাই লক্ষ্য। দ্বিতীয়ত, পরিবেশ সুরক্ষার তাগিদে কোরবানির পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার আগাম ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতি সচেতন দৃষ্টি আকর্ষণ করব, যেন দুর্গন্ধ বা দূষণ উৎসবের নির্মল আনন্দকে ম্লান করতে না পারে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বিকাশ, নগদ কিংবা রকেটের মতো ডিজিটাল মাধ্যমে কোরবানির অর্থ ও জাকাত অত্যন্ত সহজে এবং নিরাপদে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব।

ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা হলো ত্যাগ, সহমর্মিতা ও মানবতা। এই মানবিক গুণগুলো প্রাত্যহিক জীবনে প্রতিফলিত করে সম্মিলিত উদ্যোগে এই উৎসবকে আমরা প্রকৃত অর্থেই কল্যাণময় ও সর্বজনীন করে তোলার চেষ্টা করব।

—সোমনা আক্তার, শিক্ষার্থী, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ, মৌলভীবাজার

ফিচার লেখক : শিক্ষার্থী, স্নাতক, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা

amanurrahman.world@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন