স্বপ্নের ক্যারিয়ার

চিকিৎসকদের বিসিএস প্রস্তুতির কৌশল

চিকিৎসকদের বিসিএস প্রস্তুতির কৌশল

মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর একজন শিক্ষার্থীর চোখে থাকে চিকিৎসক হিসেবে সফল ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন। কিন্তু এমবিবিএসের দীর্ঘ ও কঠিন পথ পাড়ি দেওয়ার পরই শুরু হয় আরেক নতুন লড়াই—পোস্টগ্র্যাজুয়েশন, চাকরি, ব্যক্তিগত প্র্যাকটিস কিংবা সরকারি চাকরিতে প্রবেশের প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার তরুণ চিকিৎসকদের কাছে অন্যতম স্বপ্ন বা কাঙ্ক্ষিত ক্যারিয়ার। স্থায়ী চাকরির নিশ্চয়তা, নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো, উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং মানুষের সেবা করার সুযোগ—সব মিলিয়ে সরকারি চাকরির প্রতি চিকিৎসকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। তবে এই পথও সহজ নয়। মেডিকেল পড়াশোনার পাশাপাশি বিসিএসের বিশাল সাধারণ সিলেবাস আয়ত্ত করতে হয়। ফলে একজন চিকিৎসকের বিসিএস প্রস্তুতি হয়ে ওঠে সময়, ধৈর্য ও মানসিক দৃঢ়তার কঠিন পরীক্ষা।

স্বপ্নিল ক্যারিয়ার বনাম বাস্তবতা

বিজ্ঞাপন

সোনালি ক্যারিয়ারের স্বপ্ন নিয়ে একেকজন মেধাবী মুখ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু মেডিকেল কলেজের দুর্গম সীমানা পাড়ি দেওয়ার পর তাদের সামনে ক্যারিয়ারের যে পথগুলো উন্মোচিত হয়, সেগুলো আরো দুর্গম ও দীর্ঘ। কেউ বেছে নেন পোস্টগ্রাজুয়েশনের কঠিন লড়াই, কেউ ছোটেন বেসরকারি হাসপাতালে চাকরির দিকে, আবার কেউ মনোযোগ দিতে চান নিজস্ব প্র্যাকটিসে। তবে নবীন চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ যোগ দিতে চান বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে।

সরকারি চাকরিতে চিকিৎসকদের চাহিদা

সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, বর্তমানে সারা দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসকদের জন্য মোট অনুমোদিত পদের সংখ্যা প্রায় ৪১ হাজার, অথচ মাঠপর্যায়ে বর্তমানে কর্মরত আছেন প্রায় ৩০ হাজার চিকিৎসক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী যেখানে ৪১ হাজার চিকিৎসকও যথেষ্ট নয়, সেখানে এর মধ্যেও প্রায় ১১ হাজার পদ শূন্য অবস্থায় আছে! এই বিশাল ঘাটতি জনগণের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায় এবং একই সঙ্গে তরুণ চিকিৎসকদের জন্য সরকারি চাকরি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের ঘোষণাও দিয়েছেন।

ডাক্তাররা বিসিএস বেছে নিচ্ছেন কেন

১. আমাদের বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে কোনো সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নেই। ফলে স্বাভাবিকভাবেই নবীন চিকিৎসকরা বেতনবৈষম্যের শিকার হন। বিপরীতে ক্যাডার সার্ভিসে সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো আছে এবং বেসরকারি খাতের তুলনায় স্থায়ী চাকরির নিশ্চয়তা আছে।

২. বাংলাদেশে ক্যাডার সার্ভিসের সামাজিক মর্যাদা যথেষ্ট।

৩. প্রশাসনিক পদগুলোয় সরকারের নীতিনির্ধারণে অংশ নেওয়ার এবং সেই নীতিগুলো বাস্তবায়ন করার সুযোগ আছে।

৪. উচ্চশিক্ষার কিছু ক্ষেত্রে (যেমন রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম, ডিপ্লোমা-এমফিল, এমপিএইচ প্রভৃতি) বিসিএস ক্যাডারদের জন্য আলাদা কোটার ব্যবস্থা আছে। উচ্চশিক্ষার জন্য নির্ধারিত বর্তমান ডেপুটেশন পলিসিও চিকিৎসকদের আকৃষ্ট করছে।

৫. নিজের ক্যারিয়ার গড়ার পাশাপাশি জনসাধারণের সেবা করার অপূর্ব সমন্বয়ের সুযোগ আছে।

সাধারণ বনাম বিশেষ বিসিএস

চিকিৎসকরা দু’ধরনের বিসিএসে অংশগ্রহণ করতে পারেন—সাধারণ ও বিশেষ বিসিএস। সাধারণ বিসিএসে প্রশাসন বা পুলিশ ক্যাডারের মতো সাধারণ প্রার্থীদের সঙ্গে চিকিৎসকদেরও সমান তালে লড়তে হয়। এক্ষেত্রে প্রথমে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। সব পরীক্ষা শেষে মেধাতালিকায় থাকা চিকিৎসকরা নিয়োগের জন্যে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। বিশেষ বিসিএসে লিখিত পরীক্ষা থাকে না, প্রিলিমিনারি ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে ক্যাডার নিয়োগ দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় সাধারণ সিলেবাসের পাশাপাশি মেডিকেলের প্রয়োজনীয় সিলেবাসও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

স্পেশাল বিসিএসে রণজয়ের কিছু কৌশল

১. সিলেবাস ও প্রশ্নব্যাংক অ্যানালাইসিস করে গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো চিহ্নিত করুন। মনে রাখবেন, স্বল্প সময়ে সব পড়তে গেলে এক্সামে লাড্ডু পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি!

২. সিলেবাসের জেনারেল অংশে যথেষ্ট জোর দিন। মেডিকেল সায়েন্সে অনেকের প্রাপ্ত নাম্বার কাছাকাছি থাকে, ফলে জেনারেল অংশ আপনাকে অনেকখানি এগিয়ে দিতে পারে।

৩. সিলেবাসে নিজের দুর্বলতা ও শক্তিমত্তার জায়গাগুলো চিহ্নিত করুন এবং সে হিসেবে পরিকল্পনা সাজান।

৪. রুটিনমাফিক পড়ুন। বিসিএসের ক্ষেত্রে পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জরুরি।

৫. সময়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা প্রয়োজন। সোশ্যাল মিডিয়ায় কিংবা নেট ব্রাউজিংয়ে সময় কম ব্যয় করুন। ডিউটির ফাঁকে ফাঁকে বা যাতায়াতের সময় প্রশ্নব্যাংক সল্‌ভ করতে পারেন।

৬. মক টেস্ট দিন। পরীক্ষায় টাইম ম্যানেজমেন্টে দক্ষতা বাড়াতে এবং নেগেটিভ মার্কিংয়ের হার কমিয়ে আনতে মক টেস্টের জুড়ি নেই।

শেষকথা

একজন সাধারণ গ্র্যাজুয়েটের চেয়ে একজন মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটের বিসিএস যাত্রা অনেক বেশি মানসিক চাপের। একদিকে প্রফেশনাল ক্যারিয়ারের তাগিদ, অন্যদিকে নন-মেডিকেল সিলেবাসের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার লড়াই। কিন্তু যারা ধৈর্য ধরে এই দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় টিকে থাকেন, দিনশেষে শেষ হাসি তারাই হাসেন।

এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), এমডি (সাইকিয়াট্রি)

সহকারী রেজিস্ট্রার, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন