আজকে কলম চালাতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ল লাতিন ভাষার মহান কবি ওভিডের ‘মেটামরফোসিস’ মহাকাব্যের একটা গল্প। গল্পে দেখানো হয়Ñরাজা মিডাস দেবতার কাছে চাইলেন এক বর, যা স্পর্শ করবেন, তা-ই হয়ে যাবে সোনা। বর পেয়ে তিনি আনন্দিত। কিন্তু যখন তার মেয়ে এসে জড়িয়ে ধরল, সে মুহূর্তেই মেয়ে পরিণত হলো নিষ্প্রাণ সোনার মূর্তিতে। যে আশীর্বাদ চেয়েছিলেন, তা-ই হয়ে গেল তার সবচেয়ে বড় অভিশাপ—রাজা রইলেন অভুক্ত, নিঃসঙ্গ, নিজের লোভের কারাগারে বন্দি।
সীমাহীনপ্রাপ্তির লোভ শেষে মানুষকে করে তোলে সবচেয়ে দরিদ্র। আজ! বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে এই পুরাণ যেন অস্বাভাবিক রকমের প্রাসঙ্গিক মনে হয়। ক্ষমতাও একধরনের পরশপাথর-যিনি দীর্ঘদিন তার অধিকারী থাকেন, তার কাছে মনে হয় তিনি যা স্পর্শ করছেন তা-ই যেন ন্যায্য, যা তিনি বলছেন তা-ই যেন সত্য। সব প্রতিষ্ঠান তার সুহবতে ‘সোনা’ হয়ে ওঠে বটে, কিন্তু সেই সোনা আসলে নিষ্প্রাণ, মিডাসের সেই চরম মুহূর্তের মতোই, যেদিন রাষ্ট্রের নিজের সন্তান—তার তরুণ প্রজন্ম—ক্ষমতার নিষ্ঠুর স্পর্শে পরিণত হলো রক্তাক্ত শহীদে, সেদিনই প্রমাণ হয়ে গেল, সীমাহীন ক্ষমতার লোভ শাসককে করে তোলে সবচেয়ে দরিদ্র, সবচেয়ে নিঃসঙ্গ।
ইতিহাস কখনো কখনো কল্পনাকেও হার মানায়, নাটকীয়তাকেও ছাপিয়ে যায় নিজস্ব নির্মমতায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এমনই এক ভয়াবহ, রক্তাক্ত অথচ মহিমান্বিত দিন—যেদিন দীর্ঘ পঞ্চদশ বর্ষব্যাপী ক্ষমতার মসনদে সমাসীন ফ্যাসিস্ট হাসিনা, যাকে একদা রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বশক্তিমান, অপরাজেয় কর্ত্রী মনে করা হতো, এক লজ্জাকর, প্রায় বিভীষিকাময় পলায়নের মধ্য দিয়ে ধুলায় লুটিয়ে পড়লেন। কী নির্মম পরিহাস! যে সিংহাসন রক্তে-অশ্রুতে, ভয়ে-ভীতিতে গাঁথা হয়েছিল পনেরোটি বছর ধরে, তা এক মুহূর্তেই চূর্ণ হয়ে গেল হাজারো ক্ষুব্ধ কণ্ঠস্বরের প্রবল আঘাতে। এ কোনো নিছক ক্ষমতা হস্তান্তরের রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এ যেন গ্রিক ট্র্যাজেডির সেই চিরন্তন, রক্তচক্ষু আখ্যান, যেখানে অহংকার নিজেই ডেকে আনে নিজস্ব নেমেসিসকে, যেখানে ক্ষমতার দম্ভ শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় ধুলায় লুণ্ঠিত এক ভাঙা রাজমুকুটে।
আজ, এই রক্তস্নাত, অশ্রুসিক্ত বার্ষিকীর প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে, প্রশ্ন জাগে অন্তরাত্মার গভীরতম প্রকোষ্ঠে—কোন অমোঘ বিধান, কোন নির্মম ঐতিহাসিক নিয়তি একটি রাষ্ট্রকে তার সর্বময় কর্তার বিরুদ্ধে আছড়ে-পড়া জনসমুদ্রে রূপান্তরিত করে? কোন অগ্নিশিখা জনতার বুকের গহিনে জ্বলে ওঠে এমন প্রবলতায় যে, তা গুঁড়িয়ে দেয় বছরের পর বছরের নির্মিত ভয়ের প্রাচীর?
জার্মান সমাজতাত্ত্বিক ম্যাক্স ওয়েবার কর্তৃত্বের বৈধতাকে ত্রিধা বিভক্ত করেছিলেন—ঐতিহ্যগত, ক্যারিশম্যাটিক এবং যুক্তিসংগত-আইনি। আদতে, ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসন এই তিন ধরনের এক বিভ্রান্তিকর, প্রায় বিষাক্ত সংমিশ্রণ। সূচনাপর্বে তার কর্তৃত্বের উৎস ছিল পিতৃপরিচয়ের ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের রক্তরাঙা চেতনার সঙ্গে নাড়ির সংযোগ। কিন্তু ক্রমেই তা রূপান্তরিত হলো এক ছদ্মবেশী, প্রায় থিয়েট্রিক্যাল আইনি কাঠামোয়—যেখানে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা রক্ষিত হতো নিখুঁত মঞ্চসজ্জায় অথচ প্রতিদ্বন্দ্বিতার আত্মাটুকু ছিল চিরনির্বাসিত, নিষ্প্রাণ। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন—বিশেষত কুখ্যাত ‘মধ্যরাতের ভোট’—এই বৈধতার ধীর, নিঃশব্দ, প্রায় দমবন্ধ-করা ক্ষয়ের করুণ সাক্ষ্য বহন করে। যখন কর্তৃত্ব তার আইনি খোলসটুকু আঁকড়ে ধরে রাখে অথচ তার আত্মিক ন্যায্যতা হারিয়ে ফেলে বালুকাবেলার মতো, তখন তা নিছক দমননীতি-নির্ভর এক ভঙ্গুর, ফাঁপা কাঠামোয় পর্যবসিত হয়, যা ইতিহাসের নির্মম আদালতে বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না, পারেওনি।
আর ইতালীয় দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসির মতে, কোনো শাসকগোষ্ঠী শুধু রাষ্ট্রযন্ত্রের নগ্ন বলপ্রয়োগের মাধ্যমে চিরস্থায়ী হতে পারে না; তাকে অর্জন করতে হয় জনতার হৃদয়ের সম্মতি—শিক্ষা, মিডিয়া, সংস্কৃতি ও মতাদর্শের সূক্ষ্ম, প্রায় কুহকী কারিগরির মাধ্যমে। আওয়ামী লীগ সরকার প্রাথমিকভাবে উন্নয়নের চটকদার বয়ান, পদ্মা সেতুর গৌরবগাথা, মেট্রোরেলের চাকচিক্য এবং ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ এই মোহময় অভিধার মাধ্যমে এক সাংস্কৃতিক সম্মতি নির্মাণ করেছিল, যা অনেকের চোখেই ধাঁধা লাগিয়ে দিয়েছিল সাময়িকভাবে। কিন্তু যখন প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, নিষ্ঠুর বিরোধী দমন, গুম-খুনের কালো নিঃশব্দ ছায়া এবং দুর্নীতির পাহাড় পুঞ্জীভূত হতে থাকল দিনের পর দিন, তখন সেই সম্মতির স্থাপত্য ভেতর থেকে ধসে পড়ল নিঃশব্দে, নীরবে, তারপর সহসা এক প্রলয়ংকরী শব্দে। গ্রামসি যাকে বলেছেন ‘অর্গানিক ক্রাইসিস’—জৈব সংকট, যেখানে পুরাতন ব্যবস্থা মৃত্যুশয্যায় শায়িত অথচ নতুনের জন্ম তখনো অসম্পূর্ণ, বেদনাদায়ক—ছাত্র-জনতার আন্দোলন সেই সংকটেরই ভয়ংকর, অগ্নিগর্ভ, রক্তরাঙা বিস্ফোরণ।
বাস্তবে, আধুনিক ক্ষমতা শুধু দমনাত্মক নয়, বরং তা নজরদারি ও শৃঙ্খলা-প্রযুক্তির মাধ্যমে জনজীবনের অন্তস্তলে সাপের মতো বিস্তার লাভ করে, নিঃশব্দে জড়িয়ে ধরে প্রতিটি নিঃশ্বাস। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কঠোরতা, ইন্টারনেট অবরুদ্ধ করার নির্মম প্রবণতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমতকে গলা টিপে স্তব্ধ করার নিরন্তর প্রয়াস—এসবই ‘সার্ভেইল্যান্স সোসাইটি’র এক নির্মম, রুদ্ধশ্বাস বাস্তবায়ন। অথচ যেখানে ক্ষমতা তার নখদন্ত বিস্তার করে, সেখানেই জন্ম নেয় তার প্রতিস্পর্ধী প্রতিরোধ, ফিনিকস পাখির মতো ভস্ম থেকে। কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন রাষ্ট্রীয় দমননীতির নির্মম প্রাচীরে বারবার আঘাত খেল, রক্তাক্ত হলো, তখন তা রূপান্তরিত হলো এক দফা দাবিতে—হাসিনার পদত্যাগের অনিবার্য, অপ্রতিরোধ্য আহ্বানে। অতি নিয়ন্ত্রণের মরিয়া প্রচেষ্টা প্রায়ই জন্ম দেয় তার সম্পূর্ণ বিপরীত, অবিনশ্বর প্রতিক্রিয়ার।
মেকিয়াভেলি তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য প্রিন্স’-এ লিখেছিলেন, শাসকের পক্ষে ভালোবাসা অপেক্ষা ভয় অর্জন অধিকতর নিরাপদ, কিন্তু তিনি অকুণ্ঠভাবে সতর্ক করেছিলেন—ঘৃণা অর্জন যেন কখনোই না ঘটে, কেননা ঘৃণাই শাসকের শেষ শত্রু। শেখ হাসিনার শাসনামলে র্যাব-পুলিশের যন্ত্রণাদায়ক, সর্বব্যাপী উপস্থিতির মাধ্যমে ভয়ের এক সর্বগ্রাসী সংস্কৃতি নির্মিত হয়েছিল সত্য, কিন্তু ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে ছাত্রহত্যার সেই হৃদয়বিদারক, মর্মন্তুদ দৃশ্যাবলি—আবু সাঈদের নির্ভীক বুক পেতে গুলিবর্ষণ সহ্য করার সেই আইকনিক, চিরস্মরণীয় মুহূর্ত, শত শত তরুণ প্রাণের অকালবিসর্জন, মায়েদের বুকফাটা আর্তনাদ, ভাইয়ের রক্তে ভেজা রাজপথ—জনমানসে ভয়কে চিরতরে রূপান্তরিত করে দিল দুর্বার, অপ্রতিরোধ্য ঘৃণায়। মেকিয়াভেলির এই সতর্কবাণী উপেক্ষা করার মাশুল গুনতে হলো ক্ষমতার সিংহাসন হারিয়ে, ইতিহাসের নির্মম কাঠগড়ায় চিরকালীন অভিযুক্ত হয়ে, লজ্জার এক অমোচনীয় কলঙ্ক মাথায় নিয়ে।
দার্শনিক হানা আরেন্ট তার কালজয়ী রচনা ‘দি অরিজিনস অব টোটালিটারিয়ানিজম’-এ বিশ্লেষণ করেছেন, কীভাবে কর্তৃত্ববাদী শাসন ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে করে তোলে ফাঁপা, অন্তঃসারশূন্য, প্রাণহীন—বিচার বিভাগকে বানায় দলদাস, আমলাতন্ত্রকে পরিণত করে আজ্ঞাবহ যন্ত্রে, বিবেকহীন পুতুলে। বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং প্রশাসনযন্ত্রের পেশাদারিত্ব—রাষ্ট্রের এই তিনটি মূল স্তম্ভই ক্রমান্বয়ে ক্ষয়িষ্ণু, জীর্ণ হয়ে পড়েছিল, ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত। যখন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বতন্ত্র সত্তা বিসর্জন দিয়ে একক ব্যক্তি বা দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যে আবদ্ধ হয়, তখন রাষ্ট্র প্রবেশ করে এক মারাত্মক, নিরাময়-অযোগ্য ভঙ্গুরতায়—বাহ্যত যত সুদৃঢ়, যত অজেয় প্রতীয়মান হোক না কেন, অভ্যন্তরে তা শুধুই ফাঁপা কাঠামো, ভেঙে পড়ার অপেক্ষায় নীরবে প্রহর গুনতে থাকা এক জীর্ণ প্রাসাদ।
তাছাড়া, ফরাসি চিন্তক আলেক্সি দ্য টকভিল বলেন, বিপ্লব সচরাচর সবচেয়ে দুর্বিষহ, সবচেয়ে নিপীড়িত সময়ে ঘটে না; বরং তা ঘটে তখনই, যখন পরিস্থিতির আংশিক উন্নতির পর প্রত্যাশা ও নির্মম বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান হয়ে ওঠে অসহনীয়, দাহ্য, অগ্নিসংযোগী। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম—শিক্ষিত, ডিজিটাল-সংযুক্ত, বৈশ্বিক তথ্যপ্রবাহের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত, স্বপ্নে বিভোর—যখন প্রত্যক্ষ করল সরকারি চাকরির কোটাব্যবস্থা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে নির্লজ্জভাবে, নির্মমভাবে, তখন এই ক্ষোভ কোটা-কেন্দ্রিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা রূপান্তরিত হলো সমগ্র ব্যবস্থার অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক সর্বগ্রাসী, দাবানলসম ‘প্রত্যাশার বিপ্লবে’। এই প্রজন্মগত অসন্তোষ শুধু রাজনৈতিক ছিল না—ছিল অস্তিত্বগত, ছিল ভবিষ্যতের প্রতি এক গভীর, নিরাময়-অযোগ্য অনিশ্চয়তাবোধ থেকে উৎসারিত, এক প্রজন্মের স্বপ্নভঙ্গের করুণ আর্তনাদ।
তাছাড়া, ৫ আগস্টের সর্বাধিক নাটকীয়, প্রতীকী, হৃদয়বিদারক মুহূর্ত হলো হাসিনার হেলিকপ্টারযোগে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে গোপন, লজ্জাকর পলায়ন—এই দৃশ্য জনমানসে চিরস্থায়ীভাবে খোদিত হয়ে গেছে এক অমোচনীয় কলঙ্কচিহ্নরূপে, এক নীরব স্মৃতিস্তম্ভের মতো। রাজনৈতিক দর্শনে পলায়ন কখনোই নিছক ভৌগোলিক স্থানান্তর নয়; তা ঘোষণা করে বৈধতার সম্পূর্ণ, অপরিবর্তনীয়, অন্তিম সমাপ্তি। যে মুহূর্তে একজন শাসক আলোচনা বা প্রতিরোধের পরিবর্তে পলায়নকে বেছে নেন, সেই মুহূর্তেই তিনি নিজ মুখে, নিজ কর্মে স্বীকার করে নেন—জনতার সঙ্গে তার সামাজিক চুক্তি, যাকে জঁ-জাক রুশো ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ আখ্যা দিয়েছিলেন, চিরতরে বিচূর্ণ, ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। বস্তুত, এমন পতন প্রায়ই এক আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক তরঙ্গেরই অংশ, যেখানে একটি জাতির সফল, রক্তাক্ত বিদ্রোহ প্রতিবেশী জনগোষ্ঠীর অন্তরেও জ্বালিয়ে দেয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষার অগ্নিশিখা, যা আমরা আমাদের পাশের দেশগুলোয়ও ক্রমেই ঠাহর করতে পারছি, এক নীরব প্রতিধ্বনির মতো আর এই আখ্যানকে নিছক বিজয়োল্লাসের রূপকথা হিসেবে উপস্থাপন করা হবে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার শামিল, এক আত্মপ্রবঞ্চনা। বিপ্লব-উত্তর শূন্যতা প্রায়ই জন্ম দেয় নতুন প্রকারভেদের কর্তৃত্ববাদের, এক নতুন মুখোশে পুরোনো দানবের প্রত্যাবর্তনের, যদি না প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দ্রুততর ও সুচিন্তিতভাবে সম্পন্ন হয়। তাই হালের সরকারের সর্বাপেক্ষা পবিত্র দায়িত্ব হলো প্রশাসনিক কাঠামোর প্রকৃত, সুগভীর সংস্কার করে শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করা।
আখেরে বলা যায়, ৫ আগস্ট শুধু একটি তারিখ নয়; এ যেন এক বিশাল, নিষ্করুণ দর্পণ, যেখানে প্রতিফলিত হয় সার্বভৌমত্বের পুনরুচ্চারণ। এই দিনকে স্মরণের প্রকৃত মর্মার্থ নিহিত এই গভীর, বেদনাদায়ক উপলব্ধিতে যে, কোনো ক্ষমতাই চিরন্তন নয়, কোনো শাসকই জনগণের সম্মতি ব্যতিরেকে দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারেন না—তিনি যতই নিজেকে অজেয়, অপরাজেয় মনে করুন না কেন। একই সঙ্গে এই বার্ষিকী আমাদের অন্তরে বাজিয়ে দেয় এক সতর্ক, উচ্চকিত ঘণ্টাধ্বনি—পুরোনো কর্তৃত্ববাদের পতনই যথেষ্ট নয়, যদি না তার স্থলে প্রতিষ্ঠিত হয় সত্যিকারের জবাবদিহিমূলক, বহুত্ববাদী ও ন্যায়ভিত্তিক এক নবতর, স্থায়ী ব্যবস্থা। ইতিহাস যেমন হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে একটি রক্তাক্ত অধ্যায়ের যবনিকা টেনেছে, তেমনি তা আমাদের সম্মুখে রেখে গেছে এক অমীমাংসিত, জ্বলন্ত, নিদ্রাহীন প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে সক্ষম হব, শহীদদের রক্তের প্রতি ন্যায্য থাকতে পারব, নাকি ইতিহাসের এই নির্মম চক্র আরো একবার পুনরাবৃত্ত হবে, নতুন মুখোশে, নতুন নামে? এই প্রশ্নের উত্তরই চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে, ৫ আগস্ট শেষ পর্যন্ত মুক্তির অক্ষয়, চিরভাস্বর প্রতীক হয়ে থাকবে, নাকি শুধু আরেকটি অসমাপ্ত, অপূর্ণ বিপ্লবের বিষণ্ণ, ম্লান স্মৃতিচিহ্ন হয়ে রয়ে যাবে ইতিহাসের অশ্রুসিক্ত পাতায়। ক্ষমতার পদচিহ্ন বালুর ওপর লেখা হয়, কিন্তু মানুষের আত্মত্যাগ ইতিহাসের শিলালিপিতে খোদাই হয়ে থাকে। রাজা আসে, রাজা যায়; সাম্রাজ্য গড়ে, সাম্রাজ্য ভাঙে; কিন্তু স্বাধীনতার তামান্না কখনো মরে না।
সালাম সকল শহীদ, বিপ্লবী ও সংগ্রামী মানুষকে।
বাংলাদেশ চির অম্লান থাকুক তার মানুষের সাহস, আত্মত্যাগ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়।
ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
লেখক : সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


