শিক্ষার্থীদের গণমিছিলে রণক্ষেত্র, গুলিবিদ্ধসহ আহত দুই শতাধিক

শিক্ষার্থীদের গণমিছিলে রণক্ষেত্র, গুলিবিদ্ধসহ আহত দুই শতাধিক
ছবি: সংগৃহীত

দেশব্যাপী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল’ কর্মসূচি পালিত হয় ২০২৪ সালের ২ আগস্ট (৩৩ জুলাই)। মিছিলে মিছিলে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল চলাকালে বাধা দিলে কোথাও পুলিশের সঙ্গে, কোথাও ছাত্রলীগ-যুবলীগের সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থী ও জনতার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

বিশেষ করে ঢাকার উত্তরা, হবিগঞ্জ, খুলনা, লক্ষ্মীপুর, নরসিংদী, সিলেট, কুমিল্লার দাউদকান্দিতে হামলা ও সংঘর্ষ হয়। এসব ঘটনায় দুজন নিহত এবং অর্ধশত গুলিবিদ্ধসহ দুই শতাধিক আহত হয়েছেন। আগের দিন মুক্তি পাওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ক যৌথ বিবৃতি দিয়ে জানায়, ডিবি হেফাজতে আটকে রেখে ভিডিও বার্তা দিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা জোর করে দেওয়ানো হয়।

বিজ্ঞাপন

কর্মসূচিতে একাত্মতা প্রকাশ করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গণমিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন ছাত্র-জনতা। জুমার নামাজের পর বায়তুল মোকাররমের সামনে থেকে গণমিছিল বের করে প্রেস ক্লাব হয়ে শাহবাগে গিয়ে অবস্থান নেন কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য আন্দোলনকারীরাও যোগ দেন। আন্দোলনকারীদের কয়েকজন প্রেস ক্লাবের সামনে পুলিশের একটি সাঁজোয়া যানের (এপিসি) ওপর উঠে উল্লাস করেন ও লাল রং দিয়ে ‘ভুয়া ভুয়া’ লিখে দেন। তারপর মিছিল নিয়ে তারা প্রেস ক্লাব থেকে সায়েন্স ল্যাবের দিকে যান।

এদিন রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের সামনে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা। বিকালে উত্তরার জমজম টাওয়ারসংলগ্ন মাইলস্টোন কলেজের সামনের সড়কে পুলিশ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। পুলিশ শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ সময় দুজন গুলিবিদ্ধ হন। এছাড়া অনেকে আহত হন। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বাসাবাড়িতে আশ্রয় নিলে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা সেখানে গিয়েও রামদা, লোহার পাইপসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়।

মিরপুর ১০ ও ২ নম্বর এবং ইসিবি চত্বরে কয়েকশ শিক্ষার্থী অবস্থান নিলে উত্তেজনা দেখা দেয়। সায়েন্স ল্যাবেও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করলে পুলিশের উপস্থিতিতে দেখা দেয় উত্তেজনা। রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ২ আগস্ট বিকালে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের ডাকা ‘দ্রোহযাত্রা’ কর্মসূচিতে হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে শহীদ মিনার এলাকা। কর্মসূচিতে ‘জুলাই হত্যাকাণ্ডের’ সুষ্ঠু বিচার, গণগ্রেপ্তার বন্ধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা এবং সরকারের পদত্যাগসহ নানা দাবি তুলে স্লোগান দেওয়া হয়।

দ্রোহযাত্রার শেষ দিকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচির মধ্যে ছিল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কারফিউ প্রত্যাহার, গণগ্রেপ্তার বন্ধ, বন্দিদের মুক্তি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে। দাবি পূরণ না হলে ৩ আগস্ট জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে গণমিছিল শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা পুলিশের সামনে সাদা কাগজে লাল কালিতে বিভিন্ন দাবি লিখে তা দেখায়। কিছু পুলিশ সদস্য মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে ছিলেন।

রাজধানীর বাইরে পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে খুলনা রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। এ সময় মিছিলকারীদের পিটুনিতে সুমন কুমার ঘরামী নামে পুলিশের এক কনস্টেবল নিহত হন। হবিগঞ্জে শিক্ষার্থীদের গণমিছিলে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ হামলা করলে সংঘর্ষে এক পথচারী নিহত হন।

আহত হয়েছেন শতাধিক। এর মাঝে অনেকেই গুলিবিদ্ধ। পুলিশ শতাধিক রাউন্ড রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। হবিগঞ্জে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন একজন পথচারী। হবিগঞ্জ-৩ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় তৎকালীন সংসদ সদস্য আবু জাহিরের বাসায় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে ও ১০টি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়।

সিলেটে গণমিছিল কর্মসূচিকে ঘিরে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে আখালিয়া, মদিনা মার্কেট এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষে পুলিশকে টিয়ারশেল, শটগানের গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ সময় মিছিলে থাকা এক শিশুসহ অন্তত ৫০ জন শটগানের গুলিতে আহত হন।

চট্টগ্রামে তুমুল বৃষ্টি উপেক্ষা করে গণমিছিল কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন অভিভাবকসহ সাধারণ মানুষও। নগরীর কোতোয়ালি থানার আন্দরকিল্লা জামে মসজিদ থেকে মিছিলটি শুরু হয়। শুরুতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও একপর্যায়ে পিছু হটে পুলিশ।

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে গণপদযাত্রা ও বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ হামলা চালায়। এতে পাঁচ শিক্ষার্থী আহত হন। কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলায় চার থেকে পাঁচজন শিক্ষার্থী আহত হন। লক্ষ্মীপুরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুবলীগ-ছাত্রলীগ হামলা চালালে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১৫ জন আহত হন। রামগঞ্জে গণমিছিলে হামলা করেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এতে অন্তত ১২ জন আহত হন।

নরসিংদীতে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি পালন করলে মহিলা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটাসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এতে ছয় শিক্ষার্থী আহত হন। পরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা।

যশোর শহরতলির পালবাড়ি মোড় থেকে মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেন অভিভাবকরাও। শিক্ষার্থীদের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জেলা বিএনপি।

ময়মনসিংহের মালগুদাম চত্বর থেকে শিক্ষার্থী-জনতার দ্রোহযাত্রা শুরু হয়ে শেষ হয় টাউন হল চত্বরে। এতে শিক্ষার্থী-শিক্ষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক কর্মী, চিকিৎসক, আইনজীবী, প্রকৌশলীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

মুক্ত সমন্বয়কদের বিবৃতিতে গোমর ফাঁস

১ আগস্ট ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) হেফাজতে আটকাবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ক যৌথ বিবৃতি দেন ২ আগস্ট। তারা জানান, ডিবিতে আটকে রেখে গত ২৮ জুলাই রাতে এক ভিডিও বার্তায় আন্দোলন প্রত্যাহারের যে ঘোষণা তাদের দিয়ে দেওয়ানো হয়, তা স্বেচ্ছায় দেননি। তারা বলেন, ছাত্র-নাগরিক হত্যার বিচার ও আটক নিরপরাধ ব্যক্তিদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত ২৬ জুলাই ঢাকার গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে তিন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদারকে ডিবি জোর করে তুলে মিন্টো রোডের কার্যালয়ে নিয়ে যায়। নাহিদ ও আসিফ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরদিন ২৭ জুলাই সারজিস ও হাসনাতকে সায়েন্স ল্যাব এলাকা থেকে জোর করে তুলে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৮ জুলাই ভোরে বাসা ভেঙে জোর করে নুসরাতকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোনো সিদ্ধান্ত ডিবি কার্যালয় থেকে আসতে পারে না। সারা দেশের সব সমন্বয়ক ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গৃহীত হবে না। ডিবি কার্যালয়ে তাদের জোর করে খাবার টেবিলে বসিয়ে ভিডিও করা হয়। তাদের ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে পরিবারকে ডেকে ১৩ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। গণমাধ্যমে মিথ্যা বিবৃতি দেওয়ানো হয়।

পরিবার ও শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা করতে না দেওয়া, আটকদের অনশনের কথা পরিবার ও গণমাধ্যমের কাছ থেকে গোপন রাখার কথাও জানানো হয় বিবৃতিতে। তাতে আরো বলা হয়, ছাত্র-নাগরিক হত্যার বিচার ও আটক নিরপরাধ ব্যক্তিদের মুক্তির দাবিতে কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। সারা দেশে ছাত্র-নাগরিকদের প্রতি আহ্বান থাকবে, তারা যেন সরকারের মিথ্যা অপপ্রচার ও দমন-পীড়নকে তোয়াক্কা না করে রাজপথে নেমে আসে।

ফেসবুক ও মেসেঞ্জার বন্ধ

এর আগে ১ আগস্ট দুপুর ১২টার পর থেকে মোবাইল ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও মেসেঞ্জার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার পর পুনরায় সচল হয়। তবে টেলিগ্রাম সার্ভিস বন্ধ ছিল।

সরকারি সূত্র জানায়, নিরাপত্তাজনিত কারণে মোবাইল ইন্টারনেটে এই প্ল্যাটফর্মগুলো বন্ধ রাখা হয়েছিল। কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ১৭ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত মোবাইল ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রাম বন্ধ ছিল।

২ আগস্ট রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, একটি মহল সরকার বনাম শিক্ষার্থী গেম খেলে ফায়দা লোটার অপচেষ্টা করছে। তারা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে পুঁজি করে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুম ও পরীক্ষার হলে ফিরে যাবে এবং স্বাভাবিক জীবন পাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। শিক্ষার্থীদের অযথা হয়রানি এবং আটক না করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নিজের পদত্যাগের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার অলরেডি বিচারবিভাগীর তদন্ত কমিশন গঠন করেছে। এতে তিনজন বিচারপতি, জাতিসংঘসহ যেসব দেশ এই তদন্তের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করবে, তারাও অংশ নিতে পারে। এখন কে অপরাধী, কে অপরাধী নয়—প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। সেটাও ওই যে তদন্ত কমিশন, তার কার্যপরিধির আওতার মধ্যে পড়ে। কাজেই বিষয়টি সেখানেই থাকবে, সেখানেই সিদ্ধান্ত হবে।

আগের দিন জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের জন্য সরকারকে সাধুবাদ জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, জামায়াত-শিবির চিহ্নিত সন্ত্রাসী সংগঠন। তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। খুন, ধর্ষণ, লুটপাট করেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন