চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন শহীদ ফরহাদ হোসেন। অত্যন্ত নম্র, ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের এই তরুণের স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া। দিনের বেশির ভাগ সময় কাটত ক্লাস, লাইব্রেরি, পড়াশোনা ও ইবাদত-বন্দেগিতে। তবে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে ঘরে বসে থাকেননি তিনি। যোগ দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোটা সংস্কার আন্দোলনে।
আন্দোলন দমনে পতিত শেখ হাসিনা সরকারের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা কঠোর অবস্থান নেয়। দেশজুড়ে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও সহিংসতায় প্রাণ হারান অসংখ্য ছাত্র-জনতা। এরই ধারাবাহিকতায় ৪ আগস্ট দুপুরে মাগুরায় আন্দোলন চলাকালে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ছোড়া গুলিতে মাথায় আঘাত পান ফরহাদ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর শেষ মুহূর্তে কালেমা পড়তে পড়তেই শাহাদাত বরণ করেন তিনি।
মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার রায়নগর গ্রামের বাসিন্দা গোলাম মোস্তফার ছেলে ফরহাদ হোসেন। চার সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন মা শিরিনা বেগমের সবচেয়ে ছোট সন্তান।
বাবা গোলাম মোস্তফা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক। সীমিত আয়ের মধ্যেও সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করার চেষ্টা করেছেন তিনি। গাড়ি চালিয়ে উপার্জন করে দুই মেয়েকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। আরেক ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পরিবারের ছোট সন্তান ফরহাদও নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
পরিবারের সঙ্গে শেষ কথা
৪ আগস্ট দেশের পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। এরই মধ্যে সরকার পতনের এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়েছে এবং ঢাকামুখী লং মার্চ শুরু হয়েছে। ফরহাদ ঢাকায় যেতে না পারায় মাগুরাতেই আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সকালে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছিলেন তিনি। একপর্যায়ে বড় ভাইকে বলেন, 'চলেন ভাই, শহীদ হয়ে আসি। এমন সময় জীবনে আর পাওয়া যাবে না।'
এদিন দুপুরে কলেজের পাঁচ-সাতজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ইজিবাইকে করে আন্দোলনে যান ফরহাদ। ঢাকা-মাগুরা মহাসড়কের পারনান্দুয়ালী ব্রিজ এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু হলে একটি গুলি তার মাথায় লাগে। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মাটিতে বসে পড়েন। আশপাশের লোকজন মাথায় পানি ঢেলে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন।
মৃত্যুর আগে তার শেষ অনুরোধ ছিল, 'আমার পকেটে থাকা ফোনটা আর আমার লাশটা আম্মুর কাছে পৌঁছে দেবেন।' এরপর তিনি নিজেই কালেমা পড়তে থাকেন। হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই রাতেই গ্রামের রায়নগর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
ফরহাদের বড় ভাই গোলাম কিবরিয়া বলেন, ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে মা ফরহাদকে ফোন করে বাসায় ফিরে আসতে বলেছিলেন। পরে আমিও ফোন করেছিলাম, কিন্তু ফরহাদ আর ফোন ধরেনি। কিছুক্ষণ পর প্রতিবেশী ও আন্দোলনে থাকা বন্ধুরা এসে তার মৃত্যুর খবর জানায়।
তিনি বলেন, এ খবর শুনে মা ভেঙে পড়েন। তিনি এমনিতেই কার্ডিয়াকের রোগী। কান্না করতে করতে বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। জ্ঞান ফিরলেই আমাকে জড়িয়ে ধরে আবার কান্নায় ভেঙে পড়তেন। টানা দুই দিন তার এমন অবস্থা ছিল।
জামায়াত-বিএনপি ছাড়া কেউ খোঁজ নেয় না
ফরহাদের ভাই গোলাম কিবরিয়া বলেন, জামায়াত শুরু থেকেই শহীদ পরিবারের পাশে রয়েছে। তারা আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি নিয়মিত খোঁজখবর নেয় এবং কবর জিয়ারত করতে আসে। বিএনপির জেলা পর্যায়ের নেতারাও শুরুতে যোগাযোগ রেখেছেন, কিন্তু তারা মামলার বিষয়ে বেশি খোঁজ নিতেন।
তিনি বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এবং বর্তমানে এনসিপিতে থাকা কয়েকজন নেতা ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ নিয়েছেন। তবে দল হিসেবে এনসিপির বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের তেমন যোগাযোগ হয়নি।
এখনো দাখিল হয়নি মামলার চার্জশিট
২০২৪ সালের ২১ আগস্ট মাগুরা সদর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন সদর উপজেলার বিরপুর গ্রামের বাসিন্দা জামাল হোসেন। তিনি ৪ আগস্ট ফরহাদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। মামলায় মাগুরা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শিখর, মাগুরা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বীরেন শিকদারসহ ৬৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে প্রায় দুই বছর হতে চললেও ফরহাদ হত্যা মামলার চার্জশিট এখনো দাখিল হয়নি। প্রথমে মামলাটির তদন্ত করছিল মাগুরা সদর থানা পুলিশ। পরে তা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের বিশেষ শাখায় (স্পেশাল ব্রাঞ্চ) হস্তান্তর করা হয়।
ফরহাদের বড় ভাই গোলাম কিবরিয়া জানান, তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও তাগাদা দেওয়া হলেও বিভিন্ন দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না পাওয়ার কারণে তদন্ত শেষ হচ্ছে না বলে জানানো হচ্ছে। শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে তারা দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার চান।
জানতে চাইলে মাগুরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ বিভাগ) খায়রুল হাসান আমার দেশকে বলেন, মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। প্রকৃত আসামিদের শনাক্ত করা এবং কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন—সেটি নিশ্চিত করেই তদন্ত করা হচ্ছে।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

