দ্বিতীয় ইউনিট : ইকরিমা ইবনে আবু জাহলের নেতৃত্বে
এই বাহিনীটি হানিফা গোত্র এবং সেখানে অবস্থানরত নবুয়তের মিথ্যা দাবিদার মুসাইলামা বিন হাবিব কাজ্জাবকে দমন করার জন্য পাঠানো হয়েছিল।
হানিফা গোত্রে ইমান-কুফর
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের আগে আরবের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিদল মদিনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করে। সেই ধারাবাহিকতায় হানিফা গোত্রের বড় একটি দল মদিনায় আসে। তাদের মধ্যে সুমামা ইবন উসাল (রা.) ছিলেন। তিনি আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মর্যাদাবান সাহাবি। তবে তিনি হানিফা গোত্রের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আসেননি। বরং আলকুরতা যুদ্ধাভিযান থেকে ফেরার পথে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) তাকে বন্দি করেছিলেন।
সুমামা ইবনে উসালের ইসলাম গ্রহণ
সুমামা ইবনে উসাল ছিলেন ইয়ামামার শাসক ও হানিফা গোত্রের প্রধান। তিনি কুরাইশদের মিত্র ছিলেন এবং একসময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর গোর বিরোধী ছিলেন। উমরা করার উদ্দেশ্যে মক্কার পথে বের হলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পাঠানো একদল সাহাবি তাকে চিনতে না পেরে বন্দি করে মদিনায় নিয়ে আসে। তাকে মসজিদে নববির একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিদিন তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করতেন, হে সুমামা, তোমার কী মনে হয়? উত্তরে সুমামা বলতেন, ‘আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন, তবে একজন হত্যাযোগ্য লোককেই হত্যা করবেন। আর যদি অনুগ্রহ করেন, তবে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির ওপর অনুগ্রহ করবেন। আর যদি সম্পদ চান, তবে যত ইচ্ছা চাইতে পারেন।’ এ কথার পরও রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে কোনো শাস্তি দিলেন না।
কয়েক দিন এভাবেই কেটে গেল। সুমামা ইবনে উসাল মসজিদের ভেতর অবস্থান করছিলেন। প্রতিনিয়ত তার সামনে মুসলিমরা আসছিল, নামাজ আদায় করছিল, কোরআন তিলাওয়াত করছিল। তিনি মুসলিমদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সৌজন্যবোধ দেখছিলেন। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহনশীলতা ও মহানুভবতা খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করছিলেন। বন্দি হওয়ার তিন দিন পর আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশে তাকে মুক্ত করে দেওয়া হয়। কোনো শর্ত আরোপ না করেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
মুক্তি পেয়ে মসজিদের অদূরে গিয়ে তিনি গোসল করলেন। এরপর মসজিদে ফিরে এসে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সামনে দাঁড়িয়ে কালিমা পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করলেন।
রাসুলের দরবারে হানিফা গোত্রের প্রতিনিধিদল
ইসলাম গ্রহণ করার পর সুমামা ইবনে উসাল নিজ গোত্র-বনু হানিফার কাছে চলে যান এবং গোত্রের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য মদিনায় ফিরে আসেন।
প্রতিনিধিদলের সবাই আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর বায়াত হয় এবং ইসলাম গ্রহণ করে। নবীজি (সা.)-এর অব্যাস ছিল, কোনো প্রতিনিধিদল ইসলাম গ্রহণের জন্য এলে তাদের খুশি করার জন্য কিছু হাদিয়া দিতেন। তিনি বনু হানিফা গোত্রের প্রতিনিধিদেরও উপহার দেন।
তখন তারা জানায়, আমাদের উট ও আসবাবপত্র পাহারা দেওয়ার জন্য আমাদেরই একজন লোক মদিনার বাইরে রয়ে গেছে। এই ব্যক্তিই ছিল মুসাইলামা কাজ্জাব। আল্লাহর রাসুল (সা.) অনুপস্থিত মুসাইলামাকেও অন্যদের মতো উপহার দেন। তার প্রশংসা করে বলেন, সে আপনাদের মতোই মর্যাদার অধিকারী।
মুসাইলামার মিথ্যাচারিতা
নবীজি (সা.)-এর থেকে বিদায় নিয়ে হানিফা গোত্রের প্রতিনিধিদল মদিনা থেকে ফিরে এলো এবং মুসাইলামা কাজ্জাবতে রাসুলের উপহার বুঝিয়ে দিল। কিন্তু ইয়ামামায় পৌঁছানোর পর মুসাইলামা ধর্মত্যাগ করে এবং নবুয়তের মিথ্যা দাবি তোলে। সে অবাধ মিথ্যাচার করে মানুষের কাছে বলতে লাগল, ‘নবুয়তের বিষয়ে আমি ও মোহাম্মদ এক অন্যের অংশীদার।’ সে প্রতিনিধিদলের সদস্যদের বলল, ‘তোমাদের মুখে আমার কথা শুনে মোহাম্মদ বলেছিল, সে তোমাদের মতোই সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। তার এ কথা বলার মানে হলো নবুয়তের ক্ষেত্রে আমার অংশীদারত্ব মেনে নেওয়া।
প্রতিনিধিদলের লোকরা তার কাছে জানতে চাইলেন, তুমি কেন মদিনায় এসে রাসুলের বায়াত গ্রহণ করলে না?
মুসাইলামা সাথিদের কাছে উটগুলো বুঝিয়ে দিয়ে বায়াতের উদ্দেশ্যে মদিনায় ফিরে গেল। নবীজি (সা.) তখনো মসজিদে আসেননি। মুসাইলামা হানিফা গোত্রের এক লোকের সঙ্গে কথা বলছিল। লোকটা তাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার ইচ্ছা কী? তুমি কী নবীজির হাতে বায়াত হবে?
মুসাইলামা উত্তরে বলল, তিনি যদি পরবর্তী কর্তৃত্ব আমার হাতে সোপর্দ করতে সম্মত হন, তাহলেই আমি ইসলাম গ্রহণ করব। পেছন থেকে এসে আল্লাহর রাসুল (সা.) তার কথা শুনে ফেললেন। তিনি মুসাইলামাকে বললেন, ‘আল্লাহর কসম, তুমি আমার কাছে এই সাধারণ কাঠখড়িটুকুও চাইলেও তোমাকে দেব না। আর আমি তোমার পরিণতি ঠিক তেমনই দেখতে পাচ্ছি, যেমনটি আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। তোমার সঙ্গে আমার পক্ষ থেকে সাবিত বিন কায়েস কথা বলবে।’
নবীজি (সা.) চলে গেলেন। এরপর আর মুসাইলামার সঙ্গে আর কোনো কথা বললেন না। মুসাইলামা হানিফা গোত্রের কছে ফিরে গিয়ে নিজেকে নবী দাবি করে। সে প্রচার করতে থাকে, নবুয়তের কার্যসমাধায় তাকে মুহাম্মদের অংশীদার করা হয়েছে। তার এই মিথ্যা দাবিতে বিভ্রান্ত হয়ে গোত্রের কিছু লোক তার প্রতি ঈমান আনে। আরবে নিজের নবুয়তের ভিত্তি মজবুত করার উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহর কাছে বার্তা পাঠায়। মুসাইলামার প্রশ্নের জবাবে নবীজি তাকে হেদায়েতের আহ্বান জানান। কিন্তু মুসাইলামা রাসুল (সা.)-এর দূতকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
নবীজি (সা.) মুসাইলামার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে সময় তিনি ফিলিস্তিন সীমান্তে উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-এর নেতৃত্বে সৈন্য পাঠানোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন। এটা ছিল নবীজির ইন্তেকালের অল্প সময় আগের ঘটনা। অধিকাংশ সাহাবি উসামার দলে অন্তর্ভুক্ত থাকায় সে সময় হানিফা গোত্রের বিরুদ্ধে তৎক্ষণাৎ অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। আর ততদিনে মুসাইলামার অনুসারী মুরতাদদের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারে পৌঁছে যায়।
নবীজি (সা.) দাওয়াতের মাধ্যমে তাদের সুপথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তারা কোনো কিছু আমলে নিতে সম্মত ছিল না।
ধীরে ধীরে মুসাইলামার দল ভারী হতে থাকে। হানিফা গোত্রের অর্ধেক লোক, যাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার, মুসাইলামার দলভুক্ত হয়ে পড়ে। এই সংকটময় মুহূর্তে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইন্তেকাল করেন। নবীজির ইন্তেকালের সংবাদ পেয়ে হানিফা গোত্রের বাকি অর্ধেক লোকও মুসাইলামার দলে যোগ দেয়। প্রায় পুরো গোত্রই মুরতাদ হয়ে যায়। সেখানে হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন মুসলিম অবশিষ্ট রইলেন। মহান সাহাবি সুমামা বিন উসাল (রা.) অল্প কিছু সঙ্গীসহ প্রাণ বাঁচিয়ে হানিফা গোত্র থেকে দূরে সরে আসতে সক্ষম হন।
হানিফা গোত্রে অভিযান
খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.) উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুটি সেনাবাহিনী পাঠান। একটির নেতৃত্বে ছিলেন ইকরিমা, আর অন্যটির নেতৃত্বে ছিলেন শুরাহবিল ইবনে হাসানা। ইকরিমাকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘তুমি হানিফা গোত্রে পৌঁছে অপেক্ষা করবে। শুরাহবিল ইবনে হাসানার বাহিনী সেখানে না আসা পর্যন্ত যুদ্ধে জড়াবে না।’
খলিফা জানতেন মুসাইলামার বাহিনী বিশাল, কিন্তু বাস্তবতা হলো, আবু বকর (রা.) তখনো জানতেন না, মুসাইলামার সৈন্যসংখ্যা এক লাখে পৌঁছে গেছে। সেই তুলনায় মদিনায় সাহাবিদের শক্তি ছিল সীমিত। প্রথম বাহিনীতে (ইকরিমার) ছিল প্রায় তিন হাজার সৈন্য এবং দ্বিতীয় বাহিনীর (শুরাহবিলের) সৈন্যসংখ্যাও এর চেয়ে বেশি ছিল না। হানিফা গোত্রে অভিযান পরিচালনা করা মুসলিমদের সার্বিক শক্তি ছিল এটুকুই। আর ঠিক এ সময়ে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) উত্তরের অঞ্চলে বনু আসাদ ও বনু তামিম গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন।
কিন্তু ইকরিমা ইবনে আবু জাহল (রা.) শুরাহবিল ইবনে হাসানার পৌঁছানোর অপেক্ষা না করেই মুসাইলামার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। ঐতিহাসিকরা ইকরিমা ও মুসাইলামার মধ্যকার সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে লোমহর্ষক মন্তব্য করেছে, ‘মুসাইলামার বাহিনী যেন ইকরিমার বাহিনীকে গিলে ফেলতে উদ্যত হয়েছিল।’
মদিনায় আবু বকর (রা.)-এর কাছে এই সংবাদ পৌঁছালে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হন। তিনি বুঝতে পারেন, পরাজিত বাহিনী মদিনার দিকে ফিরে আসছে। তিনি তৎক্ষণাৎ ইকরিমা ইবনে আবু জাহলের কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠির শুরুতে তিনি মুসাইলামার বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাড়াহুড়ো করার জন্য কঠোর ভর্ৎসনা করেন। এরপর নির্দেশ দেনÑ‘তুমি বাহিনী নিয়ে মদিনায় ফিরে আসবে না। বরং এখান থেকেই সরাসরি ইয়েমেনে হুজাইফা বিন মিহসান ও আরফাজা বিন হারসামার কাছে যাও এবং তাদের সঙ্গে মিলে যুদ্ধ করো।’
খলিফার দূরদর্শিতা
ইকরিমা ইবনে আবু জাহল (রা.)-এর এমন বড় ভুল সত্ত্বেও খলিফা আবু বকর (রা.) তাকে সেনাপতির পদ থেকে বরখাস্ত করেননি। বরং তার নেতৃত্বগুণ ও সমরপ্রজ্ঞা যথাযথভাবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।
আবু বকর (রা.) হুজাইফা বিন মিহসান এবং আরফাজা বিন হারসামার কাছে পাঠানো চিঠিতে লেখেন, ‘ইকরিমা তোমাদের কাছে আসছে। সে পৌঁছালে তার পরামর্শ মনোযোগ দিয়ে শুনবে। কারণ সমরবিদ্যায় সে খুবই দক্ষ।’
খলিফা সেখানে হুজাইফা বিন মিহসানকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেন এবং নির্দেশ দেন, যেন সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করে। তিনি চাইলেন না, হানিফা গোত্রে একা ও বিচ্ছিন্ন ভাবে আক্রমণ করে ইকরিমা যে ভুল করেছিলেন, তার পুনরাবৃত্তি হোক।
তিনি তাদের ওমানের ‘দাবা’ অঞ্চলে অবস্থানরত মুরতাদদের বিরুদ্ধে অভিযানের নির্দেশ দেন। ওমান বিজয়ের পর তাদের পরবর্তী গন্তব্য ঠিক করা হলো ‘মাহরা’ অঞ্চল, যেখানে নেতৃত্ব দেবেন আরফাজা বিন হারসামা। ইনশাআল্লাহ, আমরা পরে সেই যুদ্ধের বিস্তারিত আলোচনা করব।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

