ঔপনিবেশিক শাসন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও অন্যান্য কারণে উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের শুরুতে বাংলার মুসলিমরা আর্থসামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছিল। সে সময়ে মুসলিম নারীদের শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। তখন নবাব সলিমুল্লাহ মুসলিম সমাজের সার্বিক উন্নয়নের পাশাপাশি নারী শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি উপলব্ধি করেন, জাতির উন্নয়ন নারীদের শিক্ষার ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় নারী শিক্ষা বিস্তারের পথ সুগম হয়।
বাংলার মুসলিম সমাজ শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছিল। ঔপনিবেশিক শাসনামলে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটলেও মুসলিম সমাজ, বিশেষত নারীরা নানা ধরনের সামাজিক অবস্থানের কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল। ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি অনাগ্রহ মুসলিম সমাজকে হিন্দুদের তুলনায় শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে দিয়েছিল। ঔপনিবেশিক আমলের বিভিন্ন সরকারি প্রতিবেদন ও আদমশুমারির তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯০১ সালের দিকে বাংলায় সাক্ষরতার হার সামগ্রিকভাবে খুবই কম ছিল। সেটি পাঁচ-ছয় শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। অন্যদিকে মুসলিম নারীদের শিক্ষার হার ছিল আরো কম। অনেক এলাকায় তা এক শতাংশের নিচে ছিল। নবাব সলিমুল্লাহ তার ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামি মূল্যবোধ অনুসরণ ও ধারণ করতেন। একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম হিসেবে মুসলিম সমাজের কল্যাণে তার অনেক অবদান ছিল। তিনি জানতেন, যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন। এমন ধারণায় পুষ্ট নবাব সলিমুল্লাহ সামগ্রিকভাবে মুসলিম সমাজকে আধুনিক শিক্ষার দিকে এগিয়ে নিতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারী-পুরুষ সবার শিক্ষা গ্রহণ ছাড়া কোনো জাতির প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
নবাব সলিমুল্লাহ একজন দূরদর্শী সমাজ-সংস্কারক ও শিক্ষানুরাগী ছিলেন। তিনি আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, শিক্ষাই মুসলিম সমাজের পশ্চাৎপদতা দূর করার প্রধান হাতিয়ার। তিনি শিক্ষাকে কেবল ব্যক্তিগত উন্নয়নের উপায় হিসেবে নয়; বরং জাতির অগ্রগতির ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতেন।
মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষাবিস্তারের জন্য তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং সেগুলোর উন্নয়নে সহায়তা প্রদান করেন। মুসলিম শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য তিনি মোহামেডান হল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং বিপুল অর্থদান করেন। পরবর্তীকালে তা সলিমুল্লাহ মুসলিম হল নামে পরিচিত হয়। এতিম শিশুদের লালন-পালনের লক্ষ্যে ১৯০৯ সালে সলিমুল্লাহ এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন। সমকালীন সমাজে এতিমদের দেখভালের জন্য এতিমখানা প্রতিষ্ঠা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। মুসলিম শিক্ষার্থীর আবাসন সংকট নিরসনের জন্য বরিশালে গড়ে তোলেন ইসলামিয়া বোর্ডিং। এই প্রতিষ্ঠান নির্মাণে তিনি আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
১৯০৯ সালের মাদরাসা শিক্ষা সংস্কার কমিটির সম্মানিত সদস্য হিসেবে তিনি আধুনিক পাঠক্রমভিত্তিক মাদরাসা শিক্ষার প্রবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এর ফলেই পরবর্তীকালে আলিয়া মাদরাসা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ সম্ভব হয়। আজন্ম শিক্ষানুরাগী নবাব সলিমুল্লাহ শিক্ষাবিস্তারে সব আন্দোলনের অগ্রনায়ক ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নন, তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকারীদের অন্যতম পুরোধা ছিলেন। পূর্ববঙ্গে উচ্চশিক্ষা বিস্তারে তার অবদান ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। শিক্ষাপ্রসারে তার অবিস্মরণীয় অবদান পরবর্তীকালে মুসলিম সমাজে নবজাগরণের ভিত্তি রচনা করে।
এর আগে উল্লেখ করেছি, ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় মুসলিম নারীদের শিক্ষার হার ছিল অত্যন্ত কম। সামাজিক কুসংস্কার, দারিদ্র্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব নারী শিক্ষার প্রধান প্রতিবন্ধকতা ছিল। অধিকাংশ পরিবার মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে অনাগ্রহী ছিল। ফলে মুসলিম নারীরা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। তিনি মুসলিম সমাজের নেতা ও অভিভাবকদের মধ্যে নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করেন। তার ওজস্বী বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড মুসলিম সমাজে নারী শিক্ষার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।
নারী শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন বিদ্যালয় ও শিক্ষা কার্যক্রমে তিনি আর্থিক ও নৈতিক সমর্থন প্রদান করেন। তার উৎসাহে মুসলিম সমাজে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি পায়।
নবাব সলিমুল্লাহ মুসলিম নারীদের জন্য এমন শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, ভাষা ও সামাজিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের ফলে নারী শিক্ষার ব্যাপ্তি ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। নারী শিক্ষার পথে বিদ্যমান বাধাগুলো চিহ্নিত করে তা অপনোদনের কার্যক্রম হাতে নেন। তিনি সামাজিক বাধা দূর করার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেন। তার প্রগতিশীল নেতৃত্বে মুসলিম সমাজে শিক্ষাবিষয়ক সংস্কারমূলক চিন্তার প্রসার ঘটে।
নবাব সলিমুল্লাহর শিক্ষাবিষয়ক মহৎ উদ্যোগ মুসলিম নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি নতুন যুগের সূচনা করে। তার প্রচেষ্টার ফলে— ক. সমাজে নারী শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়; খ. মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর প্রবণতা বাড়ে। শিক্ষিত মুসলিম নারীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে; গ. নারীদের সামাজিক মর্যাদা ও আত্মনির্ভরতার ভিত্তি সুদৃঢ় হয়; ঘ. পরবর্তী সময়ে নারী শিক্ষা আন্দোলনের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
নবাব সলিমুল্লাহর সময়ে নারী শিক্ষার বিস্তার সীমিত ছিল, তবুও তার উদ্যোগ ছিল যুগান্তকারী। তিনি এমন এক সময়ে নারী শিক্ষার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, যখন সমাজের বৃহৎ অংশ এ বিষয়ে অনাগ্রহী ছিল। তার কল্যাণমুখী কর্মকাণ্ড মুসলিম সমাজে শিক্ষা সংস্কারের ধারাকে শক্তিশালী করে এবং নারী শিক্ষা বিস্তারের জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক ভিত্তি তৈরি করে।
নবাব সলিমুল্লাহ বাংলার মুসলিম সমাজের শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম পথিকৃৎ। নারী শিক্ষা সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি মুসলিম নারীদের শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তার পৃষ্ঠপোষকতা, সচেতনতা সৃষ্টি এবং শিক্ষা বিস্তারের উদ্যোগ মুসলিম নারী শিক্ষার বিকাশে স্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। বর্তমান বাংলাদেশের নারী শিক্ষার অগ্রযাত্রার ইতিহাসে নবাব সলিমুল্লাহর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ।
লেখক : প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, ইসলামের ইতিহাস ও সভ্যতা বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

