আবদুল লতিফ ছিলেন সম্রাজ্ঞী মুমতাজ মহলের বাবা খাজা আবুল হাসান ইয়ামিনুদ্দৌলার বিশিষ্ট সহযোগী ও একান্ত অনুচর। ৬ মে ১৬০৮ ইসলাম খান চিশতিকে বাংলার সুবেদার নিযুক্ত করা হয়, তখন খাজা আবুল হাসান বাংলার দেওয়ান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। খাজা আবুল হাসান ও আবদুল লতিফ ইসলাম খানের সঙ্গে বাংলার উদ্দেশে যাত্রা করেন। আবদুল লতিফ তার বাংলাগামী যাত্রার দিনলিপি রচনা করেছিলেন। তার ডায়েরিতে বিবরণে পথিমধ্যে দর্শিত বিভিন্ন নগর, মাজার ও তৎকালীন সামাজিক রীতিনীতি সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা লিপিবদ্ধ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বর্তমান রাজশাহীর বাঘা মসজিদ। তিনি আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (প্রকৃত নির্মাতা নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ) নির্মিত বাঘা মসজিদ, মসজিদের পাশে সুবিশাল মাদরাসা ও স্থানীয় বুজুর্গ হাওধা মিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। এই অঞ্চলকে তিনি অত্যন্ত মনোরম ও ইসলাম ধর্মের সবচেয়ে অনুগত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তিনি লিখেছেন, আলাইপুর একটি সাধারণ স্থান; উল্লেখযোগ্য বিশেষ কিছুই এখানে নেই। তবে এর এক লিগ (৪ দশমিক ৮ কিমি) দূরত্বে বাঘা ও মালিক নামে দুটি গ্রাম অবস্থিত—প্রথমটি চণ্ডিয়াবাজু পরগনা এবং দ্বিতীয়টি আলাইপুর পরগনার অন্তর্গত। এখানে (বাঘায়) হাওধা মিয়া নামে প্রায় শতবর্ষীয় এক প্রবীণ বুজুর্গ বাস করেন। গ্রামের কেন্দ্রস্থলে একটি মনোরম দিঘি অবস্থিত—বাংলা ভাষায় যাকে ‘পুখার’ (পুকুর?) বলা হয়, এর পানি খুবই নির্মল। একে বেহেশতের আবে-কাওসারের মতো মনে হয়। এই দিঘিকে ঘিরে হাওধা মিয়ার ছেলে ও অনুসারীরা দিঘির দিকে মুখ করে চকবন্দি (চতুষ্কোণ আঙিনা ঘিরে নির্মিত গৃহসমষ্টি) নির্মাণ করেছেন। এখানে ৯৩০ হিজরি সালে একটি মসজিদ আছে। এটি পূর্বতন বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ নির্মাণ করেছিলেন।
জ্ঞানী হাওধার গৃহে খড়ের ছাউনি ও কাদামাটির প্রলেপে নির্মিত একটি মাদরাসা নির্মাণ করা হয়েছে। তার বহু অনুসারী ও ছাত্র সেখানে অধ্যয়নে নিয়োজিত। দিঘির পাড়ে কাঁঠাল ও আমগাছ সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। এখানের পরিবেশ খুবই শ্যামল, সজীব ও ছায়ানিবির। গ্রামের চারপাশের প্রান্তর সবুজে ঘেরা। জীবিকা নির্বাহের জন্য এ স্থানটি হাওধা মিয়াকে ‘মাদাদে-মাআশ’ হিসেবে দান করা হয়েছে। সত্যিই, এটি অত্যন্ত মনোরম স্থান। এই প্রদেশে আমরা এ স্থান ছাড়া ইসলামের স্নিগ্ধ আবহের বাহক এবং জনসমাগম ও কোলাহল থেকে মুক্ত অন্য কোনো জনপদ দেখিনি।
এই নির্জন আশ্রয়ের অধিবাসীরা কতই না সুখী! আর এই বনাঞ্চলের প্রবীণ বাসিন্দারা কতই না সৌভাগ্যবান—তাদের অন্য লোকের সঙ্গে কোনো সংস্রব নেই এবং অন্যদেরও তাদের সঙ্গে কোনো সংস্রব নেই। (A Description of North Bengal in 1609 A.D., বেঙ্গল পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট-১৯৩৫, পৃষ্ঠা : ১৫০)
বর্তমানে মসজিদটি বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত। মসজিদের পাশে থাকা অলি-আউলিয়াদের মাজারকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর ওরস আয়োজন করা হয়। প্রাচীনকাল থেকে ঈদ উপলক্ষে এখানে মেলার আয়োজন করা হয়।
কিন্তু মোগল কর্মচারী আবদুল লতিফ যে সুবিশাল মাদরাসা ও বিদ্যাপীঠের বর্ণনা দিয়েছেন, তার অস্তিত্ব এখন আর দেখা যায় না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


শাবিপ্রবি শিবিরের সভাপতি তুহিন, সেক্রেটারি মুজাহিদ