আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বাংলায় আরব মুসলিমদের বসতি ও স্থানীয় ঐতিহ্য

ড. তাওহিদুল ইসলাম

বাংলায় আরব মুসলিমদের বসতি ও স্থানীয় ঐতিহ্য

বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার জন্য আরব বণিকরা ধারাবাহিকভাবে মালাবার, সিলন, জাভা, সুমাত্রা, মালয়া এবং তাদের বাণিজ্যপথের অন্যান্য বহু বন্দরে বসতি স্থাপন করেছিলেন। কাজেই অনুমান করা যায় যে, আরব বণিকরা বাংলার উর্বর উপকূলীয় ভূমিতেও বসতি গড়ে তুলেছিলেন। কারণ তুলা, মসলা ও উৎকৃষ্ট আগর কাঠসহ বিভিন্ন ধরনের মূল্যবান সামগ্রী উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই অঞ্চল ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। যদিও এই প্রথমদিকের আরব বসতি স্থাপনের প্রশ্নটি এখনো পণ্ডিতসমাজে অমীমাংসিত ও বিতর্কিত বিষয়, তবু তাদের মধ্যে কেউ কেউ অষ্টম শতাব্দীতে উত্তরবঙ্গে আরব মুসলিম শাসনের অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। (Ali, Mehrab, Eksha Teish Hijrir Shilalipi (Inscription of 123 A.H.), Dinajpur Museum Series No. 4.)

ড. এনামুল হক ব্যাখ্যা করেছেন, “চট্টগ্রাম অঞ্চলে আরব মুসলিম বসতি স্থাপন করা ধীরে ধীরে এক সুসংগঠিত ও প্রভাবশালী সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছিল এবং ক্রমেই চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল নিয়ে একটি স্বাধীন রাজ্য গড়ে তুলেছিল। সেখানের মুসলিম রাজ্যের শাসকের উপাধি ছিল ‘সুলতান’।” (Haq, Muhammad, Enamul, Purba Pakistane Islam Prochar, (Dacca, 1948), p. -17. also see Arakan Rajsabhaya Bangala Sahitya, (ed. By Enamul Haq and Abdul karim, Calcutta, 1935), p.-13. )

বিজ্ঞাপন

ড. এনামুল হকের এই ব্যাখ্যা কয়েকটি আরাকানি বৃত্তান্ত ও রাজবংশের ইতিহাসবিষয়ক গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই বৃত্তান্ত ও গ্রন্থগুলোর একটিতে উল্লেখ আছে—রাজা Tsu la-Taing Tsan-da-ya (৯৫১-৯৫৭) Thu-ra-tan নামক এক ব্যক্তিকে পরাজিত করে Tset-ta-going (চট্টগ্রাম) (Journal of the Asiatic Society of Bengal, 1844, Vol. - 13, p. - 36.) দখল করেন এবং সেখানে একটি বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করেন। তার মতে, Thu-ra-tan শব্দটি মূলত আরবি ‘সুলতান’—যা শাসকের উপাধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এর আরাকানি রূপান্তর। এমএ রহিমও এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে বলেছেন, ‘Surtan হলো Sultan শব্দের আরাকানি বিকৃত রূপ।’ ( Rahim, M. A., Social and Cultural History of Bengal, Vol. -1, (1201-1576), (Karachi, 1963), p. - 44.) তবে মুসলিমদের সামরিক বিজয়ের আগে এ অঞ্চলে প্রাচীন আরব বসতি স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশের অবকাশ রয়েছে। (A. H. Dani, ‘Early Muslim Contact with Bengal’, The proceedings of the Pakistan History Conference, Karachi session, 1951)

আরাকানি বৃত্তান্তে উল্লিখিত এই কাহিনি ছাড়াও চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থানও মুসলিমদের সামরিক বিজয়ের আগে এ অঞ্চলে আরব বসতি স্থাপনের তত্ত্বকে সমর্থন করে; কারণ এই অঞ্চল গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা—এই তিন প্রধান নদীর সম্মিলিত প্রবাহে গঠিত উপসাগরের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত। চট্টগ্রামের স্থানীয় উপভাষায় বিপুল পরিমাণ আরবি শব্দ ও বাক্যাংশের সংমিশ্রণও এই তত্ত্বকে শক্তিশালী করে। উপরন্তু, চট্টগ্রামের অপর নাম ‘চিটাগাং’ও আরবি উৎসজাত বলে ধারণা করা হয়। সম্ভবত আরব বণিকরা একে আরবিতে ‘শাতু-গঙ্গা’ নামে অভিহিত করতেন, যার অর্থ গঙ্গার তীর বা উপত্যকা। এই নামটি ক্রমে স্থানীয় ভাষায় প্রবেশ করে ‘চাটগাঁও’-এ পরিবর্তিত হয়, যাকে ইবন বতুতা ‘সাদকাওয়ান’ নামে উল্লেখ করেছেন। (Gibb, H.A.R., Ibn Batuta, (London, 1929), p.—267.) পরবর্তীকালে তা ‘চট্টগ্রাম’ রূপ ধারণ করে। চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষার বহু শব্দভান্ডার হয় বিশুদ্ধ আরবি, নয়তো আরবি শব্দমূল থেকে উদ্ভূত। চট্টগ্রামের উপভাষায় আরবি ভাষার প্রভাবও এক আকর্ষণীয় গবেষণার বিষয় হতে পারে। এই অঞ্চলে বহু স্থানের নাম ও ব্যক্তি নামেও আরবি প্রভাব দেখা হয়। বহু সামাজিক রীতিনীতিও এখনো আরব-ঐতিহ্যের ছাপ বহন করে। স্থানীয় সমাজে এই গভীর আরবীয়করণ শুধু দীর্ঘকাল ধরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আরব অধিবাসীর সঙ্গে নিবিড় ও অব্যাহত যোগাযোগের ফলেই সম্ভব হয়েছে। (Haq, Muhammad, Enamul, Purba Pakistane Islam Prochar, (Dacca, 1948), p. -19.)

পরে যুগের পর্যটকরাও এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। ১৫১৮ খ্রিষ্টাব্দে আগত পরিব্রাজক পর্তুগিজ বারবোসাও বন্দর নগরটিতে প্রধানত আরব মুসলমান ও অন্যান্য বণিকে পরিপূর্ণ দেখতে পান; তারা করোমণ্ডল, মালাবার, কাম্বে, পেগু, সুমাত্রা, মালাক্কা, সিলন প্রভৃতি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলের সঙ্গে সমৃদ্ধ বাণিজ্য পরিচালনা করতে। (Purchas, S., Hakluytus Posthumas or Purchas His pilgrims, Vol.-1, (Glasgow, 1906), pp.– 144-145.) এ ধরনের বসতি স্থাপনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, বাণিজ্য সুরক্ষা ও বাণিজ্য পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা।

ব্যবসা তদারক করা, পণ্যের নিরাপত্তা দেওয়া, পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আরব ও স্থানীয় বণিকদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য আরব বণিকদের কয়েকজন প্রতিনিধির জন্য বন্দর বা বাণিজ্য কেন্দ্রের কাছে স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করার প্রয়োজন ছিল। কখনো কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে জাহাজডুবিও ঘটত এবং জীবিতরা উপকূলবর্তী নিকটবর্তী ভূখণ্ডে আশ্রয় নিতে বাধ্য হতো। আরাকানের এক বৃত্তান্তে উল্লেখ আছে, আরাকান উপকূলে জাহাজডুবির পর কয়েকজন আরবকে রাজা Ma-ba-toing (৭৮০-৮১০) সেখানে বসতি স্থাপনের অনুমতি দেন। (Journal of the Asiatic Society of Bengal, 1844, Vol. - 13, p.-36.)

তৎকালীন বাংলার সামাজিক অবস্থাও আরব মুসলিমদের বসতি স্থাপনের পক্ষে অনুকূল ছিল। সেন শাসকরা মূলত দক্ষিণ ভারত থেকে আগত; তারা স্থানীয় বৌদ্ধ পাল শাসকদের পরাজিত করে বাংলায় নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। পরে তারা কঠোর জাতিভেদ ও সতীদাহপ্রথার অনসারী এক ধরনের গোঁড়া হিন্দুধর্ম প্রবর্তন করেন। তখন সমাজে প্রায় ১০০ জাতি ও উপজাতি বিদ্যমান ছিল, যাদের মধ্যে সামাজিক মেলামেশা নিষিদ্ধ ছিল। নিম্নবর্ণের হিন্দুরা উচ্চবর্ণের দ্বারা নিপীড়িত ছিল, তারা পরস্পরের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারত না, একত্রে আহার করতে পারত না এবং পেশা পরিবর্তনের অধিকারও তাদের ছিল না। এমনকি নিম্নশ্রেণির হিন্দুদের শহরে প্রবেশের অনুমতিও ছিল না।

অন্যদিকে বৌদ্ধধর্মও অবক্ষয়ের সম্মুখীন হয়েছিল। নানা কারণে এ অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব কমে গিয়েছিল এবং এর অনেক আচার ও প্রথা হিন্দু ধর্মের ভেতরে একীভূত হয়ে গিয়েছিল। বুদ্ধকে এক ঐশ্বরিক সত্তায় উন্নীত করার মধ্য দিয়ে গৌতম বুদ্ধের সরল শিক্ষার হিন্দুকরণ প্রতিফলিত হয়েছিল। ভাস্কর্য শিল্পে তাকে হিন্দু দেবমণ্ডলের দেবতাদের পরিবেষ্টিত অবস্থায় উপস্থাপন করা হতে থাকে। পরবর্তীকালে বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার হিসেবেও দেখানো হয়। (Edwards, Micle, A History of India, (1967), p. - 29.) তারপরও বৌদ্ধরা সেন শাসকদের নিপীড়নের হাত থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। ইসলাম বিস্তারের সামাজিক পটভূমি আলোচনা করতে গিয়ে এমএন রায় একে আরো সুন্দরভাবে ব্যক্ত করেছেন, ‘স্পষ্টতই সমাজ তখন এমন ভাঙনগ্রস্ত ও বিশৃঙ্খল অবস্থায় উপনীত হয়েছিল যে, সর্বাধিক সুবিধাভোগী শ্রেণির অবস্থানও নিরাপদ ছিল না। সাধারণত প্রতি-বিপ্লবের পরিণতি এমনই হয়। একটি বিপ্লব নানা শক্তির সম্মিলিত আঘাতে পরাজিত হতে পারে; কিন্তু তাতে বিজয়ী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলো যে সব সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল সেগুলো প্রতিহত করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। ভারতে বৌদ্ধ-বিপ্লব পরাজিত হয়নি; বরং তার অন্তর্নিহিত দুর্বলতার কারণেই তা নিজেকে টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল। তাদের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিপ্লবকে বিজয়ের পথে নিয়ে যাওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না। ফলত, বৌদ্ধধর্মের পতনের পর দেশ আরো গভীর অর্থনৈতিক অনাচার, রাজনৈতিক নিপীড়ন, বৌদ্ধিক নৈরাজ্য ও আধ্যাত্মিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিমজ্জিত হয়। কার্যত পুরো সমাজই এই করুণ অবক্ষয় ও ভাঙনের প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়েছিল।

এ কারণেই শুধু নিপীড়িত জনসাধারণই সামাজিক সমতার আশ্বাসদানকারী ইসলামের পতাকার নিচে সমবেত হয়নি (যদিও রাজনৈতিক সমতা সেখানে নিশ্চিত ছিল না); স্বার্থপর উদ্দেশ্যে উচ্চবর্ণের লোকরাও “বিদেশি আক্রমণকারী’র সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিল। এতে প্রমাণ হয়, যেখানে সাধারণ মানুষ ছিল চরম হতাশা, সেখানে উচ্চশ্রেণি সম্পূর্ণভাবে নৈতিকভাবে অবক্ষয়ে জড়িয়ে পড়েছিল। …যাই হোক, এতটুকু স্পষ্ট যে ‘মোহাম্মদান’ বিজয়ের সময় ভারতে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস করত, যাদের হিন্দু আইন ও ব্রাহ্মণ্য প্রথার প্রতি অনুগত থাকার বিশেষ কোনো কারণ ছিল না এবং তারা বিজয়ী হিন্দুদের অত্যাচার থেকে রক্ষার আশ্বাসদাতা ইসলামের তুলনামূলকভাবে ন্যায়সংগত বিধানের জন্য নিজেদের ধর্ম পরিত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিল।” (Roy, M. N., The Historical Role of Islam, (Delhi, 1981), pp.–82-84)

মুসলমানদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত সামাজিক সমতা বাংলার স্থানীয় জনগণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। কখনো কখনো আরব মুসলিম ব্যবসায়ীরা ধর্মান্তরিত স্থানীয় মেয়েদের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করত। হিন্দু সমাজে সতীদাহপ্রথার প্রচলন এবং বিধবা বিয়ে নিষিদ্ধ ছিল, অথচ ইসলামে বিধবা বিয়ে উৎসাহিত করা হতো এবং সতীদাহের মতো কোনো প্রথাই ছিল না। ইসলামের এই সামাজিক সাম্য, ন্যায়বিচার ও সরলতার প্রভাবে হিন্দু ও বৌদ্ধরা—বিশেষত হিন্দু সমাজের নিম্নবর্গরা, আরব মুসলমানদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে ধর্মান্তরিত হয়ে স্বেচ্ছায় ইসলামের ছায়াতলে সমবেত হতে থাকে। (Khan, Mohammad, Akram, Moslem Bhonger Samajik Itihash, (Dacca, 1965), p.-83. ) এই ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক অনুকূল পরিবেশ পেয়ে আরব মুসলিম ব্যবসায়ীরাও এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে আগ্রহী হয়েছিল। অন্যদিকে, মরুভূমিপ্রধান ভূখণ্ড থেকে আগত আরব ব্যবসায়ীরা বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেও বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়েছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পর তৎকালীন আরবদের অনন্য একটি বৈশিষ্ট্য ছিল যে, তারা যেখানেই যেতেন এবং যখনই যেতেন, ইসলামের বার্তা সঙ্গে নিয়ে যেতেন। ফলে আরব ব্যবসায়ী ও বসতি স্থাপনকারীরাও বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলের অধিবাসীদের কাছে ইসলামের নতুন বার্তা পৌঁছে দেয়। তবে তাদের পেশাগত ও প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অন্যান্য স্থান ও দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের নিরাপত্তা ও সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা।

অনুবাদ : আনিকা মাহমুদ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

বিষয়:

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...