মুকাদ্দিমা
৩৬ জুলাই কি বর্ষাবিপ্লবের শুরু ছিল, নাকি, যেমন অনেক শাহবাগি বুদ্ধিজীবী বলতেসেন, এইটা ছিল বিদেশি অর্থায়নে পুষ্ট ছাপড়িদের কমান্ডে বস্তি বিদ্রোহের চূড়ান্ত পরিণতি? আর বুদ্ধিজীবী মানেই বাই ডিফল্ট ‘শাহবাগি’ কেন আমাদের মুল্লুকে? কারণ, ‘শাহবাগ = মুক্তিযুদ্ধের চেতনা + বাঙালি জাতীয়তাবাদ’।
আমরা সম্প্রতি দেখসি, ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ কীভাবে জুলাইয়ের রাজপথের গেরিলাদের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করসে। কীভাবে? অনেকভাবেই। প্রাসঙ্গিকটা বলি, ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ আওয়ামী প্যারাডাইম ও ‘শাহবাগ’-কে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করসে।
এখন, শাহবাগ আসলে কী? শাহবাগ = মুক্তিযুদ্ধের চেতনা + বাঙালি জাতীয়তাবাদ! এই শাহবাগকে এস্থেটিকাইজ করে কালচারে না আনলে ফ্যাসিবাদ কখনো পোটেন্ট হবে না। এই এস্থেটিক ও কালচারকে গায়ের জোরে পরাজিত করা যায় না। আওয়ামী লীগকে পরাজিত করা যায় গায়ের জোরে, শাহবাগকে যায় না। শাহবাগকে পরাজিত করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা + বাঙালি জাতীয়তাবাদের পাল্টা রাজনীতি আর্টিকুলেট করতে হবে; এই রাজনীতিকে এস্থেটিকাইজ করে উন্নত কালচারে পরিণত করতে হবে। হবেই।
‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ হওয়া উচিত ছিল শাহবাগ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা + বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে ৩৬ জুলাইয়ের রাজনীতির বজ্র নির্ঘোষ।
পয়লা দফা আমরা একটা পয়েন্টে পরিষ্কার হইÑআওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে অপসারণ ইনসাফের জন্য ছাত্র-জনতার ইনকিলাবের একটি পর্যায়। পরবর্তী পর্যায় হলো ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিলোপ করা। তারপর বাঙ্গালার ইনকিলাবি জনগণের জজবা জাহেরের তৌফিক আছে এমন একটা সর্বজনীন ইনসাফের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
রাষ্ট্রের গোড়া পত্তন করে যে সংবিধান, সেইটা রেখে যে কোনো সংস্কার বা সংশোধন এই খুনে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকে বহাল রাখবে। মানে, খুনে রাষ্ট্রের খুন করা বা লুট করা তাতে বন্ধ হবে না। মানে, যতদিন এই সংবিধান ও রাষ্ট্র থাকবে, ততদিন নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসলেও বিএনপি ও অন্যান্য দলের লাখ লাখ কর্মীর অন্যায্য মামলার সঠিক সুরাহা হবে না, আমার স্বাধীন দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি হয়ে থাকবে ফ্যাসিস্ট। আমাদের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আলাদা করাও নামুমকিন হয়ে থাকবে। কিন্তু এইগুলো সবই মুট পয়েন্ট, এক অর্থে।
আসল কথা হলো, বাংলাদেশে একটা রেনেসাঁ ঘটতেসিল গত কয়েক বছর ধরে। এই নবজাগরণ, নব উন্মেষের একটা বিস্ফোরণ আমরা দেখসি রাজপথে। শাপলা-শাহবাগের বিভাজনের যে ক্ষত, তার অপূর্ব শুশ্রূষা আমরা দেখসি, মৃত্যুর দামে কিনসে বীর ছাত্র-জনতা। অশ্রুতে, খুনে, মিছিলে, মৃত্যুতে ও শৌর্যে-বীর্যে এই মাটির সন্তানদের ইচ্ছার ইশতেহার ঘোষিত হইসে বজ্র নির্ঘোষে। মনে রাখবেন, ইচ্ছার ইশতেহার শুধু আমাদের না, এই আরমান, এই তামান্না, দুঃখে, ক্ষুধায়, মড়কে ও মৃত্যুতে বিদীর্ণ হয়ে যাওয়া এই গাঙ্গেয় বদ্বীপে হাজার বছর ধরে হালের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই চাষার, যার দীর্ঘশ্বাস আমাদের রক্তে উথাল-পাথাল করসে; এই আরমান, এই তামান্না, মজনু শাহ, হাজী শরীয়তুল্লাহ, বাঘাই পীর ও কোটি মুজাহিদের আমানত।
এই ইচ্ছা, এই বাসনা, এই ঘোষণা নূতন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বুনিয়াদ। এই ইচ্ছা, এই বাসনা, এই ঘোষণা কীভাবে স্থান পাবে নূতন সংবিধানে? নূতন রাষ্ট্রে? এই বিপ্লবের ফসল কি আমরা ঘরে তুলব, নাকি আবার বর্গি এসে লুটে নেবে আমাদের ইশ্ক-ইজ্জত-আমানত?
এর খুব সহজ, স্বীকৃত ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিতকরণ আছে এই বিপ্লবের ফসল ঘরে তোলার, জনগণের ছতর ছিন্ন করে জাগা তামান্না থেকে নয়া রাষ্ট্র তৈরির, উপনিবেশমুক্ত প্রতিষ্ঠান তৈরির।
২.
আজাদির তামান্নায়, আমরা এই থিসিসকে সমর্পণ করতেসি সেই সকল শহীদের প্রতি যাঁরা ৩৬ জুলাইয়ে নিজেদের রক্ত দিয়ে নূতন বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করসেন।
তাঁদের শাহাদাত শুধু মৃত্যু নয়—এ হইতেসে এক নূতন জীবনের সূচনা, এক নূতন সভ্যতার উন্মেষ।
আবু সাঈদের প্রসারিত হাত আমাদের শিখাইসে যে প্রতিরোধ শুধু শক্তি দিয়ে হয় না, হয় আত্মত্যাগ দিয়ে। মুগ্ধর নিঃশব্দ শাহাদাত, আবরারের অকুতোভয় সাহস, ফারজানার অটুট দৃঢ়তা—এসব শুধু ঘটনা নয়, এসব হলো এক নূতন নাফাক্বাতুল হাইওয়ানের জন্ম, যেখানে প্রাণ ও আত্মা একসূত্রে গাঁথা।
হাক্কুল এবাদ—বান্দার অধিকার—এই দাবি ৩৬ জুলাইয়ের কেন্দ্রীয় বার্তা। আমরা শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন চাই না, আমরা চাই এক নৈতিক বিপ্লব, যেখানে প্রতিটি মানুষের মর্যাদা, প্রতিটি বান্দার ইনসাফ এবং প্রতিটি মজলুমের অধিকার স্বীকৃত হবে। এ শুধু রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিবর্তন নয়, এ হলো মনের রূপান্তর, চেতনার জাগরণ, সত্তার পুনর্নির্মাণ।
আজমাইশ—এই শব্দটি আমাদের মনে করায় যে, ৩৬ জুলাই শুধু বিজয় নয়, এ হলো এক দীর্ঘ আজমাইশের সূচনা। আমরা কি পারব এই শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে? আমরা কি পারব তাঁদের রক্তের ঋণ শোধ করতে? আমরা কি পারব এই বিপ্লবের প্রকৃত ফসল ঘরে তুলতে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ভর করবে আমাদের নুফুস-এ-জিহাদি: জিহাদি আত্মার ওপর।
জশন (উৎসব) শব্দটি আমরা ব্যবহার করসি, কারণ ৩৬ জুলাই শুধু শোক নয়, এ হলো এক মহাজাগরণের জশন, এক সভ্যতাগত রেনেসাঁ-উৎসব। যেমন কারবালার পরে প্রতি বছর মুহররমে আমরা হুসাইনের শাহাদাত স্মরণ করি শোক ও গর্ব উভয় সঙ্গে নিয়ে, কারণ সেই শাহাদাত ইসলামকে জীবিত রাখসে; তেমনি ৩৬ জুলাই আমাদের জন্য হবে এক বার্ষিক জশন, যেখানে আমরা স্মরণ করব সেই বীরদের, যারা বাঙালি মুসলিম গাইস্টকে পুনর্জাগরিত করসেন।
‘কতলে হুসাইন দর হাকিকত মারগে ইয়াজিদ বুদ,
ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কি বাদ...’
এই শের আমাদের মনে করায় যে, হুসাইনের হত্যা আসলে ছিল ইয়াজিদের মৃত্যু এবং প্রতিটি কারবালার পর ইসলাম নূতন করে জীবিত হয়। তেমনি ৩৬ জুলাইয়ের প্রতিটি শাহাদাত আসলে ফ্যাসিবাদের মৃত্যু এবং প্রতিটি আবু সাঈদের রক্ত নূতন করে জাগায় বাঙালি মুসলিম গাইস্টকে।
মুমলিকাত-এ-খুদাদাত—খোদাপ্রদত্ত রাজ্য—এই ধারণা আমাদের মনে করায় যে, বাংলাদেশ শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, এ হলো খোদার এক আমানত, যা আমাদের দায়িত্ব রক্ষা করা এবং ইনসাফ দিয়ে পূর্ণ করা। এই মাটির প্রতিটি কণা, এই নদীর প্রতিটি বুঁদ, এই আকাশের প্রতিটি তারা সাক্ষী থাকবে—আমরা কি এই আমানত রক্ষা করতে পারলাম?
এই প্রশ্ন আমাদের জাগিয়ে রাখবে; আমাদের সচেতন রাখবে।
কারণ ক্ষমতা শুধু দখল করা নয়, ক্ষমতা হলো দায়িত্ব—হাক্কুল এবাদ আদায়ের দায়িত্ব, ইনসাফ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব, জুলমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দায়িত্ব।
ডিকলোনিয়াল ও উপনিবেশোত্তর মাসালা কি ফ্যাসিবাদের একই নিদান নিঃসৃত করে মাহরুফ হয়? এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। উপনিবেশমুক্তি ও উপনিবেশোত্তর তত্ত্ব যদি শুধু পশ্চিমা ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে থেকে কাজ করে, তাহলে তা নূতন ফ্যাসিবাদের জন্ম দিতে পারে। আমাদের দরকার এমন এক তত্ত্ব, যা আমাদের নিজস্ব তুরাছ থেকে উৎসারিত, যা আমাদের নিজস্ব কালিমাতুল হিকমাহ—প্রজ্ঞার বাণী থেকে পুষ্ট। শহীদের খুন ও মিছিলের সিয়াসাত যে ইনকিলাবের এজাহার এলান করল, আমাদের তত্ত্ব সেই বরকতের বারাকাহ বুকে নিয়ে, ক্ষমতার বাসরে বুলন্দ হইতে হবে ও সর্বোপরি বিপ্লবকে সম্পন্ন করতে হবে, নাইলে সকলই গরল ভেল।
ইলিয়াস শাহের ‘শাহ-ই-বাঙালাহ’ থেকে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ—এই হলো আমাদের সিলসিলাহ, যা সবসময় নূতন করে জেগে ওঠে। বালাকোটের শাহাদাত থেকে ৩৬ জুলাইয়ের শাহাদাত, এই হলো আমাদের কৌমের বুকে, নূতন অর্থ নিয়ে ফিরে ফিরে আসা বিলম্বিত আঘাত, যা অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে এসে নূতন অর্থ পায় এবং ভবিষ্যতের পথ দেখায়।
এই থিসিস সেই পথের একটি মাইলফলক হইতে চায়।
৩.
এই থিসিস একটা দ্বৈত দায়িত্ব পালনের প্রয়াস—যা বর্ষা বিপ্লবের কোনো ঘটনা বা সাধারণ অর্থে ইতিহাসও বর্ণনা করে না, হিস্টোরিওগ্রাফি অন্তর্নিহিত রুহকে উন্মোচিত করে এক নূতন ভাষা, এক নূতন তত্ত্বীয় কাঠামো গড়ে তোলে; বর্ষা বিপ্লবকে তত্ত্বায়ন করে; ইতিহাস রচনার উপযুক্ত দার্শনিক পাটাতন নির্মাণে সচেষ্ট হয়।
এর একমাত্র কারণ সেই জ্ঞানতাত্ত্বিক রূপান্তর, যা কোনো বিপ্লবকে সম্পূর্ণ করে—যেখানে আমরা ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাণ্ডের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্ত হই, যেখানে আমরা নিজেদের দেখি অন্যদের চোখ দিয়ে নয়, বরং নিজস্ব গাইস্টের আয়নায়।
এই থিসিস ৩৬ জুলাইকে ধরতে চায় সিভিলাইজেশনাল/সভ্যতাগত উত্থানপর্ব হিসেবে, যেখানে বাঙালি মুসলিম গাইস্ট নিজেকে পুনরাবিষ্কার করসে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কার্যত একটি রেজিমের পরিবর্তন হইলেও যে জ্ঞানতাত্ত্বিক রূপান্তর ছাড়া কোনো বিপ্লব পূর্ণতা লাভ করে না, সেই রূপান্তর এখনো অসম্পূর্ণ।
৩৬ জুলাই কী?
বর্ষাবিপ্লব শুধু একটা রাজনৈতিক ঘটনা নয়—এটি এক প্রচণ্ড ঐতিহ্যবাদী অভ্যুত্থান, যা লিব্র্যাল উদার আধুনিকতার ভাষায় ‘গণতান্ত্রিক রূপান্তর’ বা ‘স্বৈরাচারবিরোধী প্রতিবাদ’ বলে সীমাবদ্ধ করা যায় না। এর তিন মৌলিক চরিত্র এটিকে আলাদা কইরা দেয়Ñ
প্রথমত, সামষ্টিক রুহানি জাগরণ, যা হাইডেগারের মিটজাইনের মতো হলেও ধর্মনিরপেক্ষ সমতল সংহতি নয়, বরং এক উল্লম্ব পারলৌকিক সংযোগ যা জীবিত-মৃত, বর্তমান-অতীত ও ইহলৌকিক-পারলৌকিককে সংযুক্ত করসে।
দ্বিতীয়ত, শাহাদাত-প্রস্তুতি, যা জর্জিও আগাম্বেনের হোমো সাকের ধারণার বিপরীতে আবু সাঈদের প্রসারিত হাতে যাপিত হইসে; এই যাপন সর্বজনীন আত্মসমর্পণ ও একই সঙ্গে অনমনীয় প্রতিরোধের প্রতীক, যা অন্তিমে হইয়া উঠল চূড়ান্ত প্রতিরোধ এবং যা আমাদের মনসুন অভ্যুত্থানকে রুহানি উন্মেষে পরিণত করসে।
তৃতীয়ত, তার আর্কিপেলাগিক বা চিন্তার দ্বীপমালাসদৃশ গঠন, যা এডুয়ার গ্লিসঁর চিন্তার মডেল অনুসারে, চিন্তা ও প্রতিরোধের বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলোকে এক অদৃশ্য সিলসিলায় বাঁধে; দুনিয়াজোড়া ঐতিহ্যবাদী আন্দোলনের এই গঠনই, খোদার দুনিয়ায়, নয়া উদারবাদের মৃত্যুঘণ্টা বাজাইয়া আমেরিকান শতাব্দী ও আধিপত্যের শেষ প্রহর ঘোষণা করসে।
এখন বিপ্লবীরা দাবি করতেসেন, পশ্চিমের জ্ঞানোদয় থেকে বাহির হয়ে আসা ধর্মনিরপেক্ষতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, প্রগতি ও সর্বজনীনতার একচেটিয়া মানদণ্ড এবং বিশ্বায়নের কফিনে শেষ পেরেক বসবে। বিভিন্ন জাতির বিভিন্ন জাতিগত ঐতিহ্য, ধর্ম ও তালাল আসাদ যাকে বলেন কথোপকথনমূলক তুরাছ—তাই-ই হবে নূতন সময়ের দিশারি, পথপ্রদর্শক।
বিশ্ব রাজনীতিতে ঐতিহ্যবাদী মোড় নিজের উপস্থিতি এই বিজয়ে আনুষ্ঠানিক করসে এবং আমরা বলতেসি, এই ঐতিহ্যবাদী বিপ্লবে নেতৃত্ব দেবে মুসলিম উম্মাহ, ইনশাআল্লাহ।
এই ঐতিহ্যবাদী বিপ্লব চাইনিজ হান ও আরবদের পরে জগতের তৃতীয় বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী হিসেবে বাঙালি মহাজাতির উত্থানপর্বের সূচনাও কি তাহলে রচনা করে নাই? অবশ্য এই ঐতিহ্যবাদী মোড়ের প্রেক্ষাপট তৈরি হইতেসে এই শতাব্দীর শুরু থেকেই। কিন্তু আমাদের যে এই নূতনের উদ্বোধন হইল, তাকে বালেগ করার কাবিলিয়ত কোথায় লাশতান্ত্রিকদের কাছে? নফস-এ-জিহাদের কালিমাতুল হিকমাহ কোথায় তাদের শাহওয়াতে ক্ষয়ে যাওয়া আঙুলে? মুমলিকাত-এ-খুদাদাতকে পথ দেখাবার পিলসুজ কোথায় লাশতান্ত্রিকদের অশিক্ষিত, অপরিশীলিত ও অসংলগ্ন অভিজ্ঞানে?
৩৬ জুলাই : আধুনিকতার একচেটিয়া দাবির প্রত্যাখ্যান এবং উৎসের দিকে ফিরে যাওয়া এক সৃজনশীল পুনরুদ্ধার, যা ঐতিহ্যকে পুনরায় সক্রিয় করে।
৩৬ জুলাই : এক খাঁটি রুহানী উন্মেষ, যা শাহবাগের ‘রাজাকার’/‘যুদ্ধাপরাধী’ শ্রেণীকরণ অতিক্রম করে ঐতিহাসিক সত্যের দিকে ফিরে আসে।
কেন ৩৬ জুলাই?
১৯৪৭-১৯৭১, যাকে আমরা প্রায়ই বাঙালি মুসলিম রাজনৈতিক চেতনার শিখর মনে করি, কিন্তু, আসলে, ১৯৪৭-১৯৭১ কি ছিল না আমাদের মূল সিলসিলা থেকে এক বিচ্যুতি? মুসলিম কীভাবে বাঙালি হতে পারে? ভারতীয় উপমহাদেশের জগৎদৃষ্টিতে বাঙালি মুসলিমের রাজনৈতিক অন্টোলজি ও সত্তা কি?
এক জাতি তত্ত্বের সঙ্গে বাঙালি মুসলিমের বিশেষ পরিচয়ের সম্পর্ক কী? এই প্রশ্নগুলো পাকিস্তান কাঠামোতে সমাধান-অযোগ্য ছিল, কারণ পাকিস্তান প্রকল্প ছিল এক ঔপনিবেশিক সমাধান এক দেশীয় সমস্যার জন্য।
পাকিস্তান প্রকল্পের তিন মৌলিক দ্বন্দ্ব ছিল। প্রথমত, ধর্মীয় সর্বজনীনতা বনাম জাতিগত বিশেষত্ব (জিন্নাহর ১১ আগস্ট ১৯৪৭ ভাষণে উদার ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ‘মুসলিম রাষ্ট্র’-এর অসংগতি)।
দ্বিতীয়ত, ওয়েস্টফ্যালিয়ান রাষ্ট্রব্যবস্থা বনাম ইসলামি রাজনৈতিক সত্তাতত্ত্ব (তালাল আসাদের ধর্মনিরপেক্ষতার গঠনসমূহের মতো, যেখানে দীন প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত ক্ষেত্রকে আলাদা করে না)।
তৃতীয়ত, উর্দু সাম্রাজ্যবাদ যা বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয় হত্যার চেষ্টা।
হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান—বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’-এ সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে মুসলিমবিরোধী হিন্দু জাগরণ হিসেবে উপস্থাপন, ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন, সাভারকরের ‘হিন্দুত্ব’ (১৯২৩), যেখানে মুসলমান ‘বিদেশি’, গোলওয়ালকরের ‘আমরা অথবা আমাদের জাতিত্ব সংজ্ঞায়িত’ (১৯৩৯)-এ হিটলারের ইহুদি নির্মূলকে উদাহরণ—এই সব হেগেলের প্রভু-দাস দ্বান্দ্বিকতার একতরফা রূপ, যা মুসলমানকে ‘অপর’ বানাইয়া হিন্দু আত্মচেতনা গড়সে। কংগ্রেসের ‘অসাম্প্রদায়িক’ ১৯২৮-এর নেহরু রিপোর্টে মুসলিমদের জন্য কোনো পৃথক নির্বাচন বা আসন সংরক্ষণ না দিয়ে, ১৯৩৭-এর নির্বাচনে উত্তর প্রদেশে যৌথ সরকার গঠন না করে, বন্দেমাতরম জোর করে গাইতে বাধ্য করে—এসব মুসলিমদের উপর ঘটসে।
শেরে বাংলা ফজলুল হক নেহরুকে সতর্ক করসিলেন: ‘‘কংগ্রেসের নীতির দরুন এমন এক অবস্থা সৃষ্টি হইসে, যেখানে হিন্দুরা মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে চাইতেসে।” ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাবে ‘রাষ্ট্রসমূহ’ (বহুবচন) থেকে জিন্নাহর একবচনকরণে প্রথম বিশ্বাসঘাতকতার বীজ রোপিত হইসে, যা ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রমাণিত হইসে।
এই থিসিসের তাত্ত্বিক ব্রেক থ্রু
এই থিসিস প্রথমবার ৩৬ জুলাইকে তত্ত্বায়িত করতেসে এবং বাঙালি মুসলিমের সত্তাতত্ত্ব ও আকারকে প্রকাশ করতেসে, যেখানে ১৯৪৭ ও ১৯৭১ কোনো শিখর নয়, বরং মূল ঐতিহ্যবাদী সিলসিলার এক বিচ্যুতি; এই থিসিস আমাদের ইতিহাসবোধকে পুনর্নির্মাণ করে, শাহবাগের মতো ধর্মনিরপেক্ষ-জাতীয়তাবাদী কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে, যা ১৯৭১-কে দলীয় রাজনীতিতে হাইজ্যাক করসে।
এই তত্ত্বায়ন কীভাবে করতেসি?
সাতটি দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মূল তাত্ত্বিক পাটাতন, যার মধ্যে হেগেল, রনে গেনোঁ, ফুকো এবং হাইডেগার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণÑ
প্রথমত, হেগেলের চেতনার বর্ণনাতত্ত্বের দ্বান্দ্বিক উল্লম্ফন দিয়ে স্লোগানের উল্টোনো—‘তুমি কে আমি কে—রাজাকার রাজাকার’—ব্যাখ্যা, যা দাসকে প্রভু বানাইসে।
দ্বিতীয়ত, হাইডেগারের ডাজাইন ও মিটজাইন দিয়ে সামষ্টিক জাগরণের সত্তাতাত্ত্বিক গভীরতা উন্মোচন, যা লাখো মানুষকে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনিতে রাস্তা কাঁপাতে উদ্বুদ্ধ করসে।
তৃতীয়ত, ফুকোর বিষয়সমূহের ব্যবস্থার জ্ঞানমীমাংসা দিয়ে উদার-ফ্যাসিবাদী আধুনিকতার পুরোনো দৃষ্টান্তকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া।
চতুর্থত, তালাল আসাদের ধর্মনিরপেক্ষতার গঠনসমূহের কথোপকথনমূলক তুরাছ দিয়ে ঐতিহ্যের জীবন্ত কথোপকথন, যা ইসলামি বিশ্বজনীনতা ও স্থানীয় বাঙালি সংস্কৃতির সমন্বয়মূলক গঠনকে পুনর্বিন্যাস করে দেওয়া।
পঞ্চমত, আগাম্বেনের হোমো সাকের ও লাশতান্ত্রিক মৃত্যুরাজনীতি দিয়ে মৃত্যুর সার্বভৌমত্ব, যা আশিল মেম্বের লাশতান্ত্রিক মৃত্যুরাজনীতির মতো ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের নিঃশেষযোগ্য জীবনকে চ্যালেঞ্জ করসে।
ষষ্ঠত, কুনের দৃষ্টান্ত পরিবর্তন দিয়ে সভ্যতাগত ছেদবিন্দু, যা প্রস্তর যুগের শেষ ও ধাতু যুগের সূচনা চিহ্নিত করসে।
এবং সপ্তমত, রনে গেনোঁর ঐতিহ্যবাদ দিয়ে আধুনিকতার প্রত্যাখ্যান, যা শাহাব আহমেদের ইসলাম কী?-এর মতো ইসলামকে এক অর্থপূর্ণ প্রত্যাদেশের ধারণার সঙ্গে সংলাপ হিসেবে দেখায়।
এই বর্গমুদ্রা ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিগুলো আমরা ব্যবহার করসি শুধু তাদের ভাষায় নয়, বাংলা ভাষায়, বাঙালি মুসলিম চিন্তা ও যাপনের প্রেক্ষণীতে এনে ।
কেন এত আয়োজন করতে হইল? লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন আমাদের সতর্ক করে দিসিলেন যে, ‘আমার ভাষার সীমা হইতেসে আমার জগতের সীমা’Ñআমরা চাই নাই উদারনৈতিক লিব্র্যালিজমের তাত্ত্বিকতার অর্গলে গ্রেপ্তার হয়ে যেতে, বা ৩৬ জুলাইকে উদারনৈতিক লিব্র্যালিজমের ভাষায় বোধগম্য করতে গিয়ে, ওই মাপে এই প্রচণ্ড, উচ্ছ্বাসী, সন্ত্রাসী ও অনৈতিহাসিক ঘটনাকে কেটে ছোট করে ফেলতে। আমাদের ৩৬ জুলাইকে বুঝতে ততটুকু ভাষাকে বিস্তৃত করতে হইসে, যতটুক হইলে আমাদের ভাষার সীমা আমাদের উদারনৈতিক লিব্র্যাল জগতের সীমা হয়েই ফুরিয়ে না যায়।
কেন তত্ত্বায়ন করতেসি?
কারণ, যে ভাষায় আমরা এক ঘটনা বর্ণনা করি, সেই ভাষাই নির্ধারণ করে আমরা কী দেখি এবং কী দেখি না। ৩৬ জুলাই বুঝতে উদারনৈতিক লিব্র্যাল বর্ণনামূলক বিবরণ ও ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়; কারণ, এটি শুধু বাস্তবতার উপরিতলের ঘটনা ধরে, কিন্তু তার গভীরতা ক্যাপচার করতে পারে না ।
আমরা তত্ত্বায়ন করতেসি বর্ণনা থেকে নির্দেশনার দিকে যাত্রা করতে—এক নূতন ভাষা তৈরি করে যা ৩৬ জুলাইয়ের প্রকৃত চরিত্র ধরবে এবং ভবিষ্যতের পথ দেখাবে।
এটি এক কঠোর কিন্তু প্রোথিত প্রক্রিয়া, যা আমাদের ঐতিহ্যের শিকড়ে নিবেদিত। আমরা এই অভ্যুত্থানকে অধস্তন ইতিহাস রচনার লেন্সে দেখতেসি, যাতে তার রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব উন্মোচিত হয়।
এই তত্ত্বায়নের মূলে রইসে সময়ের রাজনীতি বা ক্রোনোপোলিটিক্স, যা বিশেষ করে আমাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক।
ওয়াল্টার বেনজামিনের ‘সহিংসতার সমালোচনা’য় পৌরাণিক সহিংসতা—আইন-প্রতিষ্ঠার সহিংসতা—ঐশ্বরিক সহিংসতা—আইনবিনাশী সহিংসতা—এর ধারণা মনে করায় যে ৩৬ জুলাই ছিল এক আইন-বিনাশী সহিংসতা, যা পূর্ববর্তী ঔপনিবেশিক এবং ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের পৌরাণিক সহিংসতাকে প্রতিরোধ করে এক নূতন আইন ও রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠা করসে।
কেন আমরা তা আর্টিকুলেট ও তত্ত্বায়িত করব না?
এক অর্থে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কিন্তু সেই নূতন রাষ্ট্র কাঠামোর অধীনে আইন প্রয়োগ করতেসে; এটি কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং এক রাষ্ট্রীয় অপরাধের বিচার। আমাদের এই প্যাক-কাদার গাঙ্গেয় বদ্বীপে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হইসে বিজয়ী জনতার রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং ইনসাফের আকাঙ্ক্ষা থেকে।

