আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ঈদ উৎসবে রঙিন রাজধানী

রায়হান আহমেদ তামীম

ঈদ উৎসবে রঙিন রাজধানী

ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে রাজধানীবাসী সাক্ষী হলো এক ব্যতিক্রমী ও প্রাণবন্ত ঈদানন্দ উৎসবের। যান্ত্রিক নগরীর প্রাত্যহিক ব্যস্ততা আর চার দেয়ালের গণ্ডি ভেঙে ঈদের নির্মল আনন্দ-উৎসবকে জনপরিসরে ফিরিয়ে আনতে নাগরিক উদ্যোগে আয়োজিত হল তিন দিনব্যাপী ঈদ উৎসব। চাঁদরাতে মেহেদি উৎসব ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা, ঈদের দিন বর্ণাঢ্য ঈদমিছিল এবং ঈদের পরদিন ঘুড়ি উৎসব—তিন দিনের এই বর্ণিল আয়োজনে ঢাকাবাসী সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশের হারানো ঈদঐতিহ্য ও ঈদউৎসব পুনর্জাগরণের।

রবীন্দ্র সরোবরে মেহেদি উৎসব

বিজ্ঞাপন

তিন দিনব্যাপী ঈদউৎসবের সূচনা ছিল আকর্ষণীয় ও আনন্দময়। ২০ মার্চ (শুক্রবার) জুমার নামাচের পর ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে ঢাকার রাজপথে শুরু হয় প্রতিকী ‘শাহি এলান’। ঢোল পিটিয়ে নগরবাসীকে তিন দিনের এই আনন্দযাত্রার দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া হয়। নগরবাসীর কাছে বিতরণ করা হয় ঈদের শুভেচ্ছা-সংবলিত ঈদকার্ড।

শহর পরিক্রমা শেষে ইফতারের পর সন্ধ্যা ৭টায় ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরের উন্মুক্ত চত্বরে পর্দা ওঠে মেহেদি উৎসব এবং সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার।

সরোবর চত্বরে সারিবদ্ধভাবে বসা মেহেদি শিল্পীরা দক্ষ হাতে রাঙিয়ে দেন আগতদের হাত। পাশেই মঞ্চে তখন বাজছিল ঈদের গান, কাওয়ালি আর বাংলাদেশের গান। উৎসবে মেহেদি দিতে আসা দর্শনার্থী জান্নাত সারা বলেন, ‘‘ঈদে আমরা সাধারণত পার্লারে বা ঘরে বসে মেহেদি পরি। কিন্তু শত শত মানুষের মাঝে খোলা আকাশের নিচে এভাবে সুরের মূর্ছনায় হাত রাঙানোর অভিজ্ঞতা একদম আলাদা। সত্যিই অসাধারণ।’’

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় আরো ঘন হয়। মধ্যরাত পর্যন্ত সাংস্কৃতিক উৎসবের মঞ্চ মাতান আসিফ মাহমুদ-লুৎফর রহমানের গানের দল ‘সিলসিলা’।

রাজপথে ঈদমিছিল

ঈদসকালে জাতীয় ঈদগাহে ঈদের জামাত শেষে অনুষ্ঠিত হয় ঈদমিছিল। হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও শাহবাগ মোড় ঘুরে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে শেষ হওয়া এই মিছিলে ছিল বাংলার গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের ছোঁয়া। সুসজ্জিত হাতি, রাজকীয় ঘোড়া, নান্দনিক ঘোড়ার গাড়ি, রাজকীয় ছাতাধারী, বাদক দল আর সার্কাস পার্টির বিচিত্র মানুষের আনন্দ আয়োজন মিছিলকে দিয়েছিল রাজকীয় রূপ ও আভিজাত্যের ছোঁয়া। এছাড়া রণপা ও জোকারদের উপস্থিতি মিছিলে যোগ করেছিল বাড়তি আনন্দ। বিশেষভাবে শিশুদের আনন্দ ছিলো উপভোগ করার মতো। অংশগ্রহণকারীরা ‘ঈদ মোবারক’, ‘বাংলাদেশের আজাদি, ওসমান হাদি’ ও ‘ফ্রি ফ্রি প্যালেস্টাইন’সহ নানা স্লোগান দেন।

উৎসবের আয়োজন সম্পর্কে জানতে চাইলে আয়োজক কমিটির সদস্য, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট মোহাম্মদ সজল বলেন, ‘ঈদ মিছিল কোনো নতুন বিষয় নয়, এটি সুলতানি-মোগল আমল থেকেই বাংলাদেশের সংস্কৃতির অংশ। ব্রিটিশ আমল থেকে ব্রাহ্মণ-জমিদার শ্রেণির কালচারাল হেজেমনি এবং আধুনিক পুঁজিবাদের সমন্বয়ে আমাদের আনন্দ উদ্‌যাপনকে জাতীয় সংস্কৃতির রাজপথ থেকে হটিয়ে ‘উপসংস্কৃতি’তে পরিণত করা হয়েছিল। তখন ঈদ মিছিলকে কেবল ‘পুরান ঢাকাইয়া’ সংস্কৃতি হিসেবে গণ্ডিবদ্ধ করে রাখা হয়।’

ঈদ মিছিলকে ঘিরে নাগরিক প্রতিক্রিয়া

আয়োজনটি ঘিরে নাগরিকদের মাঝে ছিল হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাওয়ার তুমুল উচ্ছ্বাস। মগবাজার থেকে মিছিলে আসা চিকিৎসক মোহাম্মদ জহির শিশু ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘আগে ঈদের দিনে এমন মিছিল হতো। যান্ত্রিকতার ভিড়ে এই কালচার হারিয়ে গিয়েছিল। আমাদের শিকড়কে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতেই ছেলেকে নিয়ে এলাম। এভাবেও যে আনন্দ করা যায়, তা ওকে দেখানো জরুরি ছিল।’

ক্যান্টনমেন্ট থেকে আসা মোহাম্মদ ইমরান সপরিবারে উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তো আকাশ দেখতেই ভুলে গিয়েছিলাম। পূজাতে যেমন সবাই নেচে-গেয়ে মেতে ওঠে, আমাদের ঈদটাও তো এমন সর্বজনীন আনন্দের বিষয় ছিল। সেই হারিয়ে যাওয়া আনন্দ আবার ফিরে আসছে দেখে খুব ভালো লাগছে।’

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘুড়ি উৎসব

তিন দিনব্যাপী উৎসবের সমাপ্তি ঘটে ২২ মার্চ (রোববার) বিকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত ‘ঘুড়ি উৎসব’-এর মধ্য দিয়ে। বিকালে ঘুড়ি উড়িয়ে উৎসবের উদ্বোধন করেন আসিফ মাহমুদ।

আয়োজক কমিটির সদস্য, লেখক হাসান ইনাম বলেন, ১৭৪০ সালে নায়েবে-ই-নাজিম নওয়াজেশ মোহাম্মদ খানের আমল থেকে পুরান ঢাকায় ঘুড়ি ওড়ানোর যে ঐতিহ্য, তাকেই আধুনিক নাগরিক জীবনে মূলধারায় ফিরিয়ে আনা ছিল এই আয়োজনের লক্ষ্য।’

ঘুড়ি উৎসবে আগত ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষক জাফরিন সুলতানা বলেন, ‘ছেলেকে নিয়ে এসেছি। ঘুড়ি ওড়ানোর মতো সৃজনশীল কাজে শিশুদের অংশগ্রহণ তাদের মানসিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আমরা একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশে সন্তানদের গড়ে তুলতে চাই।’

জাতীয় ঐক্যের প্রত্যাশা ও সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব

আয়োজক কমিটির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবারের আয়োজনে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া তাদের অভিভূত করেছে। এবারের মতো প্রতি বছর সব মত ও পথের মানুষকে নিয়ে আরো বড় পরিসরে এই উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

আয়োজক কমিটির সদস্য আসিফ মাহমুদ জানান, ‘ঈদ আনন্দ মিছিল আমাদের ৫০০ বছরের ঐতিহ্য। গত বছর আমরা অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছিলাম, এবারও পেয়েছি। রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে আমরা যেন সবাই মিলে এক হয়ে মেধাবী ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে পারি—এটাই আমাদের মূল প্রত্যাশা।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে আয়োজক কমিটির সদস্য, কবি মুহিম মাহফুজ বলেন, ‘আমরা সারাদেশের মানুষ এবং বিশষেভাবে ঢাকাবাসীর পক্ষ থেকে অসাধারণ সাড়া পেয়েছি। বাংলাদেশী ঈদউৎসবের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেয়ে তারা সীমাহীন আনন্দিত। আমরা প্রতি বছর এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চেষ্টা করবো।’

আয়োজনে কিছু ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতা থাকলেও সাধারণ মানুষের এই বাঁধভাঙা জোয়ার প্রমাণ করেছে যে, নতুন বাংলাদেশে উৎসবের মালিকানা এখন সাধারণ নাগরিকদের হাতে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...