মসনদে আলা ঈসা খানের চট্টগ্রামে অবস্থান ও আধ্যাত্মিকতা চর্চা

আবদুর রহমান মাইমুন

মসনদে আলা ঈসা খানের চট্টগ্রামে অবস্থান ও আধ্যাত্মিকতা চর্চা

বাংলার ইতিহাসে ঈসা খান কেবল একজন খ্যাতিমান সামরিক নেতা ও স্বাধীনচেতা ভূঁইয়া হিসেবেই স্মরণীয় নন; তিনি ছিলেন গভীর আধ্যাত্মিক চেতনার অধিকারী একজন মানুষ। তার জীবনের রাজনৈতিক ও সামরিক অধ্যায়ের পাশাপাশি এমন একটি অধ্যায় রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ইতিহাসের আড়ালে ছিল; চট্টগ্রামে তার অবস্থান, পীরের সান্নিধ্যে আত্মগোপন এবং ভবিষ্যৎ সংগ্রামের প্রস্তুতি।

১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজমহলের যুদ্ধে আফগান শাসক দাউদ খান কররানি পরাজিত ও নিহত হওয়ার পর বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। বাংলার স্বাধীনচেতা ভূঁইয়াদের সামনে তখন নতুন বাস্তবতা হাজির হয়। এতদিন আফগান শাসনের অধীনে তারা অনেকটা স্বাধীনভাবে নিজেদের অঞ্চল পরিচালনা করলেও মোগল শক্তির বিজয়ের পর তাদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে। এই সংকটময় মুহূর্তে ঈসা খান স্বাধীনতার জন্য নিজেকে উজাড় করে দেন।

বিজ্ঞাপন

ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্র ও জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, ১৫৭৬ থেকে ১৫৮৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ঈসা খান একাধিকবার চট্টগ্রামে আসেন। তার গন্তব্য ছিল বর্তমান চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি অঞ্চল। এখানে তিনি প্রখ্যাত পীর কাজী সদর জাহাঁর সান্নিধ্যে আসেন। এই পীর শাহ আবদুল ওহাব, শাহ ভিখারী ও পীর-ই-মুলুক নামেও পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় কাব্য, পুঁথি ও লোকস্মৃতিতে তাদের সম্পর্কের উল্লেখ পাওয়া যায়।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানাধীন ‘ঈসাপুর’ নামক পরগনাটি এই ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। ধারণা করা হয়, ঈসা খানের অবস্থানের স্মৃতিতেই পরবর্তীকালে এই অঞ্চলের নাম ‘ঈসাপুর’ রাখা হয়। এখানকার বহু স্থাপনা ও লোকনাম আজও সেই স্মৃতি বহন করছে। নোয়াজিশপুর গ্রামের বিশাল দিঘিটি স্থানীয়ভাবে ‘ইছুপ্যার দিঘি’ নামে পরিচিত, যা মূলত ‘ঈসা খাঁর দিঘি’র ধ্বনিগত রূপান্তর বলে মনে করা হয়। একইভাবে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়কের ‘ইছাপুর’ নামটিও ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতার স্মারক।

ঈসা খানের চট্টগ্রামে অবস্থান নিছক আত্মগোপন ছিল না; বরং এটি ছিল ভবিষ্যৎ প্রতিরোধযুদ্ধের জন্য এক সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি। তিনি এখানে অবস্থান করে সৈন্য সংগ্রহ করেন, যুদ্ধসামগ্রী জোগাড় করেন এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ সুদৃঢ় করেন। ফটিকছড়ি ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের প্রাচীন সড়কপথ, যা একসময় আরাকান ও ত্রিপুরার সৈন্য চলাচলে ব্যবহৃত হতো—তার সামরিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

ঐতিহাসিক আহমদ শরীফ তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, ঈসা খানের চট্টগ্রাম-অবস্থানের কিংবদন্তি অত্যন্ত প্রাচীন এবং এর পক্ষে নানা তথ্যপ্রমাণও পাওয়া যায়। কবি মুহম্মদ খানের ‘মক্তুল হোসেন’ কাব্যে কাজী সদর জাহাঁর প্রশস্তির মধ্যে ঈসা খানের শ্রদ্ধার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—

‘বার বাঙ্গালার রাজা ঈশা খান বীর।

দক্ষিণ কুলের রাজা আদম সুধীর॥’

তার পঙ্‌ক্তিগুলো কেবল একটি আধ্যাত্মিক সম্পর্কেরই নয়, বরং তৎকালীন বাংলার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সমাজজীবনের আন্তঃসম্পর্কেরও সাক্ষ্য বহন করে।

অনেক গবেষক মনে করেন, রাজমহলের যুদ্ধের পর ঈসা খান উপলব্ধি করেছিলেন, সরাসরি মোগল শক্তির মুখোমুখি হওয়ার মতো সামরিক প্রস্তুতি তখনো তার নেই। তাই তিনি সাময়িকভাবে নিজেকে আড়ালে রেখে শক্তি সঞ্চয়ের কৌশল গ্রহণ করেন। এই সময় মোগল সুবাদার খান জাহান বাংলায় প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত ছিলেন। ফলে বাংলায় কিছু সময়ের জন্য তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এই সুযোগেই ঈসা খান নিজের বাহিনী সংগঠিত করেন।

চট্টগ্রামে তার অবস্থান ছিল এক দূরদর্শী নেতার কৌশলগত ও আধ্যাত্মিক পুনর্গঠনের অধ্যায়। পীরের সান্নিধ্যে থেকে তিনি যেমন মানসিক দৃঢ়তা অর্জন করেছিলেন, তেমনি রাজনৈতিক বাস্তবতাও নতুনভাবে মূল্যায়ন করেছিলেন। পরবর্তীকালে ভাটি অঞ্চলে মোগলবিরোধী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এই সময়ের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...