খেলাফতে রাশেদার ইরাক অভিযান

খালেদ ইবনে ওয়ালিদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা

মাহমুদ আহমাদ

খালেদ ইবনে ওয়ালিদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা

ইরাকের প্রান্তরে সেনাপতি খালেদ ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। তার সমর দক্ষতা ও রণকৌশলের সামনে পারসিক বাহিনী মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছিল না। জাতুস সালাসিল, মাজার ও ওয়ালাজা; পরপর তিনটি যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার কারণে পারসিক বাহিনী পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল। আনদারজাগারের বাহিনীর পরাজয় ছিল তাদের জন্য চূড়ান্ত আঘাত।

রক্ত নদীর যুদ্ধ

বিজ্ঞাপন

ওয়ালাজা থেকে ১০ মাইল দূরে, ফোরাত ও খাসিফ নদীর মধ্যবর্তী স্থানে উল্লাইসের অবস্থান। খাসিফ হলো ফোরাতের শাখা নদী। উল্লাইসের একটু ওপরে ফোরাত থেকে এই নদীর উৎপত্তি হওয়ায় এ শহরের অবস্থান ছিল অনেকটা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরাঞ্চলের মতো। ফলে প্রাকৃতিকভাবে ছিল খুবই সুরক্ষিত। ওয়ালাজার যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা বকর গোত্রের খ্রিষ্টান সৈন্যরা এখানে সমবেত হলো। তাদের নেতা ছিল আবদুল আসওয়াদ ইজলি। মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তারা বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করলে। এরপর জাবানের নেতৃত্বে পারসিক বাহিনীও তাদের সঙ্গে যুক্ত হলো।

বকর গোত্রের সৈন্য সমাবেশের সংবাদ সেনাপতি খালেদের গোচরে এলো। তিনি বিলম্ব না করে উল্লাইসের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেলেন। তার ধারণা ছিল, শুধু খ্রিষ্টান সৈন্যরাই সেখানে সমবেত হয়েছে। জাবানের নেতৃত্বে পারসিকদের আগমনের কোনো সংবাদ তার কাছে ছিল না। উল্লাইসের কাছে এসে খালেদ ইবনে ওয়ালিদ সৈন্য বিন্যাস করলেন। তিনি দুই বাহুতে আদি ইবনে হাতেম ও আসেম ইবনে আমরকে নিযুক্ত করে আক্রমণ শুরু করলেন। প্রাকৃতিক সুরক্ষা ও দুই নদীর মাঝখানে উল্লাইসের অবস্থানের কারণে দুই উইং বা পথ ঘুরে পেছন থেকে আক্রমণের সুযোগ ছিল না। ফলে মুসলিম বাহিনী তীব্র গতি ও অপ্রতিরোধ্য শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিল।

সেনাপতির অঙ্গীকার

মুসলিম বাহিনী যখন উল্লাইসে উপস্থিত হলো, পারসিকরা তখন দুপুরের খাবার নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সেনাপতি জাবান অনেক কষ্টে তাদের ময়দানে নিয়ে এলো।

আরব খ্রিষ্টান ও পারসিকদের সম্মিলিত বাহিনীর সামনে মুসলিমরা ধৈর্যের সঙ্গে লড়াই করতে লাগলেন। সেনাপতি খালেদ আল্লাহর কাছে দোয়া করে বললেন, ‘আল্লাহ! আপনি যদি আমাদের বিজয় দান করেন, তবে আপনার সন্তুষ্টির জন্য তাদের কাউকে আমি জীবিত ছাড়ব না, তাদের রক্তে আমি নদী প্রবাহিত করে দেব।’

মুসলিম বাহিনী বিজয় অর্জন করল। তাদের প্রবল আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে শত্রুপক্ষের সম্মিলিত বাহিনী পিছু হটে গেল। সেনাপতির নির্দেশে মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনী তাদের ধাওয়া করে বহু সৈন্যকে বন্দি করে আনল। বন্দিদের নদীর তীরে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হলো; তাদের রক্ত গড়িয়ে নদীর দিকে প্রবাহিত হতে থাকল।

যুদ্ধক্ষেত্র ও আশপাশের এলাকা মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে এলে তারা জাবানের বাহিনীর পরিত্যক্ত শিবিরে প্রবেশ করল। সেখানে নানা ধরনের খাদ্যসামগ্রী সাজানো ছিল। কিন্তু সেগুলো খাওয়ার মতো কোনো মানুষ অবশিষ্ট ছিল না। তখন খালেদ বললেন, এগুলো যুদ্ধলব্ধ সম্পদের অন্তর্ভুক্ত; তাই সৈন্যরা নিজেদের মধ্যে খাবারগুলো ভাগ করে নিতে পারবে। সেদিন রাতের আহার হিসেবে সেসব খাদ্যই পরিবেশন করা হয়েছিল।

হীরার কৌশলগত গুরুত্ব

সমরকৌশল বিবেচনায় হীরা ছিল ইরাকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর। এই শহর থেকে সহজেই পুরো ইরাক নিয়ন্ত্রণ করা যায়। শহরটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কয়েকটি কারণ হলোÑ

ভৌগোলিক সুবিধা : ইরাকের বড় বড় কয়েকটি শহর থেকে হীরার দুর্গ ছিল খুব কম। কুফা থেকে তিন মাইল ও নাজফ থেকে ঘোড়ার পিঠে ঘণ্টাখানেকের দূরত্ব ছিল এর অবস্থান।

সহজলভ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা : ইরাকের প্রায় সবগুলো রুট হীরার সঙ্গে যুক্ত ছিল। পূর্বদিকে ফোরাত নদীর মাধ্যমে মাদাইন, পশ্চিমদিকে সড়কের মাধ্যমে হীত, আম্বার ব্রিজের মাধ্যমে আম্বারের সঙ্গে, পশ্চিমে সড়কের মাধ্যমে শামের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। একইভাবে, এটা বসরার সঙ্গেও এর সংযোগ ছিল।

ফোরাত নদীর নিয়ন্ত্রণ : হীরার নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে থাকে, অবস্থানগত কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তারা ফোরাত নদীর পশ্চিম তীর নিয়ন্ত্রণ করে।

রাজধানীর কাছাকাছি অবস্থান : মাদায়েন শহরের সবচেয়ে কাছের শহর ছিল হীরা। মাদায়েন ছিল তৎকালীন পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী। তারাও এ শহরের গুরুত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল।

আমগেশিয়া জয় ও হীরার পথে যাত্রা

খলিফা আবু বকরের ইরাক অভিযানের পরিকল্পনা ছিল হীরাকেন্দ্রিক। উল্লাইসের যুদ্ধ শেষে তাই সেনাপতি খালেদ হীরার উদ্দেশে রওনা হলেন। পথিমধ্যে এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান ও প্রাচুর্যপূর্ণ শহর আমগেশিয়া জয় করেন। এ শহর থেকে প্রচুর পরিমাণে গণিমত অর্জিত হয়।

হীরায় পৌঁছার জন্য সেনাপতি খালেদ নদীপথকে বেছে নেন। তিনি সঙ্গে থাকা ভারী মালামাল নৌকায় তুলে ফেলেন। আর সৈন্যরা উট আর ঘোড়ার পিঠে চড়ে এগিয়ে যেতে থাকেন। ফোরাতের বুক চিরে মুসলিম বাহিনী এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু মুসলিম বাহিনী যত সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল, নদীর পানি তত কমছিল। পানি কমতে কমতে একসময় এমন হলোÑনৌকা নিয়ে সামনে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ ছিল না। সেনাপতি খালেদ বুঝতে পারলেন, কোনো সমস্যা দেখা দিয়েছে সামনে।

নদীতে বাঁধ নির্মাণ

পারস্য সম্রাটের পক্ষ থেকে নিযুক্ত হীরার গভর্নর ছিল আজাজেহ। একই সঙ্গে সেনাবাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত ছিল। খালেদের আমগেশিয়া বিজয়ের সংবাদ হীরায় পৌঁছালে আজাজেহ চিন্তিত হয়ে পড়েন। ছেলের নেতৃত্বে তিনি একদল সৈন্যকে পাঠিয়ে দেন খালেদের মোকাবিলা করার জন্য। পারসিক বাহিনী পরিকল্পনা করল, যেখানে ফোরাত থেকে আতিক নদীর উৎপত্তি হয়েছে, সেখানে বাঁধ দিয়ে নদীর পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করবে।

বাঁধ অভিমুখে গেরিলা আক্রমণ

নদীর পানি কমে আসায় সেনাপতি খালেদ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি একদল সৈন্য নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন। দেখলেন, পারসিক বাহিনী নদীতে বাঁধ দিয়ে বসে আছে। অতর্কিতে তাদের ওপর তিনি হামলা করলেন এবং সব সৈন্য হত্যা করলেন। এরপর নদীর বাঁধ খুলে দিলে নদীতে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক হলো।

এরপর খালেদ (রা.) দেরি করলেন না। দ্রুততম সময়ে তিনি হীরার উপকণ্ঠে গিয়ে উপস্থিত হন। শহরের প্রশাসক আজাজেহ সর্বশেষ সংবাদ সম্পর্কে অবহিত ছিল না। তার ধারণা ছিল, পুত্রের বাহিনীর মোকাবিলা করার ক্ষমতা মুসলিম সৈনিকদের নেই। তাই তিনি নিশ্চিন্তে দিনগুজরান করছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে যখন সে দেখতে পেল, মুসলিম বাহিনী তাদের কাঁধের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে, তখন তার বিশেষ কিছু করার ছিল না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন