গল্পটা অসময়ে শুরু হয়েছিল

মুহাম্মদ কামাল হোসেন

গল্পটা অসময়ে শুরু হয়েছিল

কার্তিকের শেষ গোধূলি। সময়টা এক আলস্যপূর্ণ স্থবিরতা নিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। ঢাকা শহরের উপকণ্ঠে এক নিরিবিলি কফি শপের জানালার ধারে বসেছিল অরুণিমা। তার চারপাশে দ্রুত চলমান জীবনের নানা কোলাহল থাকলেও অরুণিমা ছিল এক ভিন্ন ও একান্ত ব্যক্তিগত বৃত্তে। বয়স ত্রিশের কোঠায়, কিন্তু তার দৃষ্টিতে ছিল এক চিরন্তন বিবেকের ছায়া, যা বহু দূরত্বের অভিজ্ঞতার দ্যোতক। তার জীবন এক সুশৃঙ্খল, তবে বর্ণহীন ক্যালেন্ডার, যেখানে আবেগের জন্য কোনো অবকাশ ছিল না।

জানালার বাইরে রাস্তার ধুলো আর ধোঁয়ায় মেশানো নাগরিক ব্যস্ততা অরুণিমাকে স্পর্শ করছিল না। সে কেবল দেখছিল, স্ট্রিট ল্যাম্পের হলুদ আলোয় কার্তিকের কুয়াশা কীভাবে ডানা মেলছে। তার সামনের কফিটা অনেকক্ষণ আগেই জুড়িয়ে হিম হয়ে গেছে, অথচ সেটা শেষ করার কোনো তাগিদ তার মধ্যে ছিল না। জীবনের দীর্ঘ পথ চলায় সে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল এমন এক ধরনের স্থবিরতায়, যেখানে কোনো কিছুর জন্যই আর অপেক্ষা থাকে না। নিজের চারপাশকে সে এক কঠোর যুক্তিবোধের দেয়ালে বন্দি করে ফেলেছিল, যেন নতুন কোনো আবেগ সেই দেয়ালে ফাটল ধরাতে না পারে।

বিজ্ঞাপন

অরুণিমা সদ্য এক দীর্ঘস্থায়ী অসার সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসেছে। সেই অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, ভালোবাসার নামে মানুষ আসলে এক গভীর নিঃসঙ্গতারই চর্চা করে। তাই এখন তার মন নিছক নৈর্ব্যক্তিকতা ও মানসিক নিরাসক্তি দ্বারা সুরক্ষিত। সে বিশ্বাস করত, অনুভূতি মাত্রই ক্ষণস্থায়ী প্রমাদ।

ঠিক সেই সময় কফি শপের দ্বারে প্রবেশ করল সায়ন। তার বয়স অরুণিমার চেয়ে সামান্য কম, কিন্তু তার উপস্থিতি ছিল বেশ স্পষ্টবাদী ও নজরকাড়া। সায়ন পেশায় স্থাপত্যশিল্পী, জীবনকে সে এক নিরন্তর নির্মাণ রূপে দেখে। তবে তার চেহারায় এক ধরনের গভীর অপ্রাপ্তির ছাপ ছিল, যেটা তাকে সাধারণ চাঞ্চল্য থেকে সব সময় আলাদা করে রাখত।

সায়নের হাঁটাচলার মধ্যে এক ধরনের ছন্দ ছিল, ভিড়ের মধ্যেও আলাদা করে চেনা যায়। সে যখন কফি শপের ভেতরে এসে দাঁড়াল, তখন বাইরের কার্তিকের হিমেল হাওয়ার একটি ঝাপটা তার সঙ্গে ভেতরে ঢুকে পড়ল। সে কেবল একজন আগন্তুক ছিল না, বরং তার শান্ত ভঙ্গি আর চারপাশের পরিবেশকে দেখার নিবিড় ধরনটি মুহূর্তেই কফি শপের একঘেয়েমিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করল। সে যেন কোনো সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে নয়, বরং নিজেরই কোনো চিন্তার ঘোরে হেঁটে আসছিল।

সায়ন অরুণিমাকে লক্ষ করল। একটি মুহূর্ত, কেবল একটি মুহূর্তের জন্য তাদের চোখ পরস্পরের সম্মুখীন হলো। অরুণিমা সাধারণত এমন অবাঞ্ছিত দৃষ্টি বিনিময় এড়িয়ে চলে, কিন্তু সায়নের চোখে সে দেখল এক আশ্চর্য সমধর্মিতা। মনে হলো, এই মানুষটিও হয়তো জীবনের কোনো নিগূঢ় বোঝাপড়ার ভার বহন করছে। অরুণিমা দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল, কিন্তু সেই ক্ষণিকের বিদ্যুৎপ্রবাহ তার ভেতরে এক মৃদু দোলা সৃষ্টি করল।

সায়ন এগিয়ে এসে অরুণিমার টেবিলের মুখোমুখি খালি চেয়ারটিতে বসতে চাইল। তার কণ্ঠে কোনো আবদার ছিল না, বরং ছিল এক বিনম্র জিজ্ঞাসা। ‘আচ্ছা, আমি কি বসতে পারি? এই কফি শপে আজ খুব ভিড়, অন্য কোনো উপায় দেখছি না।’

অরুণিমা স্বভাববিরুদ্ধভাবে আপত্তি জানাল না। একটি শান্ত ও সংক্ষিপ্ত উচ্চারণ ‘নিশ্চয়ই’ বলে সে তার কফিতে চুমুক দিল।

সায়ন বসল। পরিবেশের অনাচার ভাঙতে সে বলল, ‘এই সময়টা কেমন যেন। না শীত, না গরম। সব কিছুতেই একটা বিমূর্ততা থাকে, তাই না?’

অরুণিমা মাথা নাড়ল। বলল, ‘বিমূর্ততা নয়, আমি বরং একে এক ধরনের ক্লান্তি বলব। প্রকৃতিরও যেন কোনো কিছুতে আর আগের মতো উচ্ছ্বাস নেই।’

সায়ন হাসল। তার হাসিটি ছিল নির্ভেজাল, কিন্তু সেই হাসির গভীরে এক ধরনের দুর্বোধ্য শূন্যতা লুকিয়ে ছিল। সে বলল, ‘ক্লান্তি হয়তো থাকে। কিন্তু সেই ক্লান্তিই তো আমাদের নতুন করে অনুসন্ধানের সুযোগ করে দেয়। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই এক নতুন অভিযাত্রার নামান্তর।’

এই কথোপকথন যা হওয়ার কথা ছিল নিছক যান্ত্রিক ও সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তা ধীরে ধীরে গভীর হতে শুরু করল। অরুণিমা অনুভব করল, তাদের মধ্যেকার এই আলাপ যেন এক অসময়ে শুরু হওয়া গল্পের প্রথম পরিচ্ছেদ, যা তার সকল পরিকল্পিত নিরাসক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

প্রথম সাক্ষাতের পর কেটে গেছে এক সপ্তাহ। সেই অসময়ের আলাপচারিতার রেশ যেন অরুণিমা এবং সায়নকে এক অদৃশ্য অভিকর্ষ দ্বারা পরস্পরের দিকে টানছিল। কফি শপের ওই অপ্রত্যাশিত সংযোগ এখন রূপ নিয়েছে নৈমিত্তিক সান্ধ্যকালীন সাক্ষাতে। তারা দেখল, তাদের কথোপকথনের স্তর সাধারণ পারস্পরিক আলাপন থেকে সরে গিয়ে ক্রমশ এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধানে পরিণত হচ্ছে।

অরুণিমা নিজেকে আবেগি অবরোধে মুড়ে রেখেছিল। সায়নের সান্নিধ্যে তার সেই সংরক্ষণশীলতা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করল। সায়ন তার কথা ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে অরুণিমাকে তার আত্মগত শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিত।

এক সন্ধ্যায় সায়ন বলেছিল, ‘আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের এক ধরনের মিথ্যা নিরাপত্তার মধ্যে রাখি, অরুণিমা। ভাবি, সম্পর্ককে নিয়মের বেড়াজালে বেঁধে রাখলেই তা স্থায়ী হবে। কিন্তু ভালোবাসা হলো নৈরাজ্যের শিল্প। সেখানে কোনো পূর্বনির্ধারিত ছক চলে না।’

অরুণিমা জবাব দিল, ‘আমি একে পরিশ্রমের অভাব বলব। বেশিরভাগ মানুষই সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমে অপারগ। তারা দ্রুত ফল চায়, অথচ সম্পর্কের নির্ণায়ক শক্তি হলো ধৈর্য ও পারস্পরিক সম্মান।’

তাদের সম্পর্ক ছিল দুই বিপরীত মেরুর আকর্ষণ। সায়ন ছিল জীবনমুখী ও উদ্দীপনামূলক, কিন্তু তার অন্তরে ছিল এক গভীর অনিশ্চয়তা। তার স্থাপত্যের নকশাগুলো ছিল স্বপ্নের মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী, অথচ সে নিজেই নিজের দক্ষতার প্রতি সন্দিহান ছিল। তার কাছে প্রেম ছিল এক অপ্রত্যাশিত সম্ভাবনা, যা জীবনের একঘেয়েমিকে ভাঙতে পারে।

অন্যদিকে অরুণিমা ছিল বাস্তববাদী ও দৃঢ়চিত্ত, কিন্তু তার অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, সব ধরনের ভালোবাসারই এক অবধারিত ক্ষয় আছে। সে বিশ্বাস করত, এই অসময়ে তার জীবনে আসা এই সম্পর্ক হয়তো কেবলই এক সাময়িক বিক্ষেপ। তার আশঙ্কা ছিল, সায়ন হয়তো তার অতীতের সম্পর্কের মতো আরো একটি ভঙ্গুর অঙ্গীকার।

এই সংশয় সত্ত্বেও সায়নের চোখে ছিল এক অকৃত্রিম আহ্বান। একদিন অরুণিমা সায়নকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি এই সম্পর্ককে কী রূপে দেখছ, সায়ন? এই অসময়ে আমাদের এই সংলগ্নতা, এর লক্ষ্য কী?’

সায়ন অরুণিমার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল। বলল, ‘লক্ষ্য? হয়তো এর কোনো ঐতিহ্যগত লক্ষ্য নেই। আমরা একে অপরের অন্ধকার দিকগুলো দেখতে পাচ্ছি, যেখানে কখনো আলো পৌঁছায় না। প্রেম হলো সেই অন্ধকারে এক চিলতে আলোর আকস্মিক উদ্ভাসন। এই সম্পর্ক আমাদের জীবনের সারমর্ম বুঝতে সাহায্য করছে। আমাদের পারস্পরিক বোঝাপড়াই হলো অস্তিত্বের স্বীকৃতি।’

সায়নের এই দার্শনিকতা অরুণিমাকে কিছুটা বিচলিত করল। সে বুঝল সায়ন তার কাছে কেবল এক প্রেমিক নয়, বরং এক আবেগি আয়না, যেখানে সে নিজের ভীত সত্তাকে দেখছে। তাদের নৈকট্য শারীরিক বা সামাজিক অনুরাগের চেয়ে বেশি ছিল এক আত্মার কথোপকথন।

তাদের মধ্যে প্রেম প্রস্ফুটিত হচ্ছিল না; বরং প্রস্ফুটিত হচ্ছিল এক জটিল প্রীতি, যা দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। তারা অনুভব করল তাদের এই সম্পর্ক, যা অসময়ে শুরু হয়েছিল, তা সম্ভবত জীবনের এক অনিবার্য আর্থিক ঋণ পরিশোধের মতো, যেখানে অতীতের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করা হচ্ছে এই নিষ্কাম উপলব্ধির মাধ্যমে। ভালোবাসা সব সময় আনন্দময় হয় না; তা প্রায়শই হয় কষ্টকর আত্ম-আবিষ্কারের প্রক্রিয়া।

তাদের নিবিড় ও মননশীল সম্পর্ক যখন এক গভীর সত্তাভিত্তিক প্রীতিতে উন্নীত হচ্ছে, ঠিক তখনই বাস্তবের নিদারুণতা হস্তক্ষেপ করল। সায়নের কাজের সূত্রে তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের জন্য দেশের বাইরে যেতে হবে। এই অপ্রত্যাশিত বিচ্ছেদ তাদের অসময়ের গল্পে এক নতুন মোড় নিয়ে এল।

অরুণিমা প্রথমে ভাবল, দূরত্ব হয়তো তার হৃদয়ের সেই প্রাচীন প্রতিরক্ষাকে আবার ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু সায়নের বিদায়ের কথা শোনার পর তার মধ্যেকার নিষ্ক্রিয় আবেগগুলো যেন সহসা বিদ্রোহী হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, সায়নকে তার জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়া এখন আর কেবল একটি সাধারণ বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং তার সদ্য আবিষ্কৃত শান্তি ও স্থিতাবস্থার ওপর এক তীব্র আক্রমণ।

এক বিষণ্ণ সন্ধ্যায় বিদায়ের প্রাক্কালে, তারা শেষবারের মতো বসল। কফির উষ্ণতা সেদিন তাদের অভ্যন্তরীণ শৈত্যকে দূর করতে পারছিল না।

অরুণিমা শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘সায়ন, আমরা জানতাম এই সম্পর্কের কোনো ঐতিহ্যগত গন্তব্য নেই। আমাদের এই মেলামেশা ছিল কেবল দুটি ভ্রান্ত আত্মাকে খুঁজে পাওয়ার এক আন্তঃকালীন যাত্রা। এখন যখন তুমি যাচ্ছ, তখন আমাদের এই প্রীতিকে এখানেই এক ধরনের পরিপূর্ণতা দেওয়া উচিত।’

সায়ন বিস্মিত হলো না। তার চোখে ছিল এক গভীর বোধগম্যতা। সে জানত, অরুণিমা জীবনের স্বতঃস্ফূর্ততার চেয়েও বেশি বিশ্বাসী ছিল নিয়তির পরিহাসে। সায়ন বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি, অরুণিমা, তুমি চাও না আমাদের এই নিষ্কলুষ উপলব্ধির ওপর দূরত্বের মলিনতা পড়ুক। তুমি চাও, এই অসময়ের গল্পটা যেন এক অমলিন উপাখ্যান রূপে আমাদের স্মৃতিতে থেকে যায়।’

অরুণিমা নীরব রইল। তার চোখে জল ছিল না, ছিল এক ধরনের সুদূর আত্মস্থতা। সে ব্যাখ্যা করল, ‘দেখো সায়ন, প্রেম যখন কাছের বস্তু থাকে, তখন আমরা তার শর্তগুলো নিয়ে মেতে থাকি। আমরা তাকে অধিকার করতে চাই, বেঁধে রাখতে চাই। কিন্তু তুমি যখন দূরে যাচ্ছ, এই দূরত্ব আমাদের শেখাবে, ভালোবাসা হলো মুক্তি। আমাদের এই টান আসলে এক ধরনের আত্মিক স্বয়ম্ভরতা।’

এই মুহূর্তটি ছিল তাদের সম্পর্কের চরমে পৌঁছানোর মুহূর্ত। তারা কোনো আবেগি প্রতিজ্ঞা বা ভবিষ্যতের জন্য কোনো আশা বিনিময় করল না। বরং তারা একে অপরের অস্তিত্বকে গ্রহণ করল এবং তাকে মুক্তি দিল। তাদের এই বিচ্ছেদ ছিল এক ধরনের বিরল সম্মতি, যেখানে তারা তাদের স্বেচ্ছাচারী প্রেমের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছিল এক দার্শনিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে।

সায়ন চলে গেল। অরুণিমার জীবনে আবার সেই সুশৃঙ্খল, নৈর্ব্যক্তিক রুটিন ফিরে এল। কিন্তু এই রুটিনের মধ্যে এক নিগূঢ় পরিবর্তন ঘটেছিল। সায়নের উপস্থিতি স্বল্পস্থায়ী হলেও, তার মনের গভীরে এক অমোচনীয় স্বাক্ষর রেখে গেছে।

অরুণিমা এখন বুঝতে পারল, অসময়ে শুরু হওয়া এই গল্প তাকে কী শিখাল। প্রেম কেবলই প্রাপ্তি নয়; এটি হলো ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি স্তরকে নির্ভয়ে ব্যবচ্ছেদ করার ক্ষমতা। সায়ন তাকে শিখিয়েছিল, জীবনবোধ হলো তার অন্তর্নিহিত সত্যকে গ্রহণ করা, তা যত কঠিন বা বিভ্রান্তিকরই হোক না কেন।

অরুণিমা তার টেবিলে রাখা এক টুকরো কাগজে সায়নের হাতে লেখা একটি কবিতার লাইন দেখতে পেল। সেখানে লেখা ছিল, ‘যা অসময়ে আসে, তা কখনও সময়ের বাঁধনে আবদ্ধ হয় না। সে শুধু তার আত্যন্তিক মুক্তি খুঁজে ফেরে।’

এই বিচ্ছেদ কোনো পরাজয় ছিল না, ছিল এক আত্মিক বিজয়, যা অরুণিমাকে তার অস্তিত্ববাদী শূন্যতার ঊর্ধ্বে উঠে জীবনের এক গভীর প্রীতির সঙ্গে পরিচিত করেছিল।

সায়নের চলে যাওয়ার পর অরুণিমার জীবন আবার তার পূর্বের কঠোর শৃঙ্খলায় ফিরে এসেছিল। কিন্তু এবার সেই শৃঙ্খলা ছিল ভিন্ন। সায়নের অনুপস্থিতি কোনো সাধারণ শূন্যতা ছিল না। এটা ছিল এক বিশেষ ধরনের নির্জনতা, যা তার ভেতরের নীরবতাকে আরো বেশি তীক্ষ্ণ ও সংজ্ঞায়িত করে তুলছিল। আগে অরুণিমা একা থাকতে অভ্যস্ত ছিল, কিন্তু এখন সে একা থাকে সায়নের স্মৃতির জ্যামিতির কেন্দ্রে।

অরুণিমা লক্ষ্য করল, সায়নের বলা কথাগুলো এখন তার জীবনবোধের নেপথ্যে এক ধরনের মন্তব্য হিসেবে কাজ করছে। যখনই সে তার পেশাগত বা ব্যক্তিগত জীবনে কোনো দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হতো, তখনই সায়নের সেই দার্শনিক প্রজ্ঞা তার মনে ভেসে উঠত, তাকে নৈর্ব্যক্তিক বিশ্লেষণে সাহায্য করত।

অরুণিমা তার পুরোনো ডায়েরিগুলো ঘাঁটতে শুরু করল। সেই ডায়েরিগুলো ছিল তার অতীতের সম্পর্কের তিক্ত অভিজ্ঞতার জীবন্ত দলিল। সে দেখল, বিগত বছরগুলোতে সে কেবল ভালোবাসার ধারণাকেই আঁকড়ে ধরেছিল, কিন্তু তার স্বাভাবিক রূপায়ণকে কখনোই গ্রহণ করতে পারেনি। তার মনে পড়ল তার পূর্ববর্তী সম্পর্কগুলো কী করে পারস্পরিক প্রত্যাশার ভারে ভেঙে গিয়েছিল।

অরুণিমা তার এক প্রাক্তন প্রেমিকের কথা ভাবল, যার নাম ছিল শুভ্র। শুভ্র ছিল আবেগপ্রবণ, কিন্তু ছিল অত্যন্ত নিরাপত্তাহীন। অরুণিমা তখন তার জীবনকে নিশ্চিত ভবিষ্যতের এক সরলরেখায় সাজাতে চেয়েছিল, আর শুভ্র চেয়েছিল সেই রেখার বাইরে এক অবাস্তব স্বাধীনতা। অরুণিমা সেই সম্পর্ককে সময়ের শর্তাধীনে আবদ্ধ করতে চেয়েছিল, আর শুভ্র সেই বাঁধন থেকে মুক্তি চেয়েছিল। সেই সম্পর্কটি অসময়ে শুরু হয়নি, কিন্তু অসময়েই শেষ হয়েছিল।

অরুণিমা উপলব্ধি করল, শুভ্রর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়েছিল আবেগের ভুল ব্যবস্থাপনায় আর সায়নের সঙ্গে বিচ্ছেদ হলো উপলব্ধির চরম সীমায় পৌঁছে। সায়ন তাকে শিখিয়েছিল, ভালোবাসা কেবল ধারণা নয়, বরং তা হলো জীবনবোধের এক অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। অতীতের প্রতিচ্ছবি দেখে অরুণিমা ভাবল, ‘শুভ্রর প্রতি আমার প্রেম ছিল সংশয়মূলক, সেখানে আমি নিজেকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করিনি। আর সায়নের প্রতি আমার প্রীতি ছিল নির্বস্তুক ও নিঃশর্ত, যা কখনো কোনো প্রত্যাশার ভার বহন করেনি।’

এই বিচ্ছেদের ব্যবধান অরুণিমাকে তার ভেতরের ভুল ধারণাগুলো চূর্ণ করার সাহস জোগাল। সে বুঝতে পারল, জীবনের গভীরতম সম্পর্কগুলো শুরু হওয়ার জন্য সঠিক সময়ের অপেক্ষা করে না। তারা কেবল সঠিক মানসিক পরিপক্বতার অপেক্ষা করে। সায়ন চলে গেলেও, তার দেওয়া জ্ঞান অরুণিমার জীবনে এক স্থায়ী ভিত্তি স্থাপন করে গিয়েছিল।

অরুণিমার একাকিত্ব এখন আর তার দুর্গ নয়। এটা এখন তার ল্যাবরেটরি, যেখানে সে নিজের অস্তিত্বকে নতুন করে পরীক্ষা করছে। সে শিখল, প্রেম হারানোর ভয় নয়, বরং প্রেমকে সম্পূর্ণভাবে অনুভব না করার ভয়—ওই ভয়ই মানুষকে সবচেয়ে বেশি নিঃসঙ্গ করে তোলে।

অরুণিমা জানত, সায়নের সঙ্গে তার গল্পটা অসময়ে শুরু হয়েছিল কিন্তু সেই অসময়ই ছিল তাদের সম্পর্কের জন্য পরম শুভক্ষণ। সেই অসময়ের গল্প তাকে শিখিয়েছিল, কিছু সম্পর্ক কেবল জীবনের পাঠ দেওয়ার জন্যই আসে, তারা স্থায়ী হওয়ার জন্য আসে না।

ছয় মাস কেটে গেছে। ঋতুচক্র ফিরে এসেছে শীতের দ্বারপ্রান্তে। অরুণিমা এখন সম্পূর্ণ পরিবর্তিত। তার জীবনে এখন আর সেই অতিলৌকিক তাড়াহুড়ো বা নিরাপত্তার জন্য ব্যাকুলতা নেই। সায়নের অনুপস্থিতি তাকে দুর্বল করেনি, বরং তার ব্যক্তিত্বকে আরো বেশি দৃঢ়তা দিয়েছে।

সে এখন তার স্থাপত্য সংস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে আরো স্বাধীনচেতা ও দূরদর্শী। তার চারপাশে মানুষজনের আনাগোনা আছে, কিন্তু তাদের কারো কাছেই অরুণিমা তার মানসিক নির্জনতার চাবি হস্তান্তর করেনি। সে এখন বুঝতে পারে, প্রেম বা সম্পর্ক, তা যত গভীরই হোক না কেন, তা যেন কখনোই তার আত্মসত্তার বিকল্প না হয়।

অরুণিমা এখন সেই প্রজ্ঞার অধিকারী, যা তাকে শিখিয়েছে, ভালোবাসার সার্বিক মূল্য তার স্থিতির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং তার গুণগত প্রভাবের ওপর নির্ভরশীল। সায়নের সঙ্গে তার অসময়ের গল্পটি ছিল তার জীবনে এক আবেগি বিপ্লব, যা তার পুরোনো অমূলক সংস্কারগুলো ক্রমশ ভেঙে দিয়েছে।

একদিন শীতের এক সকালে অরুণিমা তার অফিস ডেস্কে বসেছিল। একটি আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনে সায়নের সদ্য সমাপ্ত হওয়া প্রকল্পের একটি সমালোচনামূলক আলোচনা তার নজরে পড়ল। তার মন এক সুখকর বিষাদে ভরে উঠল। সে সায়নের সাফল্যে আনন্দিত হলো, কিন্তু তার এই আনন্দ ছিল দাবিহীন, একেবারে নিষ্কাম।

তখনই তার ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল এক অচেনা আন্তর্জাতিক নম্বর। অরুণিমা ধরল। ওপার থেকে সেই চেনা কিন্তু বহু দূরের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘অরুণিমা, আমি সায়ন বলছি।’

অরুণিমার হৃৎস্পন্দন বাড়ল না। বরং এক অচিন্তিত প্রশান্তি তার মনকে গ্রাস করল। সে বলল, ‘আমি জানতাম তুমি যোগাযোগ করবে, সায়ন। তোমার কাজ দেখলাম। চমৎকার হয়েছে।’

সায়ন হাসল। বলল, ‘ধন্যবাদ অরুণিমা। আমি এক সপ্তাহ পর ফিরে আসছি। শুধু জানতে চাইছিলাম, তুমি কেমন আছ? তোমার জীবনে কোনো নতুন সূচনা হলো কি না?’

অরুণিমা হেসে উত্তর দিল, সেই হাসি ছিল বহুদিনের আত্ম-অনুসন্ধানের ফল। ‘নতুন সূচনা? হ্যাঁ, সায়ন। আমার জীবনে এক নতুন আত্মিক প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আমি শিখেছি ভালোবাসা হলো অঙ্গীকারের বন্ধন নয়, ভালোবাসা হলো মুক্তির প্রতি প্রীতির আহ্বান।’

সায়ন নীরব রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, ‘আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই, অরুণিমা। তবে এবার কোনো অসময়ের দাবি নিয়ে নয়। কেবল তোমাকে একবার দেখতে চাই, সেই মানুষটিকে, যাকে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হিসেবে জেনেছিলাম।’

অরুণিমা জানত, সায়ন ফিরে আসছে। তাদের অসময়ে শুরু হওয়া গল্পটি হয়তো সমাপ্ত হয়নি, কিন্তু তার রূপান্তর হয়েছে। এটা আর কোনো রোমান্টিক আশা-আকাঙ্ক্ষার গল্প নয়, বরং এটা দুজন আত্ম-সচেতন মানুষের মধ্যেকার এক শাশ্বত প্রজ্ঞার অঙ্গীকার। তারা একে অপরের জীবনে ফিরে আসছে, তবে এবার প্রেমের শর্তে নয়, বরং বন্ধুত্বের প্রগাঢ় সম্মানে।

অরুণিমা সিদ্ধান্ত নিল, সে সায়নের সঙ্গে দেখা করবে। তাদের সম্পর্কটি হয়তো একটি নির্দিষ্ট গন্তব্য খুঁজে পায়নি, কিন্তু জীবনের পথকে এমনভাবে বিনির্মাণ করেছে যে, তারা এখন একে অপরের অস্তিত্বের স্বীকৃতিতে বাঁচতে শিখেছে।

গল্পটা অসময়ে শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেই অসময়ের শুরুই তাদের শিখিয়েছিল, জীবনবোধের সর্বোচ্চ স্তর হলো মুক্তি, আর সেই মুক্তিতেই নিহিত থাকে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও প্রীতির পরাকাষ্ঠা।

কফি শপের জানালার বাইরে এখন সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনীভূত হয়েছে। অরুণিমা অনুভব করল, বাতাস এখন আর ক্লান্ত নয়, বরং সেখানে এক ধরনের স্বচ্ছতা আছে। সায়নের ফিরে আসা বা না আসা এখন আর তার অস্তিত্বের ভারসাম্যে কোনো চ্যুতি ঘটাবে না। সে বুঝতে পারল কিছু গল্প শেষ না হয়েও আসলে এক ধরনের অলৌকিক সমাপ্তিতে পৌঁছে যায়। জানালার কাচে নিজের আবছা প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে হাসল। জীবনের এই অসময়ই তাকে নিজের সবচেয়ে কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন