জাতির আত্মপরিচয় কেবল তার ভৌগোলিক সীমানার ওপর নির্ভর করে না; বরং তা গভীরভাবে প্রোথিত থাকে সে জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি এবং আধ্যাত্মিক চেতনার মর্মমূলে। একটি দেশের রূপ-রস-গন্ধ মূলত লুকিয়ে থাকে তার প্রান্তিক মানুষের যাপিত জীবনের আখ্যানে। বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধ, উন্মুক্ত প্রান্তরের রাখালিয়া বাঁশি, নদীর ভাটিয়ালি তান আর খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের যে চিরায়ত আখ্যান, তা যুগে যুগে কিছু ক্ষণজন্মা মানুষের হাত ধরেই সংরক্ষিত ও বিকশিত হয়েছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং কৃষক-জনতার অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বাংলার বীর সেনানি তিতুমীর কিংবা ফরায়েজি আন্দোলনের রূপকার হাজী শরীয়তউল্লাহ যেমন ঔপনিবেশিক ও সামন্ততান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলার অবহেলিত মানুষের রাজনৈতিক ও সামাজিক আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই করেছিলেন, কিংবা নবাব স্যার সলিমুল্লাহ যেভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রাতিষ্ঠানিক ও শিক্ষাগত অধিকার নিশ্চিতে নিরলস কাজ করেছিলেন—ঠিক তেমনি বাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক অধিকার ও শেকড়ের সুরকে টিকিয়ে রাখার এক নিরন্তর সংগ্রাম করেছেন এ দেশের লোকজ সংস্কৃতির পথিকৃৎরা। যুগে যুগে বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে নিজেদের স্বকীয়তা রক্ষার এই লড়াইটা ছিল মূলত আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখারই লড়াই।
এই সাংস্কৃতিক অধিকার আদায় ও আবহমান ঐতিহ্য বিনির্মাণের এক অবিসংবাদিত নায়ক হলেন কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী, গবেষক, প্রাবন্ধিক এবং ‘ভাওয়াইয়া রাজপুত্র’-খ্যাত মুস্তাফা জামান আব্বাসী। তিনি কেবল একজন সাধারণ কণ্ঠশিল্পীই নন, বরং বাংলার লোকগান, ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি এবং ইসলামি সংগীতের এক অনবদ্য ও জীবন্ত আর্কাইভ। আধুনিক শহুরে সভ্যতার ডামাডোলে যখন গ্রামীণ লোকজ সুরগুলো হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন তিনি চারণকবির মতো গ্রামে গ্রামে ঘুরে সেই সুরগুলো সংগ্রহ করেছেন। তিনি তার পিতা, উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতসম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদের রেখে যাওয়া বিশাল সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে কেবল ধারণই করেননি, বরং নিজ মেধা, মনন, নিরলস প্রচেষ্টা ও গবেষণার মাধ্যমে তাকে এক অনন্য তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
দুই
পারিবারিক উত্তরাধিকার ও শেকড়ের সন্ধান
মানুষের আত্মপরিচয় ও মনন গঠনে তার জন্মস্থান এবং পারিবারিক আবহের প্রভাব অনস্বীকার্য। মুস্তাফা জামান আব্বাসীর জীবনের পরতে পরতে এই সত্যটি গভীরভাবে প্রোথিত। ১৯৩৭ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি এমন এক পুণ্যভূমিতে জন্মগ্রহণ করেন, যা যুগ যুগ ধরে বাংলার লোকজ সুরের এক উর্বর চারণভূমি হিসেবে পরিচিত। তার জন্মস্থান কোচবিহারের বলরামপুর গ্রাম, যার পাশ দিয়ে কুলকুল রবে বয়ে চলেছে ঐতিহাসিক কালজানি নদী। কালজানি নদীর স্রোতের ধ্বনি আর বিস্তীর্ণ প্রান্তরের রাখালিয়া বাঁশির সুর যেন শিশুকাল থেকেই তার অস্থিমজ্জায় মিশে গিয়েছিল। এই ভৌগোলিক পরিবেশই তাকে ভাওয়াইয়া গানের সেই অকৃত্রিম টান ও দরদ আত্মস্থ করতে সাহায্য করেছিল।
তবে কেবল জন্মস্থান নয়, মুস্তাফা জামান আব্বাসী যে পারিবারিক উত্তরাধিকার নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন, তা ছিল বাংলার ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। তিনি বেড়ে ওঠেন এমন একটি সমৃদ্ধ, রক্ষণশীল অথচ উচ্চমাত্রার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে, যেখানে শিল্পের চর্চা ও মেধার বিকাশ ছিল প্রাত্যহিক জীবনের অংশ। তার পিতা ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত লোকসংগীত সম্রাট, কিংবদন্তি ও মরমি কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ। বিশ শতকের প্রথমার্ধে যখন বাঙালি মুসলমান সমাজ চরম আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগছিল, তখন আব্বাসউদ্দীন আহমদই তার জাদুকরী কণ্ঠ ও লোকজ সুরের মাধ্যমে এই পিছিয়ে পড়া সমাজকে তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক শেকড় চিনতে শিখিয়েছিলেন। পিতার এই ঐতিহাসিক যাত্রার নীরব সাক্ষী ছিলেন শিশুপুত্র মুস্তাফা জামান (পারিবারিক ডাকনাম ‘তুলু’)। পিতার রেওয়াজ, সুরের প্রতি আত্মনিবেদন এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা—সবকিছুই তিনি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
তার এই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার কেবল পিতার দিক থেকেই আসেনি, বরং সমগ্র বংশলতিকায় ছড়িয়ে ছিল মেধা ও মননের দ্যুতি। তার পিতামহ মৌলভী জাফর আলী ছিলেন বৃহত্তর রংপুরের একজন বিশিষ্ট ও প্রতাপশালী আইনজীবী। অন্যদিকে চাচা আবদুল করিম ছিলেন একাধারে গীতিকার, কবি ও নাট্যকার। আবার তার মা লুৎফুন্নেসা আব্বাস ছিলেন বৃহত্তর নীলফামারীর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান এবং নিজে একজন অত্যন্ত গুণী লেখিকা। মায়ের রচিত ‘শেষ বিকালের কান্না’ বা ‘সময় কথা বলে’-এর মতো গ্রন্থগুলো প্রমাণ করে যে, মুস্তাফা জামান আব্বাসী পিতার কাছ থেকে যেমন পেয়েছেন সুরের ঐশ্বর্য, তেমনি মায়ের কাছ থেকে পেয়েছেন সাহিত্যের গভীরতা।
১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভাগের রাজনৈতিক ও সামাজিক পালাবদল এই পরিবারের জীবনেও এক বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। দেশভাগের পর আব্বাসউদ্দীন আহমদ সপরিবারে নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন। পুরনো পল্টনে তারা গড়ে তোলেন তাদের নতুন ঠিকানা—ঐতিহাসিক ‘হীরামন মঞ্জিল’। দীর্ঘ ৫০ বছর এই বাড়িটি কেবল একটি বাসস্থান ছিল না, বরং তা হয়ে উঠেছিল তৎকালীন পূর্ব বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার এক অঘোষিত তীর্থস্থান। এই বাড়ির আঙিনাতেই সমবেত হতেন দেশের দিকপাল কবি, সাহিত্যিক ও সংগীতশিল্পীরা। এমন একটি সতেজ ও প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক আবহাওয়ায় মুস্তাফা জামান আব্বাসী এবং তার ভাই-বোনেরা (সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল এবং প্রখ্যাত শিল্পী ফেরদৌসী রহমান) বড় হয়ে ওঠেন।
সাংস্কৃতিক আবহের পাশাপাশি মুস্তাফা জামান আব্বাসীর শিক্ষাজীবনও ছিল অত্যন্ত বর্ণাঢ্য ও ঈর্ষণীয়। কোচবিহারের জেনকিন্স স্কুল ও কলকাতার মডার্ন স্কুল হয়ে ঢাকায় আসার পর তিনি স্বনামধন্য সেন্ট গ্রেগরিজ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫৪ সালে সেখান থেকে তিনি মেধা তালিকায় ১৩তম স্থান এবং ১৯৫৬ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকে ১৪তম স্থান অধিকার করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি বেছে নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগকে। ১৯৫৯ সালে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬০ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ইতিহাস পাঠের এই নেপথ্য ভিত্তি তার জীবনে এক যুগান্তকারী প্রভাব ফেলেছিল। ইতিহাস কেবল তার কাছে শুষ্ক পাঠ্যপুস্তকের বিষয় বা পরীক্ষার খাতায় আবদ্ধ কোনো বিষয় ছিল না; বরং তা তাকে বাংলার শেকড়, সমাজকাঠামো এবং লোকজ ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক বিবর্তন গভীরভাবে অনুধাবন করতে সাহায্য করেছিল। ইতিহাসের এই তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং লোকজ সুরের প্রতি পারিবারিক আবেগ—এই দুইয়ের অপূর্ব মেলবন্ধনেই তিনি পরবর্তী জীবনে বাংলার লোকায়ত ইতিহাসের এক অনন্য গবেষক ও রূপকারে পরিণত হন।
তিন
লোকসংগীতের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক পুনর্জাগরণ
মুস্তাফা জামান আব্বাসীর সংগীতসাধনা কেবল গ্রামীণ লোকগানের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ ও সহজাত প্রতিভার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এর পেছনে ছিল দীর্ঘ শাস্ত্রীয় কাঠামোর এক সুকঠিন ও নিরবচ্ছিন্ন অনুশীলন। একটি লোকগানের সুরকে কীভাবে শাস্ত্রীয় ব্যাকরণের ছাঁচে ফেলে আরো নিখুঁত, নান্দনিক ও সর্বজনীন করে তোলা যায়, সেই তাত্ত্বিক ভিত্তি তিনি শৈশব থেকেই গড়ে তুলেছিলেন। তার সংগীতে হাতেখড়ি হয়েছিল উপমহাদেশের প্রখ্যাত ঠুমরি বিশেষজ্ঞ ওস্তাদ জমির উদ্দীন খাঁর সুযোগ্য ভ্রাতুষ্পুত্র ওস্তাদ কাদের জমিরীর স্নেহধন্য সাহচর্যে। শাস্ত্রীয় সংগীতের এই বুনিয়াদি শিক্ষাকে আরো সুদৃঢ় করতে তিনি দীর্ঘ এক যুগ ওস্তাদ মুন্সী রইছ উদ্দীনের কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতের কঠোর তালিম নেন। এছাড়াও ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ খাঁ, ওস্তাদ সালামত আলী খাঁ, ওস্তাদ নাজাকাত আলী খাঁ এবং ওস্তাদ আসাদ আলী খাঁর মতো উপমহাদেশের দিকপাল ধ্রুপদি সাধকদের সান্নিধ্য তিনি লাভ করেন। এই সুদীর্ঘ ধ্রুপদি তালিম তার কণ্ঠে এমন এক গাম্ভীর্য, পরিশীলিত উচ্চারণ এবং সুরের জ্যামিতিক নিখুঁততা তৈরি করেছিল, যা তিনি পরবর্তী সময়ে বাংলার লোকগানকে একটি ধ্রুপদি ও শাস্ত্রীয় মর্যাদায় তুলে ধরার কাজে নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন।
শাস্ত্রীয় সংগীতের এই কঠিন ব্যাকরণ আয়ত্ত করার পাশাপাশি শেকড়ের সুরের প্রতি তার টান বিন্দুমাত্র কমেনি। লোকসংগীতের মর্মমূলে প্রবেশ করতে তিনি সান্নিধ্য লাভ করেন তৎকালীন প্রখ্যাত লোকসংগীতজ্ঞদের। কিংবদন্তি দোতারা বাদক ও সুরকার কানাই লাল শীল, মফিজুল ইসলাম, বেদার উদ্দীন আহমেদ, আবদুল হালিম চৌধুরী এবং মমতাজ আলী খানের মতো গুণীদের সাহচর্য তাকে বাংলার ধুলোমাখা মাটির কাছাকাছি নিয়ে যায়। ধ্রুপদি সংগীতের গাম্ভীর্য এবং লোকগানের মাটির টান—এই দুইয়ের অপূর্ব সমন্বয়ে তিনি লোকসংগীতের এক নতুন প্রায়োগিক ধারা তৈরি করেন।
বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও পুনর্জাগরণে মুস্তাফা জামান আব্বাসীর সবচেয়ে যুগান্তকারী এবং ঐতিহাসিক অবদান হলো লালন সাঁইজির গানের মূল সুর বা আদি সুর সংরক্ষণ। ষাটের দশকের শুরুর দিকে শহুরে সভ্যতায় বা নাগরিক সমাজে লালন ফকিরের গান ছিল প্রায় অচেনা এবং চরম অবহেলিত। রেডিও বা আধুনিক জলসাগুলোতে যে দু-একটি গান গাওয়া হতো, তা-ও নাগরিক বাদ্যযন্ত্রের প্রভাবে অনেকাংশে বিকৃত সুরে গাওয়া হতো। নিজস্ব সুরের এই বিকৃতি রোধ করতে ১৯৬৪ সালে লোকসাহিত্য গবেষক অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুর উদ্দীনের পরামর্শে আব্বাসী এক দুঃসাহসিক ও ঐতিহাসিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে কুষ্টিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লালনের আখড়াবাসী ১০ জন প্রখ্যাত বাউল সাধককে ঢাকায় পুরনো পল্টনের নিজ বাড়িতে (হীরামন মঞ্জিলে) আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে আসেন। এই বাউলদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বেহাল শাহ, খোদা বকশ বিশ্বাস, ঝাড়ু শাহ এবং জোনাব আলী মল্লিক, যারা বংশপরম্পরায় লালনের অকৃত্রিম সুর বুকে ধারণ করে আসছিলেন। আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের কোনো কৃত্রিমতা ছাড়াই, কেবল একতারা, ডুগডুগি আর দোতারার অনুষঙ্গে তিনি টেপরেকর্ডারের মাধ্যমে এই বাউলদের নিজ কণ্ঠে গাওয়া লালন ফকিরের মূল সুরের প্রায় ৩০০টি গান সযত্নে ধারণ করেন।
এই টেপরেকর্ডিং কেবল কয়েকটি গান সংরক্ষণের বিষয় ছিল না; বরং এটি ছিল বাংলার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক বিশাল দলিল বা আর্কাইভ নির্মাণের এক অভাবনীয় কাজ। এই সংগ্রহের ওপর ভিত্তি করেই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনে লালনগীতি তার আদি ও অকৃত্রিম সুরে প্রচারিত হতে শুরু করে। আধুনিক প্রজন্মের শিল্পীরা লালন সাঁইজির গানের প্রকৃত রূপটি অনুধাবন করার সুযোগ পান। একজন সাধারণ কণ্ঠশিল্পীর খোলস ছেড়ে মুস্তাফা জামান আব্বাসী এই একটি কাজের মাধ্যমেই নিজেকে একজন শ্রেষ্ঠ এথনোমিউজিকোলজিস্ট (নৃতাত্ত্বিক সংগীত বিশারদ) এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাস রক্ষার এক অকুতোভয় নায়কে পরিণত করেন।
চার
গণমাধ্যম ও বিশ্বমঞ্চে বাংলার মাটির সুর
গণমাধ্যমের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে লোকজ সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারে মুস্তাফা জামান আব্বাসী যে বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেছেন, তা বাংলাদেশের সম্প্রচার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। ১৯৪৭ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে বেতারে একটি নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে তার সম্প্রচার জীবনের শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে তিনি গণমাধ্যমকে বাংলার শেকড় সন্ধানের হাতিয়ারে পরিণত করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বাংলাদেশ বেতারের জন্মলগ্ন থেকেই তিনি লোকসংগীতকে গণমানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। ষাট ও সত্তরের দশকে নাগরিক জীবনে যখন আধুনিক বাদ্যযন্ত্রনির্ভর সংগীতের প্রভাব বাড়ছে, ঠিক সে সময়ে তিনি ‘ভরা নদীর বাঁকে’, ‘লৌকিক বাংলা’ এবং ‘আমার ঠিকানা’র মতো অনুষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এক নীরব সাংস্কৃতিক জাগরণ তৈরি করেন।
এই অনুষ্ঠানগুলো কেবল গতানুগতিক বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; বরং এগুলো ছিল বাংলার অবহেলিত জনপদের প্রতি এক নৃতাত্ত্বিক যাত্রা। তার জাদুকরী ও প্রাঞ্জল উপস্থাপনায় গ্রাম-বাংলার উপেক্ষিত বাউল, বয়াতি ও সাধারণ লোকশিল্পীরা বিটিভির পর্দায় উঠে আসেন। এর ফলে গ্রামীণ লোকজ সুর শহরের শিক্ষিত ও অভিজাত শ্রেণির ড্রয়িংরুমে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া বিটিভিতে তার দীর্ঘ ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ‘বাঁশরী’ ও ‘হিজলতমাল’ অনুষ্ঠান দুটি লোকজ ঐতিহ্যকে নাগরিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছিল। বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীর। তার দরদি কণ্ঠে গাওয়া ‘নিশীথে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা’, ‘ওকি ও বন্ধু কাজল ভ্রমরারে’, ‘আয় মোর জানিয়াও জানেন না’, ‘ধীরে বোলাও গাড়ি রে গাড়িয়াল’ কিংবা ‘ওকি প্রাণের বন্ধুরে’ প্রভৃতি গানগুলো কেবল জনপ্রিয়ই হয়নি, বরং তা বাঙালির সামষ্টিক স্মৃতির অংশে পরিণত হয়েছে। ভাওয়াইয়ার এই বিরহকাতর সুরগুলোর মাধ্যমে তিনি বাংলার শাশ্বত প্রেম ও যাপিত জীবনের আর্তিকেই মূর্ত করে তুলেছেন।
দেশের গণমাধ্যমের সীমানা পেরিয়ে মুস্তাফা জামান আব্বাসী আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলার মাটির সুরের একনিষ্ঠ ও সফল ফেরিওয়ালা হিসেবে কাজ করেছেন। পৃথিবীর অন্তত ৪০টি দেশ ভ্রমণ করে তিনি ভিনদেশি শ্রোতাদের সামনে বাংলার লোকগানের ঐশ্বর্য, দার্শনিক গভীরতা ও সমৃদ্ধি তুলে ধরেছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার এই শাস্ত্রীয় ও সাংগীতিক প্রজ্ঞার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি মেলে ইউনেস্কোর তত্ত্বাবধানে। ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল কমিটি অব মিউজিক’-এর সভাপতি হিসেবে তিনি দীর্ঘ ১১ বছর অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, যা বিশ্বমঞ্চে তার প্রাতিষ্ঠানিক ও শৈল্পিক গ্রহণযোগ্যতারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
শেকড়ের সন্ধানী এই মানুষটি কেবল বিশ্বমঞ্চে গান গেয়েই ক্ষান্ত হননি; তিনি নিরলসভাবে কয়েক হাজার লোকগান সংগ্রহ করেছেন। তার সযত্ন সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘ভাওয়াইয়ার জন্মভূমি’ (দুই খণ্ড) এবং ‘ভাটির দ্যাশের ভাটিয়ালি’ গ্রন্থগুলোতে এই অমূল্য সম্পদগুলো সংরক্ষিত হয়েছে। বাংলার গ্রামীণ কৃষক, নদীর মাঝি এবং ধুলোমাখা পথের গরুর গাড়ির চালকের অলিখিত গানকে তিনি লিখিত দলিল হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছেন। এর মাধ্যমে মুস্তাফা জামান আব্বাসী মূলত বাংলার খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের জীবনসংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কেই বিশ্বজনীন মর্যাদায় সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।
পাঁচ
ইসলামি সংগীত ও আধ্যাত্মিক চেতনার প্রসার
বাংলার লোকজ সংস্কৃতির পাশাপাশি এ দেশের আপামর মুসলমানদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির এক বিশাল স্থান জুড়ে রয়েছে ইসলামি সংগীত, হামদ ও নাত। বিশ শতকের প্রথমার্ধে যখন বাঙালি মুসলমানরা আত্মপরিচয়ের সংকটে নিমজ্জিত, তখন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং লোকসংগীত সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদের ঐতিহাসিক যুগলবন্দি বাংলার মুসলিম সমাজে ইসলামি সংগীতের যে অভূতপূর্ব নবজাগরণ ঘটিয়েছিল, মুস্তাফা জামান আব্বাসী সেই সুমহান ঐতিহ্যের একজন যোগ্য ও সার্থক উত্তরসূরি। পিতার কণ্ঠে গীত হওয়া কালজয়ী গানগুলো তিনি কেবল ধারণই করেননি, বরং পরম মমতায় ও গভীর আত্মিক নিবেদনে যুগে যুগে সাধারণ মানুষের চেতনায় সজীব রেখেছেন। পবিত্র ঈদুল ফিতরের চিরায়ত আনন্দগাথা ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’ কিংবা ইমানের দৃঢ়তা বৃদ্ধিকারী ‘তৌফিক দাও খোদা ইসলামে’-এর মতো সুরগুলো তার ভরাট, গাম্ভীর্যপূর্ণ ও সুমধুর কণ্ঠে এক নতুন আধ্যাত্মিক মাত্রা লাভ করেছে। বিশেষ করে তার দরদি কণ্ঠে গাওয়া প্রখ্যাত নাত-এ-রাসুল ‘বালাগাল উলা বি-কামালিহি’ দশকের পর দশক ধরে এ দেশের কোটি শ্রোতার হৃদয়কে এক ঐশী প্রেমে আপ্লুত করে রেখেছে। বাদ্যযন্ত্রের বাহুল্য এড়িয়ে কেবল কণ্ঠের কারুকাজে তিনি ইসলামি সংগীতে স্রষ্টার প্রতি বিনম্র আত্মনিবেদনের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা সত্যিই বিরল।
মুস্তাফা জামান আব্বাসীর এই আধ্যাত্মিক চেতনা কেবল সুর ও কণ্ঠের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা অত্যন্ত গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তার মননশীল সাহিত্যকর্মে। সংগীতের মঞ্চ থেকে বেরিয়ে তিনি যখন কলম হাতে তুলে নিয়েছেন, সেখানেও তার পরম করুণাময় ও তার রাসুলের প্রতি অকৃত্রিম প্রেমের শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, দর্শন ও আদর্শ নিয়ে ‘মুহাম্মদের নাম’ নামক ৫০০ পৃষ্ঠার এক সুবিশাল ও অনবদ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। এই গ্রন্থটি নিছক কোনো প্রথাগত জীবনী নয়; বরং এটি আধুনিক মনন ও সাহিত্যের আলোকে রাসুলপ্রেমের এক অনিন্দ্যসুন্দর দলিল, যা বাংলার ইসলামি সাহিত্যের ভান্ডারে এক অমূল্য সংযোজন। এছাড়া তার সংকলিত ও অনূদিত ‘বাণী: হজরত মুহাম্মদ (সা.)’ গ্রন্থটি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে লক্ষাধিক কপি বিক্রি হয়, যা তার লেখনীর প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর আস্থারই প্রমাণ বহন করে।
ধর্মীয় জ্ঞান ও ঐশী বাণীকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার এক প্রবল তাগিদ তিনি সবসময় অনুভব করেছেন। সেই তাগিদ থেকেই নতুন প্রজন্মের পাঠকদের সহজে অনুধাবনের উপযোগী করে তিনি পবিত্র কোরআনের একটি সমসাময়িক ও আধুনিক অনুবাদ সম্পন্ন করেছেন, যার নাম দিয়েছেন ‘স্পষ্ট জ্যোতি আল কোরআন’। এর মাধ্যমে তিনি কোরআনের শাশ্বত বাণীকে আধুনিক বাংলার প্রাঞ্জল রূপে উপস্থাপন করেছেন। এর পাশাপাশি ইসলামি আধ্যাত্মিকতা বা সুফিবাদের প্রতি তার যে গভীর অনুরাগ, তার অপূর্ব প্রকাশ ঘটেছে তার নানাবিধ সুফি সাহিত্য রচনায়। ‘গাফিল (সুফি কবিতা)’, ‘রুমির অলৌকিক বাগান’ এবং বিশ্ববিখ্যাত মরমি সাধক জালালউদ্দিন রুমি, ইবনে নিফফারি, সুলতান বাহু প্রমুখের কালজয়ী রচনার সার্থক অনুবাদের মধ্য দিয়ে তিনি সুফিবাদের মূল নির্যাসকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে সহজবোধ্য করেছেন। প্রেম, মানবতা ও স্রষ্টার নৈকট্য লাভের যে সুফি দর্শন যুগে যুগে মানুষকে আলোর পথ দেখিয়েছে, আব্বাসী তার এই আধ্যাত্মিক গ্রন্থগুলো রচনা ও অনুবাদের মাধ্যমে সেই সুমহান ঐতিহ্য ও দর্শনকে বাংলা ভাষায় এক শক্তিশালী ও স্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন।
ছয়
সাহিত্যিক ও গবেষক আব্বাসী : ঐতিহ্যের লিখিত দলিল
মুস্তাফা জামান আব্বাসী কেবল একজন সুরের সাধক বা কণ্ঠশিল্পীই নন; তিনি একাধারে একজন মননশীল প্রাবন্ধিক, দক্ষ অনুবাদক, সংবেদনশীল ঔপন্যাসিক এবং শিকড়সন্ধানী গবেষক। সাধারণত যিনি মঞ্চের বা মাইক্রোফোনের শিল্পী হন, তার কলম ততটা সরব থাকে না; কিন্তু আব্বাসীর ক্ষেত্রে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সুরের জগতের পাশাপাশি বিগত কয়েক দশক ধরে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে সাহিত্য সাধনা করে চলেছেন। প্রবন্ধ, অনুবাদ, আত্মজীবনী, উপন্যাস, কাব্যগ্রন্থ এবং রম্য রচনাসহ বিচিত্র সব বিষয়ে তিনি প্রায় ৬০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা বাংলার সাহিত্য ও গবেষণার ভান্ডারকে অনন্য মাত্রায় সমৃদ্ধ করেছে।
বিশেষ করে বাংলার লোকসংগীতের তাত্ত্বিক, ব্যাকরণগত ও ইতিহাসভিত্তিক গবেষণায় তার অবদান অবিস্মরণীয়। লোকসংগীত নিয়ে তার রচিত ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলার লোকসংগীত’, ‘প্রাণের গীত’, ‘লঘু সংগীতের গোড়ার কথা’ কিংবা ‘ভাওয়াইয়ার জন্মভূমি’ প্রভৃতি গ্রন্থ বর্তমানে লোকজ সংস্কৃতি গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য অপরিহার্য আকরগ্রন্থ বা রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত। এই গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে তিনি বাংলার অলিখিত ও লোকমুখে প্রচলিত লোকজ ঐতিহ্যকে সুনির্দিষ্ট ও প্রামাণ্য লিখিত দলিলে রূপান্তরিত করেছেন।
গবেষণার পাশাপাশি সৃজনশীল কথাসাহিত্যেও তার বিচরণ অত্যন্ত সগর্ব। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো আধুনিক সংকটকে উপজীব্য করে তিনি রচনা করেছেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রথম পরিবেশবাদী উপন্যাস ‘কালজানির ঢেউ’। নিজের শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত কালজানি নদীর প্রেক্ষাপটে লেখা এই উপন্যাস তার আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মননশীলতার পরিচায়ক। অন্যদিকে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও যন্ত্রণাকে উপজীব্য করে রচিত ‘পুড়িব একাকী’ উপন্যাসটি বাংলা কথাসাহিত্যে এক অনবদ্য সংযোজন। এছাড়া তার রচিত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘জীবন নদীর উজানে’ কেবল তার ব্যক্তিগত জীবনের বয়ান নয়, বরং এটি সমসাময়িক বাংলার সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল।
সাহিত্য সৃষ্টির পাশাপাশি ইতিহাস ও ঐতিহ্য চর্চাকে একটি স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে (আইইউবি) ‘কাজী নজরুল ইসলাম এবং আব্বাসউদ্দীন আহমদ রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডি সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সেন্টারের মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত করেছেন যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা বাংলার এই দুই দিকপালের সাহিত্য, সুর, দর্শন ও আদর্শ নিয়ে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ ও উচ্চতর গবেষণা করতে পারে।
সাহিত্য ও গবেষণায় তার এই বহুমুখী ও অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১০ সালে জাতীয় প্রেস ক্লাব তাকে ‘অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক’ হিসেবে সম্মানিত করে। তার লেখনীর গভীরতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বোদ্ধাদেরও মুগ্ধ করেছে। তার রচিত আত্মজীবনী পড়ে নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন মন্তব্য করেছিলেন যে, এই বইটি তার পিতার কণ্ঠে শোনা উদ্দীপ্ত গানেরই এক অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা। একইভাবে নোবেলবিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস আব্বাসীর নজরুলবিষয়ক গবেষণার প্রশংসা করে বলেছিলেন, স্বনামধন্য এই ব্যক্তিত্ব জাতীয় কবিকে নিয়ে এত চমৎকার ও নিবিড় গবেষণাধর্মী সাহিত্য রচনা করতে পারেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। সুরের জাদুকর আব্বাসীর কলম এভাবেই বাংলার ঐতিহ্য বিনির্মাণের এক চিরস্থায়ী লিখিত দলিলে পরিণত হয়েছে।
সাত
ঐতিহাসিক পরম্পরা : তিতুমীর ও শরীয়তউল্লাহর সাংস্কৃতিক উত্তরসূরি
ইতিহাসের পাতায় শহীদ তিতুমীর এবং ফরায়েজি আন্দোলনের রূপকার হাজী শরীয়তউল্লাহর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে আছে বাংলার কৃষক সমাজ, মেহনতি জনতা ও নিম্নবিত্ত মানুষের অধিকার আদায়ের আপসহীন সংগ্রামের জন্য। তারা কেবল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসক কিংবা দেশীয় অত্যাচারী শোষক জমিদারদের হাত থেকে বাংলার সাধারণ মানুষকে মুক্ত করতেই চাননি; বরং তারা চেয়েছিলেন এই জনপদের অবহেলিত মানুষের নিজস্ব ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক স্বকীয়তা এবং আত্মমর্যাদাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে। বাঁশের কেল্লা কিংবা ফরায়েজি আন্দোলন ছিল মূলত শেকড়বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিরুদ্ধে প্রান্তিক মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার এক ঐতিহাসিক লড়াই। শতাব্দীর পটপরিবর্তনে সময়ের প্রয়োজনে সেই সংগ্রামের বাহ্যিক রূপ হয়তো বদলেছে, কিন্তু তার মূল নির্যাস বা স্পিরিট একই রয়ে গেছে। বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই অস্তিত্বের লড়াই রূপ নিয়েছে এক তীব্র সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে। আধুনিকতা, বিশ্বায়নের প্রবল আগ্রাসন, প্রযুক্তির ডামাডোল এবং ভিনদেশি সংস্কৃতির নিরবচ্ছিন্ন আধিপত্যের মুখে বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি, শেকড়ের লোকজ সুর ও ইসলামি ঐতিহ্য যখন চরম হুমকির সম্মুখীন, তখন মুস্তাফা জামান আব্বাসী সেই হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের হাল ধরেন। তলোয়ারের বদলে তিনি তার অসামান্য মেধা, সুমধুর কণ্ঠ, ক্ষুরধার কলম এবং গবেষণাকে হাতিয়ার করে এই নব পর্যায়ের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের যোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছেন।
বিশ শতকের শুরুতে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ যেমন বাংলার অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ মুসলমানদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগসহ নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে তাদের সমাজের মূলধারায় সসম্মানে নিয়ে এসেছিলেন, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ঠিক একই মাপের ঐতিহাসিক কাজটি করেছেন লোকসংগীত সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদ ও তার সুযোগ্য উত্তরসূরি মুস্তাফা জামান আব্বাসী। একসময় যে গানগুলো শহুরে বাবু শ্রেণিরা কেবল ‘চাষাভুষার গান’ বা প্রান্তিক মানুষের সস্তা বিনোদন বলে অবজ্ঞা করত, সেই গ্রামীণ সংস্কৃতির ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি আর মারফতিকে তারা শহুরে শিক্ষিত ও অভিজাত সমাজের কাছে কেবল গ্রহণযোগ্যই করে তোলেননি, বরং তাকে এক ধ্রুপদি ও উচ্চমার্গীয় মর্যাদায় সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। তারা তাদের আজীবন সাধনার মধ্য দিয়ে অত্যন্ত শক্তভাবে এই সত্যটি প্রমাণ করেছেন যে, বাইরের কোনো ধার করা আভিজাত্যের মাঝে নয়, বরং বাংলার এই কাদামাটি মাখা গ্রামীণ মানুষের সংস্কৃতির মাঝেই নিহিত রয়েছে প্রকৃত ও শাশ্বত বাঙালি সত্তা।
লালন সাঁইজির মরমি দর্শনকে শহুরে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করা, গ্রাম থেকে প্রামাণ্য বাউলদের ঢাকায় এনে আদি সুর সংরক্ষণ করা, কিংবা উত্তরের জনপদ চষে বেড়িয়ে ভাওয়াইয়ার শেকড়সন্ধানী যে ঐতিহাসিক কাজ মুস্তাফা জামান আব্বাসী করেছেন, তা কোনো সাধারণ বিনোদনমূলক সংগীতচর্চা নয়। এটি মূলত বাংলার হারিয়ে যাওয়া আত্মারই এক সাহসী পুনরুদ্ধার। বাংলার মাটির সুর ও ইসলামি ঐতিহ্যের যে মেলবন্ধন তিনি তার সারা জীবনের কর্মে ঘটিয়েছেন, তা তিতুমীর বা শরীয়তউল্লাহর সামাজিক দর্শনেরই এক পরিশীলিত সাংস্কৃতিক রূপ। সেই বিস্তৃত ঐতিহাসিক পটভূমিতে বিচার করলে মুস্তাফা জামান আব্বাসী কেবল একজন গায়ক, উপস্থাপক বা লেখক নন; বরং তিনি বাংলার সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার একজন অতন্দ্র প্রহরী এবং বাঙালি জাতির ঐতিহ্য বিনির্মাণের এক অবিসংবাদিত নায়ক।
আট
মুস্তাফা জামান আব্বাসীর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন একটি জাতির সাংস্কৃতিক নির্মাণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শৈশবের হীরামন মঞ্জিল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল—সর্বত্র তিনি বাংলার ধূলিমলিন মাটি ও মানুষের গন্ধ ছড়িয়েছেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৯৫ সালে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘একুশে পদক’ লাভ করেন। সমাজসেবায় অ্যাপেক্স ফাউন্ডেশন অ্যাওয়ার্ড, বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ, চ্যানেল আই আজীবন সম্মাননা, এবং ভাওয়াইয়া অঙ্গন কর্তৃক ‘ভাওয়াইয়া রাজপুত্র’ উপাধিসহ শতাধিক পুরস্কারে তিনি ভূষিত হয়েছেন।
তবে তার প্রকৃত অর্জন এসব পদকের চেয়েও অনেক বিশাল। তার সবচেয়ে বড় কীর্তি হলো তিনি একটি জাতির বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া শেকড়কে পুনরায় সংযুক্ত করেছেন। তিতুমীর বা শরীয়তউল্লাহ যেমন বাংলার মানুষের বাঁচার অধিকার নিয়ে লড়েছিলেন, মুস্তাফা জামান আব্বাসী লড়েছেন বাঙালির সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। ভাওয়াইয়ার করুণ সুর, লালনের মরমি দর্শন এবং ইসলামি আধ্যাত্মিকতার যে সুমহান ঐতিহ্য তিনি তার কণ্ঠ, কলম এবং গবেষণার মাধ্যমে বিনির্মাণ করেছেন, তা অনন্তকাল ধরে বাঙালি জাতিকে তাদের আত্মপরিচয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। মুস্তাফা জামান আব্বাসী তাই বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে নিছক একজন ব্যক্তি নন, তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান এবং ঐতিহ্য বিনির্মাণের এক অবিস্মরণীয় নায়ক।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ; সভাপতি, ইন্টেলেকচুয়াল রিসার্চ সেন্টার (আইআরসি)
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

