ডা. জেমস ওয়াইজের বিবরণ
সিলেট শহরের টোলতকর মহল্লায় বাস করতেন বোরহানুদ্দিন নামে এক মুসলমান। সেই মহল্লায় তিনি ছিলেন একমাত্র মুসলমান। জীবনে তার একটাই অভাব ছিল—একটি পুত্রসন্তান। তিনি আল্লাহর কাছে সন্তানের জন্য দোয়া করতেন। একদিন গভীর আবেগ নিয়ে তিনি মানত করলেন, ‘যদি আল্লাহ আমাকে একটি পুত্রসন্তান দান করেন, তবে আমি তার সন্তুষ্টির জন্য গরু কোরবানি করব।’
আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া কবুল করলেন। কিছুদিন পর তার ঘর আলো করে একটি পুত্রসন্তান জন্ম নিল । তার মন আনন্দে ভরে উঠল। তবে নিজের মানতের কথা তিনি ভুললেন না।
কিন্তু পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তার আশপাশের সবাই হিন্দু; গরু কোরবানিকে তারা গর্হিত অপরাধ মনে করে। তাই তিনি গোপনে কোরবানি সম্পন্ন করলেন। কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।
কোরবানির পর হঠাৎ একটি চিল গরুর মাংসের ছোট্ট টুকরো ছোঁ মেরে তুলে নিল। উড়তে উড়তে সেটি গিয়ে পড়ল এক ব্রাহ্মণের বাড়ির আঙিনায়। ব্রাহ্মণের বাড়িতে গরুর মাংস! মুহূর্তেই ক্ষোভে ফেটে পড়ল চারদিক। কে এমন দুঃসাহস করল?
খবর পৌঁছে গেল তৎকালীন সিলেটের হিন্দু রাজা গৌড়গোবিন্দের দরবারে। ব্রাহ্মণ বিচার দাবি করল। রাজাও প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে আদেশ গেল, বোরহানুদ্দিনকে দরবারে হাজির করা হোক।
দরবারে উপস্থিত হয়ে বোরহানুদ্দিন স্বীকার করলেন, আল্লাহর উদ্দেশে মানত পূরণের জন্য তিনি গরু কোরবানি করেছেন। তার স্বীকারোক্তির পর নেমে এলো নির্মম শাস্তি। নিষ্ঠুর আদেশে তার নিষ্পাপ শিশুপুত্রকে হত্যা করা হলো, আর বোরহানুদ্দিনের একটি হাত কেটে নেওয়া হলো।
সেই সময় বাংলার মসনদে অধিষ্ঠিত ছিলেন সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ। গৌড় নগরে বসত তার রাজদরবার। দূর সিলেটে ঘটে যাওয়া নির্মম ঘটনার ভার বইতে না পেরে আহত ও শোকাহত বোরহানুদ্দিন গেলেন সুলতানের দরবারের উদ্দেশে। বুকভরা বেদনা নিয়ে তিনি তুলে ধরলেন নিজের আর্তনাদ, একটি নিষ্পাপ শিশুর হত্যার কাহিনি এবং একজন নিরপরাধ মানুষের ওপর চালানো নিষ্ঠুর অত্যাচারের বিবরণ।
সুলতান এই সংবাদ শুনে গভীরভাবে মর্মাহত হলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এই জুলুমের প্রতিকার করতেই হবে।
সুলতানের নির্দেশে সেনাপতি সিকান্দার খান গাজীর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী সিলেটের দিকে অগ্রসর হলো। শুরু হলো সংঘর্ষ। কিন্তু গৌড়গোবিন্দের দুর্গম রাজ্য, তার সুসজ্জিত সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় প্রতিরোধের সামনে প্রথম অভিযানগুলো সফল হলো না। পাহাড়-জঙ্গল আর নদীনালায় ঘেরা সিলেট যেন অদৃশ্য এক প্রতিরক্ষা বলয়ে আবৃত ছিল।
ঠিক সেই সময় ইতিহাসের মঞ্চে আবির্ভূত হলেন একজন আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ—শাহজালাল। দূর ইয়েমেনের ভূমি থেকে আগত এই সাধক ছিলেন উত্তর-পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে প্রেরণার নাম। তার সঙ্গে ছিলেন অসংখ্য সঙ্গী ও দরবেশ, তাদের হৃদয় ছিল ঈমানের দৃঢ়তায় উজ্জ্বল।
শাহজালালের আগমন শুধু একটি সামরিক অভিযানে নতুন শক্তিই যোগ করেনি; এটি মানুষের মনে সাহস, আত্মবিশ্বাস ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় সৃষ্টি করেছিল। তার আত্মিক প্রেরণা, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিস্থিতির মোড় ঘুরে গেল। অবশেষে গৌড়গোবিন্দের শক্তি পরাজিত হলো, আর সিলেটে প্রতিষ্ঠিত হলো মুসলিম শাসন।
(Note on Shah Jalal, the Patron Saint of Silhat, ডা. জেমস ওয়াইজ, জার্নাল অব দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল-১৮৭৩, পৃষ্ঠা: ২৮০)
ফ্রান্সিস ব্র্যাডলি বার্টের বিবরণ
বিক্রমপুরের অন্তর্গত রামপালের অদূরে ছিল আবদুল্লাহপুর গ্রাম। চারদিকে হিন্দু জনপদে ঘেরা সেই অঞ্চলে বাস করত এক মুসলমান পরিবার। বাংলায় মুসলিম আগমনের প্রাথমিক যুগে যারা এ ভূখণ্ডে এসে বসতি গড়েছিল, এ পরিবার ছিল তাদেরই অন্যতম।
কিন্তু গৃহকর্তার জীবনে ছিল এক গভীর বেদনা—তার কোনো সন্তান ছিল না। দিনের পর দিন বছরের পর বছর তিনি আল্লাহর কাছে সন্তান প্রার্থনা করতেন। এই অপূর্ণতা তার মনকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছিল; সংসারের সব সুখ যেন তার কাছে নিরর্থক হয়ে উঠেছিল।
একদিন বিকালে তিনি যখন আত্মচিন্তায় নিমগ্ন, তখন দরজায় এসে দাঁড়ালেন এক দরবেশ। তিনি আল্লাহর নামে ভিক্ষা প্রার্থনা করলেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের হতাশায় বিধ্বস্ত গৃহকর্তা বিরক্ত স্বরে বলে উঠলেন, ‘আমি সারা জীবন ধরে আল্লাহর কাছে যা চেয়েছি, তিনি যখন আমাকে তা দেননি, তখন আমি আল্লাহর নামে কিছুই দেব না!’
ফকির শান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হতাশ হয়ো না। আল্লাহ তোমার প্রার্থনা কবুল করেছেন। অচিরেই তোমার ঘর পুত্রসন্তানের আলোয় ভরে উঠবে।’
এ কথা শুনে যেন গৃহকর্তার বুকের ভেতর আশার প্রদীপ জ্বলে উঠল। আনন্দে আপ্লুত হয়ে তিনি ফকিরকে যথাসাধ্য সম্মান ও দান দিলেন। তারপর কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘যদি সত্যিই আমার মনোবাসনা পূর্ণ হয়, তবে আপনাকে কী দান করব?’
ফকির বললেন, ‘আমাকে কিছু দিতে হবে না। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একটি গরু কোরবানি করলেই হবে।’
সময় গড়াল। অবশেষে আল্লাহ তার ঘর ভরে দিলেন এক পুত্রসন্তানের কান্নায়। আনন্দে আত্মহারা গৃহকর্তা প্রতিজ্ঞা পূরণের প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। কিন্তু চারপাশের হিন্দু প্রতিবেশীরা গরু কোরবানির সংবাদ শুনে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। তারা কোনোভাবেই তাকে কোরবানি করতে দিতে চাইল না।
তবু তিনি নিজের মানত পূরণে অটল রইলেন। একদিন গভীর জঙ্গলে গিয়ে গোপনে কোরবানি সম্পন্ন করলেন। প্রয়োজনীয় মাংস সঙ্গে নিয়ে বাকিটা মাটিতে পুঁতে রেখে বাড়ির পথে রওনা হলেন। কিন্তু ভাগ্যের লিখন ছিল ভিন্ন।
পথিমধ্যে হঠাৎ একটি চিল ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাত থেকে এক টুকরো মাংস ছিনিয়ে নিল। উড়তে উড়তে সেটি গিয়ে পড়ল বিক্রমপুরের রাজা বল্লাল সেনের প্রাসাদের সামনে। মাংসখণ্ড দেখে রাজা বুঝতে পারলেন, এটি গরুর মাংস, যে প্রাণী তার জাতির কাছে দেবতুল্য পূজনীয়।
রাজা সঙ্গে সঙ্গে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। তিনি আদেশ দিলেন, যে-ই এ দুঃসাহস করেছে তাকে খুঁজে বের করতে হবে। চারদিকে লোক পাঠানো হলো। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর জঙ্গলে দেখা গেল শিয়ালরা কোনো পশুর মাংস টানাটানি করছে। রক্তের চিহ্ন অনুসরণ করে শেষ পর্যন্ত সেই মুসলমান গৃহস্থের কাছে পৌঁছে গেল।
সব শুনে বল্লাল সেন কঠোর আদেশ দিলেন, ‘যে সন্তানের জন্য এই গো-বধ সংঘটিত হয়েছে, আগামী প্রভাতে তাকে আমার সামনে হাজির করা হোক। এই মহাপাপের কারণ যে শিশু, তাকে বেঁচে থাকতে দেওয়া যায় না।’
রাজার এই নির্মম ঘোষণা শুনে মুসলমান ব্যক্তি আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। গভীর রাতে তিনি স্ত্রী ও নবজাত শিশুকে নিয়ে গোপনে বিক্রমপুর ত্যাগ করলেন। শুধু রাজ্য ছাড়াই নয়, তিনি বহু পথ অতিক্রম করে ভারতবর্ষ ছেড়ে নিজের পূর্বপুরুষের ভূমি আরব দেশে চলে গেলেন।
সেখানে পবিত্র মক্কা নগরীতে তার সাক্ষাৎ হলো এক প্রসিদ্ধ দরবেশ—বাবা আদমের সঙ্গে। মুসলমান ব্যক্তি তার সব দুঃখের কাহিনি খুলে বললেন।
সব শুনে বাবা আদমের হৃদয় ক্ষোভে ও বেদনায় ভারী হয়ে উঠল। তিনি বললেন, ‘যে ভূখণ্ডে মানুষ স্বাধীনভাবে নিজের ধর্ম পালন করতে পারে না, সেখানে অন্যায়ের শিকল ভাঙতেই হবে।’
অতঃপর সাত হাজার শিষ্য-সাগরেদ নিয়ে তিনি বিক্রমপুরের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। দীর্ঘ পথ, অসংখ্য বিপদ, দুর্ভোগ ও ক্লান্তি অতিক্রম করে অবশেষে তিনি বিক্রমপুরের উপকণ্ঠে এসে উপস্থিত হলেন।
বাবা আদম বিক্রমপুরে এসে এমন এক স্থানে মসজিদ স্থাপন করেন, যেখান থেকে বল্লাল সেনের প্রাসাদ দেখা যায়। তিনি সেখানে প্রকাশ্যে নামাজ, আজান ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান শুরু করেন। গরু কোরবানিও দেওয়া হতে থাকে। আজানের ধ্বনি প্রাসাদ পর্যন্ত পৌঁছালে বল্লাল সেন ক্রুদ্ধ হয়ে দূত পাঠিয়ে এসব বন্ধ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু বাবা আদম দৃঢ়তার সঙ্গে জবাব দেন, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।’ তিনি ঘোষণা করেন, নিজের ধর্মীয় অনুশাসন পালন তিনি চালিয়েই যাবেন।
[প্রাচ্যের রহস্য নগরী, ফ্রান্সিস ব্র্যাডলি বার্ট, রহিমুদ্দীন সিদ্দিকী (অনুবাদক), পৃষ্ঠা: ৩২-৩৩]
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

