উমাইয়া-পরবর্তী মুসলিম সালতানাত

কৃষিকাজ ও সেচব্যবস্থার আধুনিকায়ন

কৃষিকাজ ও সেচব্যবস্থার আধুনিকায়ন
আব্বাসী শাসনামলের বাগদাদের খালনির্ভর পানি সরবাহ ব্যবস্থার মানচিত্র।

আব্বাসী খেলাফত (৭৫০-১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ)

উমাইয়া যুগে স্থাপিত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আব্বাসী খেলাফত (৭৫০-১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ) কৃষি ও সেচ ব্যবস্থাপনাকে আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। আব্বাসীরা ইরাকের সব অনাবাদি জমি আবাদের আওতায় আনতে এবং প্রধান শহরগুলোয় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যাপক কৃষি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। এই উদ্দেশ্যে তারা ফোরাত নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ এবং শাখা-প্রশাখা ও খালের মাধ্যমে নদীর প্রবাহ বহুদূর ছড়িয়ে এর পানিসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার সুনিশ্চিত করতে একাধিক বাঁধ নির্মাণ করেন। এর ফলে পশ্চিম সাহারার উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু করে উত্তর মেসোপটেমিয়ার পাহাড়ি এলাকা এবং দক্ষিণে পারস্য উপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চল পর্যন্ত সব জমিতে সেচ প্রদান ও চাষাবাদ করা সম্ভব হয়।

বিজ্ঞাপন

বাগদাদের উত্তর-পশ্চিমে দুটি বাঁধ নির্মাণ করে দুটি প্রধান বণ্টন-নদী তৈরি করেÑ

ক. দুজাইল নদী। শীত এবং গ্রীষ্ম উভয় মৌসুমে এই নদীর পানি শহরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য গলি ও প্রধান রাস্তাগুলোতে কৃত্রিম নালা তৈরি করা হয়েছিল।

খ. কারখায়া নদী। এটি বাগদাদের উপকণ্ঠের ফল বাগানগুলোতে সেচের কাজে ব্যবহৃত হতো।

রাজধানী বাগদাদের উদ্যানগুলোতে সেচ দিতে কুলাইন ও বাজাজিন নদীর পানি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে দুটি পৃথক বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এছাড়া ঈসা নদীতে বাঁধ দেওয়া হয় এবং খাইর নদীতে আরেকটি বাঁধ দেওয়া হয়। এটি বর্তমানে ‘নাহর আল খাইর’ নামে পরিচিত। দজলা নদী থেকে নাহরাওয়ান খাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে কৃত্রিম পানিপ্রবাহের বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়। মসুল শহরের দক্ষিণে দজলার পূর্বতীরে একটি বাঁধ নির্মাণ করেন। এছাড়া দামেস্কে কাসিউন পর্বতের পাদদেশের মিনিন নদী থেকে দেইর মারান পর্যন্ত একটি পানির খাল খনন করা হয়। আল-আত্তার (রহ.) তার গ্রন্থে হিজরি ছয় শতকের দামেস্ক ও আশপাশে বারাদা নদীর পানি বণ্টনের সুসংগঠিত ব্যবস্থা তুলে ধরেছেন। তখন রাস্তা, গলি ও বাসাবাড়িতে পানি বণ্টনের পরিমাণ নির্ধারণে অনুপাত, পরিসংখ্যান ও পাটিগণিতের প্রয়োগ করা হতো। ভূমির মালিকানা ও স্থানীয় প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে বাড়িঘর, পশুপাখি, বাগান, মসজিদ, মাদরাসা, হাসপাতাল ও পাবলিক-গোসলখানায় পানি সরবরাহ করা হতো। মুহতাসিব পানির নির্ধারিত পরিমাণ ও সঠিক ব্যবহার তদারক করতেন।

নবম শতকে সামাররায় দজলার পানির স্তর নিচু হওয়ায় নদী থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উজানে ভূগর্ভস্থ খাল খনন করে পানি আনার ব্যবস্থা করা হয়। নরিয়া বা জলচক্রের সাহায্যে সেই পানি ছোট ছোট খালে তুলে শহরের বাগান ও পুকুরে পৌঁছে দেওয়া হতো; অতিরিক্ত পানি আবার নদীতে ফিরে যেত।

কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন

আব্বাসী যুগে খলিফারা কৃষিকাজকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তারা উদ্ভিদের ধরন এবং চাষাবাদের জন্য মাটির উপযোগিতা নিয়ে গবেষণা করেন এবং বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের জন্য উপযুক্ত সার ব্যবহার করতে শুরু করেন। তারা সবসময়ই কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানোর বিপক্ষে ছিলেন; বরং আব্বাসী খলিফারা কৃষকদের করের হার কমিয়ে দিয়েছিলেন। আব্বাসী যুগেই সর্বপ্রথম কৃষিকাজে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, উন্নত হাতিয়ার এবং পদ্ধতিগত কৌশল ব্যবহার শুরু হয়। তারা ব্যাবিলন, শাম এবং মিসরের প্রাচীন কৃষি পদ্ধতি থেকে শিক্ষা নিয়ে তা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োগ করেছিলেন। আব্বাসীয়রা ভারত থেকে আখ এনে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তারা কফিকে

মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন।

গ্রিক কৃষি ও উদ্ভিদবিদ্যার গ্রন্থগুলো আরবিতে অনুবাদের মধ্য দিয়ে উদ্ভিদ ও কৃষিবিদ্যার প্রতি আরবদের আগ্রহ জোরালো হয়। আব্বাসী শাসনামলে এই অনুবাদ-আন্দোলন ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। দ্বিতীয় আব্বাসী খলিফা মনসুর গ্রিক গ্রন্থসমৃদ্ধ বিশাল গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেগুলো আরবিতে অনুবাদের উদ্যোগ নেন। পরে হারুনুর রশিদ ভারত ও পারস্য থেকে পণ্ডিতদের আমন্ত্রণ জানিয়ে বহু গ্রন্থ অনুবাদের ব্যবস্থা করেন।

আব্বাসীয় আমলে আন্দালুসিয়া ও সিসিলির কিছু অঞ্চলে তুলা, আখ ও তুতগাছের চাষ বিস্তার লাভ করে। আন্দালুসিয়া গম, বার্লি, ভুট্টা; কমলা, নাশপাতি, আপেল, ডুমুর, আঙুর, ডালিম ও পিচের মতো ফল উৎপাদনের জন্য পরিচিত ছিল। বিভিন্ন অঞ্চলে কলা, ধান, আখ ও জলপাইও চাষ করা হতো। সেখানে তিসি, তুলা ও রেশম উৎপাদন হতো। আর রেশমের জন্য তুতগাছের চাষও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আব্বাসী যুগের সেচব্যবস্থা, পানি প্রকৌশল ও বিস্তৃত নদীপথের নেটওয়ার্ক ছিল অত্যন্ত উন্নত। বসরায় গম, বার্লি, ধান, খেজুর, তিল ও তুলার পাশাপাশি শাকসবজি, ফলমূল ও ফুলের ব্যাপক উৎপাদনও হতো। ফলে শহরটি খাদ্যবাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে পরিণত হয়। বাগদাদে পানি সরবরাহের জন্য নাহরে ঈসা, নাহরে মালিক, নাহরে সারসার, নাহরে সারাতসহ কয়েকটি প্রধান খাল ছিল। এসব খাল রাস্তা, গলিপথ ও শহরতলির মধ্য দিয়ে সারা বছর পানি বহন করত। একই সময়ে নাহরাওয়ান খাল দজলার পূর্বতীর ও দিয়ালার নিম্ন অববাহিকায় বিস্তৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ সেচব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। পানি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব এতটাই বেড়েছিল, আব্বাসী খেলাফতে জলসম্পদ পরিচালনার জন্য ‘দিওয়ানুল আকরাহ’ নামে পৃথক প্রশাসনিক দপ্তরও প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে পানি ব্যবস্থাপনা ততদিনে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গে পরিণত হয়েছিল।

আন্দালুস: কৃষি বিপ্লবের স্বর্ণযুগ

মুসলিম শাসনামলে কৃষি ও সেচব্যবস্থার সর্বাধিক পরিণত এবং সুসংগঠিত রূপ দেখা যায় আন্দালুসে (মুসলিম স্পেন)। যে ভূমি রোমান আমল থেকে শুধু রুক্ষ পশুচারণভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হতো, ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম বিজয়ের পর কয়েক দশকের মধ্যেই তা ইউরোপের অন্যতম উর্বর কৃষিভূমিতে রূপান্তরিত হয়। এই রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি ছিল আরবি ও ফারসি উৎস থেকে আগত সেচ প্রযুক্তি—নির্দিষ্ট পদ্ধতির খাল, সাকিয়া বা পশুচালিত পানি উত্তোলন চাকা এবং নোরিয়া বা পানি উত্তোলন যন্ত্র। শুধু ভ্যালেন্সিয়া অঞ্চলেই ধান চাষের জন্য প্রায় আট হাজার নোরিয়া স্থাপিত হয়েছিল। মুসলিমরা ভারত, পারস্য ও মেসোপটেমিয়া থেকে চাল, আখ, কমলা, লেবু, কলা, জাফরান, গাজর, বেগুনের মতো বহু নতুন ফসল আন্দালুসিয়ায় নিয়ে আসে, পাশাপাশি গ্রিক-রোমান আমলের জলপাই ও ডালিম চাষও গতিশীল করে। তখন ফসল আবর্তন পদ্ধতি এবং ‘আল জামা’ নামে পরিচিত সমবায়ভিত্তিক কৃষিব্যবস্থার মাধ্যমে পানি ও মাটির উর্বরতা সর্বোচ্চ দক্ষতায় ব্যবহৃত হতো। আন্দালুসিয়ায়, বিশেষ করে কর্ডোভা এবং গ্রানাডার মতো শহরে, অত্যাধুনিক সেচব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এটা বালি ও নুড়িপাথরের ফিল্টারিং প্রক্রিয়ার আদি রূপ বলে প্রসিদ্ধ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন