একসময় ইস্তাম্বুল ছিল মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। সেই শহরে রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ রাতে মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মবার্ষিকী সাম্রাজ্যজুড়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালিত হতো। তুর্কি ভাষায় একে বলা হতো ‘মেভলিদ কান্দিলি’ (Mevlid Kandili)। এই উৎসব নিছক ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না; বরং উসমানিয় খিলাফতের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। সুলতানের প্রাসাদ থেকে ইস্তাম্বুলের মসজিদ ও রাজপথ—সবখানেই এ উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন করা হতো। মসজিদগুলো আলোকসজ্জায় সজ্জিত হতো, মিনারগুলোতে জ্বলে উঠত অসংখ্য প্রদীপ। কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ, নাত ও মাওলিদ পাঠে মুখর হয়ে উঠত নগরী।
রাজপ্রাসাদেও বিশেষ মেভলিদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হতো। এতে সুলতান, রাজপরিবারের সদস্য, আলেম-উলামা ও রাষ্ট্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নিতেন। দরিদ্রদের মধ্যে খাবার ও মিষ্টি বিতরণ করা হতো। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দেওয়া হতো অনুদান। সাধারণ মানুষও এসব আয়োজনে অংশ নিত। ফলে মিলাদ রাজদরবারের গণ্ডি পেরিয়ে সাম্রাজ্যজুড়ে এক সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছিল।
মেভলিদ কান্দিলির নামের অর্থ ও ঐতিহ্য
‘মেভলিদ’ শব্দটি আরবি ‘মাওলিদ’ থেকে এসেছে, যার অর্থ জন্ম বা জন্মস্থান। মুসলিম ঐতিহ্যে এটি বিশেষভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মস্মরণকে বোঝায়। আর ‘কান্দিল’ অর্থ প্রদীপ বা আলোকিত বাতি। উসমানিয় যুগে নির্দিষ্ট ধর্মীয় রাতগুলোতে মসজিদ ও মিনার আলোকিত করার যে ঐতিহ্য গড়ে ওঠে, তার সূত্রেই ‘কান্দিল’ নামটি জনপ্রিয় হয়। ফলে ‘মেভলিদ কান্দিলি’ বলতে মূলত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মস্মরণ উপলক্ষে পালিত আলোকোজ্জ্বল ধর্মীয় রাতকে বোঝানো হয়।
তৃতীয় মুরাদের হাতে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
উসমানিয় সমাজে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মস্মরণ ও মাওলিদ পাঠের প্রচলন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা শুরুর আগেই ছিল। তবে ষোড়শ শতকে সুলতান তৃতীয় মুরাদের শাসনামলে এটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় রূপ লাভ করে। তার আমলে মেভলিদ উপলক্ষে মসজিদ ও মিনারে আলোকসজ্জা এবং বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রথা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়। ধীরে ধীরে এ আয়োজন উসমানিয় সালতানাতের ধর্মীয় ও সামাজিক বর্ষপঞ্জির একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে পরিণত হয়।
পরবর্তী সময়ে মেভলিদ কান্দিলি সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। ইস্তাম্বুলের প্রধান মসজিদগুলোতে বিশেষ মাওলিদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হতো। মসজিদে মাওলিদ পাঠ, দরুদ, নাত ও দোয়ার পাশাপাশি আলোকসজ্জা এবং জনসাধারণের মধ্যে খাবার বিতরণের মাধ্যমে দিনটি ধর্মীয় আবেগ ও সামাজিক সম্প্রীতির বিশেষ উপলক্ষে পরিণত হতো।
মদিনা থেকে বার্তা, রাজদরবারে আনুষ্ঠানিকতা
তোপকাপি প্রাসাদের ‘তেশরিফাত’ বা রাজকীয় প্রটোকল-সংক্রান্ত নথিতে মেভলিদ কান্দিলির আনুষ্ঠানিক আয়োজনের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। ঐতিহ্য অনুযায়ী, মদিনা থেকে আগত বিশেষ বার্তা প্রথমে গ্র্যান্ড ভিজির ও রাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে উপস্থাপন করা হতো। মাওলিদ পাঠের নির্দিষ্ট পর্যায়ে ওয়াকফের প্রতিনিধিরা উপস্থিত জনতার মধ্যে মিষ্টান্ন বিতরণ করতেন। অনুষ্ঠান শেষে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা মসজিদের সামনে সারিবদ্ধভাবে সুলতানের জন্য অপেক্ষা করতেন। নামাজ শেষে প্রাসাদে ফেরার পথে সুলতান তাদের অভিবাদন গ্রহণ করতেন। রাতভর ইস্তাম্বুলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো লণ্ঠন ও আলোকসজ্জায় সজ্জিত থাকত। বিভিন্ন স্থান থেকে তোপধ্বনি শোনা যেত। মসজিদ ও রাজপথে চলত ধর্মীয় আয়োজন ও জনসমাগম। এই উৎসবমুখর পরিবেশ শুধু রাতেই সীমাবদ্ধ থাকত না; বরং পরদিন বিকাল পর্যন্ত এর আনুষ্ঠানিকতা ও উৎসবের আবহ অব্যাহত থাকত।
দ্বিতীয় আবদুল হামিদের যুগ
আবদুল হামিদ নিজে সুফি ধারার প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। সিংহাসনে বসার আগে তিনি লিবীয় শাজিলি-মাদানি তরিকার শায়খ মুহাম্মদ জাফির আল-মাদানির মজলিসে গোপনে অংশ নিতেন। সুলতান হওয়ার পর তিনি শায়খকে ইস্তাম্বুলে ফিরিয়ে আনেন। নবনির্মিত ইলদিজ হামিদিয়ে মসজিদে প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জিকিরের মজলিশ বসত, যেখানে সুফি সাধকদের সঙ্গে সুলতান নিজেও অংশ নিতেন। এই আধ্যাত্মিক পরিবেশকে ‘ব্লু মস্ক’সহ অন্যান্য বড় মসজিদে সুফিদের মিলাদ মাহফিলের বিস্তৃত ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যায়। সেখানে নাত-ই-শরিফ ও জিকিরের মধ্য দিয়ে নবীপ্রেম প্রকাশ পেত ভিন্ন মাত্রায়।
এক যুগের সমাপ্তি, স্মৃতির উত্তরাধিকার
উনিশ শতকে উসমানিয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। সুলতানরা তোপকাপি ছেড়ে দোলমাবাহচে এবং পরে ইলদিজ প্রাসাদে বসবাস শুরু করেন। তবু রাজকীয় অনুষ্ঠান ও প্রটোকলের ঐতিহাসিক কেন্দ্র হিসেবে তোপকাপির মর্যাদা অটুট ছিল। সময়ের সঙ্গে মেভলিদ উদযাপনের রীতিতেও পরিবর্তন আসে। তবে এর মূল চেতনা অপরিবর্তিত থাকে। হুজুর (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আনুগত্য উসমানিয় সাম্রাজ্যের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ছিল। এই ঐতিহ্য খিলাফতের শেষ দিন পর্যন্ত বহমান ছিল।
আজকের তুরস্কেও ‘মেভলিদ কান্দিলি’ ধর্মীয় আবেগ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তবে একসময়ের রাজকীয় জাঁকজমক, সুলতানের আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি, প্রাসাদের আয়োজন ও আলোকিত ইস্তাম্বুল এখন ইতিহাসের স্মৃতি। তোপকাপি, ইলদিজ ও পুরোনো মসজিদগুলোর নীরব দেয়াল যেন সেই অতীতের সাক্ষ্য বহন করে—যখন খিলাফতের রাজধানী মেভলিদের রাতে আলোয় ভেসে উঠত এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তর থেকে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত নবীপ্রেমের এই আয়োজনে অংশ নিত।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


