জামিয়াতুত তারবিয়াহর শিক্ষা সফর

ইতিহাসের খোঁজে সোনারগাঁওয়ে একদিন

মুহাম্মাদুল্লাহ নাঈম

ইতিহাসের খোঁজে সোনারগাঁওয়ে একদিন

বাংলার স্বর্ণযুগের রাজধানী সোনারগাঁও—ইতিহাস, ঐতিহ্য আর নান্দনিক স্থাপত্যের অনন্য নগরী। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই জনপদ বহন করে চলেছে বাংলার সুলতানি যুগের শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা এবং নগর সভ্যতার অসংখ্য স্মৃতি। সেই ইতিহাসকে বইয়ের পাতা থেকে বাস্তবে দেখার উদ্দেশ্যে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) শিক্ষা সফরে বের হন আল্লামা মামুনুল হক প্রতিষ্ঠিত জামিয়াতুত তারবিয়াহ আল ইসলামিয়ার ইতিহাস ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

উস্তাদ ইবরাহিম জামিল ও উস্তাদ মুহিম মাহফুজের তত্ত্বাবধানে দিনব্যাপী এ সফরে শিক্ষার্থীরা ঘুরে দেখেন সুলতানী বাংলার বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা, মাজার-মাকবারা, টাকশাল, মসজিদ ও প্রত্ননিদর্শন।

বিজ্ঞাপন

সফরের শুরু হয় বাংলার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ (রহ.)-এর কবর জিয়ারতের মাধ্যমে। সুলতানী আমলে বাংলার শিক্ষার বিশ্বায়নে আবু তাওয়ামা ছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি ১২৮৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। যেটা ছিলো তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু পরবর্তী কালে রাজা গনেশ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহকে হত্যা করেন এবং সে বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করেন। বাংলার হারানো গৌরব সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ দেখে বিষন্নতা ভর করে সবার মনে।

সেখান থেকে সফর এগিয়ে যায় বাংলা মহান সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ এবং তার মহান বিচারপতি কাজী সিরাজুদ্দীনের কবরের দিকে। সেখানে বাংলার ইতিহাসে ন্যায়বিচারের অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে সুলতান ও কাজী সিরাজুদ্দীনের বহুল আলোচিত বিচারিক ঘটনার বর্ণনা শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা হয়।

এরপর পাঁচ পীরের মাজারসংলগ্ন ঐতিহাসিক মসজিদে জোহরের নামাজ আদায় করেন শিক্ষার্থীরা।

পুরের খাবারের পর কাফেলা যাত্রা করে শেরশাহী গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড হয়ে মসনদে আলা ঈশা খাঁর বাড়ি ও পানাম নগরের উদ্দেশে। যেতে যেতে এ ঐতিহাসিক সড়কের অবশিষ্ট নিদর্শনও তারা পর্যবেক্ষণ করেন। এর মধ্যে অন্যতম পঙ্খিরাজ খালের উপর ঐতিহাসিক পানাম সেতু। সেতুর উপর কিছুক্ষণ অবস্থানের পর শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করেন সুলতানী, মোগল ও ব্রিটিশ আমলের এই প্রাচীন নগর- পানামে।

পানাম নগরের বিভিন্ন স্থাপনা ঘুরে দেখে মুহিম মাহফুজ এর ইতিহাস ও স্থাপত্য নিয়ে প্রচলিত বিভিন্ন ধারণার বিষয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন এবং গবেষণার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে তিনি সেখানে প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি, পানাম নগরকে এককভাবে হিন্দুদের নগর হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও স্থাপত্যের বিভিন্ন উপাদানে মোগল ও সুলতানী বাংলার ছাপ লক্ষ্য করা যায়। তিনি বলেন, প্রতিটি ভবনে শৌচাগারের উত্তর-দক্ষিণমুখী বিন্যাস মুসলিম সভ্যতা ও জীবনাচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া বর্তমানে মন্দির হিসেবে পরিচিত একটি স্থাপনা সম্পর্কে তিনি ধারণা প্রকাশ করেন যে, এটি ব্রিটিশ আমলে কোনো মুসলিম স্থাপনা সংস্কার করে মন্দিরে রূপান্তর করা হয়ে থাকতে পারে। এসব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তিনি পানাম নগরের ইতিহাস নিয়ে আরও গভীর ও নিরপেক্ষ গবেষণার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এরপর কাফেলা গোয়ালদী মাদরাসা পরিদর্শন করেন এবং সফররত শিক্ষার্থীরা মাদরাসার ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

দিনের শেষভাগে সফর পৌঁছে যায় ঐতিহাসিক গোয়ালদি মসজিদ ও সুলতানী বাংলার প্রাচীন টাকশালে। টাকশাল এলাকায় থাকা কিছু প্রত্ননিদর্শন ও চিহ্ন নিয়ে মুহিম মাহফুজ প্রশ্ন তোলেন এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রতি ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণার আহ্বান জানান।

দিনব্যাপী এই শিক্ষা সফরের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সুলতানী বাংলার ঐতিহ্য, সুলতানি ও মুঘল আমলের বাংলার স্থাপত্য শিল্প ও ঐতিহাসিক নিদর্শন সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

পানাম সংলগ্ন একটি মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায়ের মাধ্যমে একদিনের শিক্ষা সফর শেষ করা হয়।

নামাজের পর উস্তাদ জামিল ইবরাহিম ও উস্তাদ মুহিম মাহফুজ সোনারগাঁওয়ের ঐতিহাসিক স্থান ও স্থাপনার প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে প্রবন্ধ লেখার বিষয়ে নির্দেশনা দেন এবং সবাইকে নির্দিষ্ট বিষয় বিন্যস্ত করে দেন। শিক্ষার্থীদের আগ্রহে সবার রচনা একত্রিত করে একটি ইতিহাস স্মারক প্রকাশ করার এবং শিক্ষা সফরের অভিজ্ঞতা অন্যদের সাথে বিনিময়ের লক্ষ্যে একটি সেমিনার আয়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন