মোগল আমলে রাজধানী হিসেবে যখন ঢাকার বিকাশ শুরু হয়, তখন থেকেই ঢাকায় জমকালো উৎসব ও আনন্দ উদ্যাপনের যুগের সূচনা হয়। রাজমহল থেকে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তরের সময় মোগল সুবাদার ইসলাম খান চিশতী সঙ্গে নিয়ে আসেন প্রশাসনিক দপ্তর, সামরিক-বেসামরিক দপ্তর, দেওয়ানি বা রাজস্ব বিভাগসহ সব দপ্তর। এই বিশাল কর্মকাণ্ড ঢাকাকে করে তোলে কর্মচঞ্চল ও তৎপরতামুখর।
ঢাকায় ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে কর্মচাঞ্চল্য, বাড়তে থাকে শহরের সীমানা। বাইরে থেকে আসতে থাকে নতুন নাগরিক, সরকারি দপ্তরি, পাইক-পেয়াদা আর বিদেশি ব্যবসায়ী দল। সেইসঙ্গে তৈরি করা হয় উৎসবের উপলক্ষ। সম্পদে সমৃদ্ধ ঢাকায় উদ্যাপিত হতে থাকে আনন্দের রঙিন আয়োজন।
ঢাকার বেশির ভাগ বাসিন্দা ও শাসকবর্গ মুসলমান হওয়ায় রাজধানী আমলের শুরু থেকেই ঢাকা গড়ে ওঠে মুসলিম সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে। ঢাকার শাসক ও নাগরিকদের কাছে তখন রমজান ছিল বিশেষ আয়োজন ও উদ্যাপনের মাস—একদিকে এবাদতের সাড়ম্বর আয়োজন, অন্যদিকে উৎসবের আনন্দ উদ্যাপন।
সতরো শতকের সেই বিকাশমান নগরী ঢাকার রমজানের তুলনায় বর্তমান মহানগরী ঢাকার রমজান আরো বর্ণিল, আরো রঙিন। শত শত বছরে ঢাকা বেড়েছে চারদিকে, আর ঢাকায় ঢুকেছে নানান অঞ্চলের মানুষ। ঢাকার সংস্কৃতি কিছুটা বদলেছে, কিছুটা রয়ে গেছে অবদলিত। কোনো উৎসব হারিয়ে গেছে, কোনোটা হয়েছে ক্লাসিক। কোনটার রঙ ফিকে হয়েছে, কোনোটা হয়েছে আরো রঙিন। ঢাকার রমজান ও রমজানকেন্দ্রিক উৎসব-আয়োজনের ধরনে কিছুটা বদল ঘটলেও রঙ মলিন হয়নি। প্রায় আধা সহস্র বছরের লালন-পালন-পরিচর্যায় রমজানের আয়োজনে যুক্ত হয়েছে নানান মাত্রা, উৎসবে সৃষ্টি হয়েছে নতুনত্ব।
মোগল ঢাকার আকাশে রমজানের চাঁদ দেখা গেলে সুবাদার ইসলাম খান চিশতি কামানের গোলা ছুড়ে রমজানকে স্বাগত জানানোর রেওয়াজ শুরু করেন। পরবর্তীকালে ঢাকার নবাব-নাজিমরাও তোপধ্বনির মাধ্যমে রমজানের আনন্দসংবাদ জানিয়েছেন ঢাকাবাসীকে।
মোগল রাজবংশ ছিল শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে উন্নত, পোশাক-পরিচ্ছদে রঙিন রুচি, খাবারে বিলাসী, আপ্যায়নে অতুলনীয় আর উৎসব-আয়োজনে আমুদে মেজাজের। এসব খান্দানি বৈশিষ্ট্য অভিজাত শ্রেণির মাধ্যমে ধীরে ধীরে ঢাকার স্থানীয় ও বহিরাগত বাসিন্দাদের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
রমজান, ঈদ, শবেবরাত, মহররম ও আশুরার মতো ঢাকার চিরায়ত উৎসবগুলো ব্রিটিশ আমলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে সরকারি আয়োজনে ভাটা পড়লেও ঢাকাবাসীর রমজান উদ্যাপন মলিন হয়নি। ঢাকার নবাব পরিবার, সরদার, পঞ্চায়েত কমিটি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ রমজান আয়োজনের বর্ণিল ধারা অব্যাহত রাখেন।
শবেবরাতের পরে শাবান মাসের ২০ তারিখের পর থেকে জোরেশোরে চলত রমজানের প্রস্তুতি। মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা বেড়ে যেত। এখনো রমজানকে কেন্দ্র করে মসজিদে মুসল্লি বাড়ে। মসজিদের দেয়ালে নতুন রঙ করার প্রচলন এখন তেমন চোখে না পড়লেও কিছুদিন আগেও এই ট্র্যাডিশন ছিল। মসজিদের মতো অভিজাত লোকেদের ঘরবাড়িও নতুন করে রঙ করা হতো, পরিচ্ছন্ন করে সাজিয়ে তোলা হতো। রোজার চাঁদ দেখার আগেই কাঁচা মাটির ঘরগুলো চিকন মাটির লেপ দিয়ে ঝকঝকে করে তোলা হতো। তার ওপরে কেউ কেউ আঁকতেন রঙিন আল্পনা। সামর্থ্য অনুযায়ী সবার ঘরে সুগন্ধি রাখা হতো। প্রথম রোজার ইফতারে ব্যবহার করার জন্য ২৭ শাবানে নতুন মাটির পাতিলে মুগ ডালের বীজ ভিজিয়ে অঙ্কুরিত করা হতো।
এখন চানরাত বলতে কেবল ঈদের রাত বোঝা গেলেও ঢাকার কালচারে প্রথম চানরাত বলতে বোঝা যেত প্রথম রোজার রাত। এই রাত থেকেই ঘরে ঘরে ফারাস বিছানো হতো। বিশেষভাবে বাচ্চাদের গোসল করানো হতো বেসনের পানি দিয়ে। তারপর রমজানের চাঁদ দেখার প্রস্তুতি নেওয়া হতো।
বড় কাটরা, আহসান মঞ্জিল, ছোট কাটরা ও হোসনী দালানের মতো উঁচু ভবনের ছাদে অনেক আগে থেকেই লোকজন পৌঁছে যেত। অতি শৌখিন লোকেরা নৌকার সাহায্যে মাঝনদীতে গিয়ে চাঁদ দেখত। বুড়িগঙ্গার তীরে রমজানের চাঁদ দেখা ছিল ঢাকার রমজানপর্বের আদি ঐতিহ্য। কিশোর-যুবকদের উৎসাহ-উল্লাস থাকত সবচেয়ে বেশি। বৃদ্ধরা নিজের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করার জন্য হলেও চাঁদ দেখত। চাঁদ দেখা গেলে উঠত খুশির রব। একে অপরকে মোবারকবাদ দিত। অভিজাতরা বন্দুক থেকে গুলি করে, নবাব-নাজিমরা কামানের গোলা ছুড়ে করে রমজানের চাঁদ দেখার ঘোষণা করত। আর ছোটরা দল বেঁধে বের হতো বড়দের সালাম করতে।
তারাবি পড়ানোর মসজিদে মনজিদে হাফেজ আগে থেকেই মনোনীত থাকত। ঝাড়বাতি পরিষ্কার করে মোমবাতি লাগানো হতো। প্রথম দিন একটু দেরি করে শুরু হতো তারাবি নামাজ। মুসল্লিরা পরামর্শ করে সবার সুবিধা-অসুবিধার কথা ভেবে তারাবির সময় ঠিক করত। বাজারের মসজিদে একটু আগে এবং মহল্লার মসজিদে একটু বেড়ি করে তারাবি শুরু হতো। পাকিস্তান আমল পর্যন্ত সুরা তারাবির রেওয়াজ ছিল বেশি, খতম তারাবির কোথাও কোথাও; কারণ শহরে হাফেজদের সংখ্যা বেশি ছিল না। হাফেজদের তখন অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হতো। পুরান ঢাকার হাফেজ রেল, হাফেজ তুফান ও হাফেজ আমান খুবই বিখ্যাত ছিলেন।
রমজানের রাতে সাহরির সময়ে পুরান ঢাকায় গলিতে গলিতে বয়স্করা অপেক্ষা করতেন। তাদের হাতে থাকত খুরমা বা অন্য কোনো মিষ্টি। জানালা দিয়ে চেয়ে দেখতেন নারীরা। দূর থেকে ভেসে আসত সমবেত কণ্ঠের কাসিদা—
‘বাহারে সাওম গুজরি যা রাহি হ্যায়,
দিলে সায়েমপে বাদলি ছা রাহি হ্যায়।’
এখন রমজানের রাতে পুরান ঢাকার গলিতে এমন দৃশ্য তেমন একটা দেখা যায় না। কাসিদার সুরে ঢাকাবাসীকে সাহরি জাগিয়ে তোলার রীতি হারিয়ে গেছে বললেই চলে। যেটুকু আছে, তা না থাকার মতোই।
পুরান ঢাকার একসময়কার পঞ্চায়েতপ্রধান মাওলা বখশ সরদারের বড় ছেলে আজিম বখশ স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন আর আগের মতো ওই রকম কাসিদা হয় না।’
কয়েক দশক আগ পর্যন্ত পুরান ঢাকার প্রতি পাড়ায় থাকত কাসিদার দল। ফরিদাবাদের দিগন্ত মজলিস প্রতিবছর কাসিদার আয়োজন করত। সাহরির সময়ে হ্যাজাক বাতি মাথায় নিয়ে তারা মহল্লায় মহল্লায় ঘুরত সুর করে, গাইত কাসিদার কলি। একেকটা দলে সাধারণত ২০-২৫ জন সদস্যা থাকত। মাসের শেষে দলের লোকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বকশিশ চাইত। মানুষও আনন্দ নিয়ে তাদের বখশিশ দিত।’
বংশাল, নয়াবাজার, ফরিদাবাদ, লালবাগসহ বিভিন্ন মহল্লায় হতো কাসিদার প্রতিযোগিতা। চলত দুদিন ধরে। সেরা দলকে দেওয়া হতো পুরস্কার। এখনো রমজানে দু-এক জায়গায় কাসিদার আয়োজন হয়। কিছু দল এখনো টিকে আছে।
কাসিদার প্রচলন ঠিক কবে থেকে, তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। তবে হাকীম হাবিবুর রহমানের ‘ঢাকা পাঁচাশ বারাস পাহলে’ বই থেকে জানা যায়, বিশ শতকের গোড়ার দিকে ঢাকায় কাসিদার পুনরাবির্ভাব ঘটে। মহল্লা সরদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘কাসিদা সংগীত’ বিকাশ লাভ করতে থাকে।
তারাবির পর পুরুষেরা ঘরে এসে ঘুমিয়ে যেত। নারীরা সাহরির আয়োজন করে রাখত ঘুমানোর আগেই। শিশু-কিশোররা ঘুমানোর সময় সাহরিতে উঠিয়ে দেওয়ার জন্য বড়দের থেকে ওয়াদা নিত। যুবকেরা সাধারণত গল্পগুজব করে সাহরি পর্যন্ত জেগে থাকত পুরান ঢাকায়। এই গল্প-কিসসা চলত সাধারণের বাংলা ঘরে, অভিজাতদের বৈঠকখানায়। সাহরির সময়ে ‘সাহরিওয়ালারা’ বের হয়ে পড়ত পাড়ায় পাড়ায়। হাদে থাকত ময়লা লণ্ঠন আর কুকুর থেকে বাঁচার জন্য লাঠি। হাঁক দিয়ে তারা ডাকত—‘রোজদারো, উঠ্ঠো, সাহরি খাও, ওয়াক্ত হো গ্যয়া।’
ঢাকার বাসিন্দারা সাহরির জন্য সাধারণত কোরমা ও শিরবেরেঞ্জ নামের ফিরনিজাতীয় খাবার বেশি পছন্দ করতেন। সাধারণত সাহরিতে খাবারের পদ থাকত কম। হেকিম হাবিবুর রহমান ব্রিটিশ আমলের বিবরণে জানান, পুরুষরা অধিকাংশ সময় রুটি খেতেন। কিন্তু মহিলারা পছন্দ করতেন ভাত খেতে। এ সময়ে চায়ের প্রচলন শুরু হয়েছিল। তবে তখনো সর্বসাধারণের মধ্যে এর প্রচলন ছিল না। মোগল অভিজাত ও কাশ্মীরি সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা সাহরির সময় অবশ্যই চা পান করতেন। তখনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা ফজরের আজান পর্যন্ত কোরআন তেলাওয়াত করতেন। অন্যরা ঘুমিয়ে পড়তেন।
হুক্কার ব্যবস্থা রমজান মাসে বিশেষভাবে করা হতো। বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এ সময় মাটির হুক্কা পছন্দ করতেন। তারা ইফতারের পরে মিঠা-কড়া তামাক সেবন করতেন আর সাহরির সময় তাওয়ার কড়া তামাক সেবন করতেন।
রমজান উপলক্ষে ঘরে ঘরে অবশ্যই তেলে ভাজা কোফতা হতো। কোথাও কোথাও সেটার কোরমা আবার কোথাও কালিয়া করা হতো। এটা সাহরির জন্য ঢাকার লোকদের পছন্দের খাবার ছিল। তারা রুটি ও ভাত দুটোই তৃপ্তি করে খেত। জোহরের পরে ভেজানো ছোলা থেকে বুট বের করা হতো। ডাল পিষে ফুলুরি বানানো হতো। এগুলো ইফতারের সময় গরম গরম দস্তরখানে পরিবেশন করা হতো। রোজার সময় প্রত্যেক ঘরে মুড়ি অবশ্যই থাকত। পেঁয়াজ, মরিচ ও তেলের সমন্বয়ে মুড়ির ভর্তা ছিল রমজানে অপরিহার্য খাবার। তেলে ভাজা মুড়ির সঙ্গে তেলে ভাজা পনির বনেদি ঘরে ইফতারে অন্তর্ভুক্ত থাকত।
তেলে ভাজা মাখনার খইও সব জায়গায় পাওয়া যেত। দস্তরখানে থাকত জমজমের পানি। এই পানি প্রত্যেকের ভাগ্যে দু-চার ফোঁটা করে জুটত। মাগরিবের আজান শোনার পর প্রথমে সবাই জমজমের পানি শরবতে ঢেলে পান করত। খোরমা ও খেজুর ধোয়া-কাটার পর দু-এক টুকরো মুখে দিত। এটাকে সওয়াবের কাজ মনে করা হতো। পুরান ঢাকায় তৈরি করা হতো হরেক রকমের শরবত। তবে লোকেরা ফালুদা বেশি পছন্দ করত। মিছরির শরবতে সরু করে কাটা পেস্তা বাদাম মেশানো হতো। অধিকাংশ লোক সুগন্ধি তোকমার শরবত পান করত। আর কেউ কেউ পছন্দ করত বেলের শরবত। ছোট ছোট ছেলেমেয়েও ইফতারে শামিল হতো। মাগরিবের নামাজ শেষে সবাই খাওয়ার জন্য আবার দস্তরখানে বসত। সেখানে অধিকাংশ সময় সাধারণ ও পনিরমিশ্রিত বাকরখানি থাকত; থাকত কাবাব ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


বিজ্ঞান, সুফিবাদ ও প্রেমের অলৌকিক তর্জমা